পাকস্থলীর ক্যান্সারে আক্রান্ত কালাম বেপারী ঢাকার মহাখালীতে জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। হঠাৎ গত বৃহস্পতিবার তিনি নিখোঁজ হন। পরিবারের লোকজন সম্ভাব্য সব জায়গায় খুজে ও তার সন্ধান পাননি।

শনিবার এ ব্যাপারে পুলিশের সহায়তা চান তারা। এর মধ্যে সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনায় দেখা যায়, লিফটের নিচে পড়ে গেছেন ওই ব্যক্তি। অবশেষে নিখোঁজের দু'দিন পর সেখান থেকে তার অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলাকে দায়ী করেছেন মৃতের ছেলে রিয়াদ বেপারী।

রিয়াদ বেপারী সমকালকে বলেন, আমাদের বাড়ি বরিশালের গৌরনদী উপজেলার গেরাকুল গ্রামে। বাবা রিকশা চালাতেন। বছরখানেক ধরে তিনি বেশ অসুস্থ। ছয় মাস আগে তার পাকস্থলীতে ক্যান্সার ধরা পড়ে। ডাক্তারের পরামর্শে গত ২৯ আগস্ট তাকে মহাখালীর ক্যান্সার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এখানে নবম তলার পাঁচ নম্বর ওয়ার্ডের ৩৪ নম্বর বেডে তার চিকিৎসা চলছিল। কয়েক দফা কেমোথেরাপি দিয়ে কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর তার পাকস্থলীতে অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন চিকিৎসকরা। 

তিনি বলেন, রোববার তার অস্ত্রোপচার হওয়ার কথা ছিল। আমি এলাকায় ব্যবসা করি। সেজন্য প্রতি বুধ বা বৃহস্পতিবার গিয়ে ব্যবসার দেখভাল করে শনিবার ফিরে আসতাম। তেমনি গত ১৪ সেপ্টেম্বর বাবাকে হাসপাতালে রেখে বরিশালে যাই। শনিবার সকালে এসে দেখি হাসপাতালে বাবা নেই। হাসপাতালের কর্মীদের কাছে জানতে চাইলে তারা বলেন, রোগীরা অনেক সময় বিল দেওয়ার ভয়ে পালিয়ে যায়। তখন আমি বলেছি, বিল তো আমি দেই। চিকিৎসার জন্য গরু বেচে দুই লাখ টাকা খরচ করেছি। তাহলে বাবা পালাবে কেন?

রিয়াদ জানান, হাসপাতাল কর্মীদের কথাবার্তা পছন্দ না হওয়ায় তিনি বনানী থানা পুলিশের কাছে যান। তারা সব শুনে বলে- ভালো করে খুঁজে দেখেন, হয়তো কোনো আত্মীয়-স্বজনের বাসায় গেছে। তখন তিনি পুলিশকে বলেন যে, সব জায়গায় খোঁজ নেওয়া হয়েছে। তিনি থানায় থাকতেই সকাল সাড়ে ১০টার দিকে হাসপাতাল থেকে একজন ফোন করে তাকে দ্রুত সেখানে যেতে বলেন। 

এরপর হাসপাতালে গেলে তাকে পরিচালকের কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়। তাকে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়। শেষে তাকে জানানো হয়, হাসপাতালের লিফটের নিচে কালাম বেপারীর লাশ পাওয়া গেছে। দুর্ঘটনাবশত তিনি সেখানে পড়ে গেছেন। প্রমাণ হিসেবে তারা সিসিটিভির ফুটেজ দেখান। 

তাতে দেখা যায়, বৃহস্পতিবার সকাল ৭টা ৩২ মিনিটে নবম তলার লিফটের বোতাম চাপছেন কালাম। লিফটের দরজা খোলার পর তিনি পা রাখতেই ভেতরে পড়ে যান।

রিয়াদ বলেন, লিফটের কোনো ত্রুটির কারণে বাইরের দরজা খুলে গেছে, কিন্তু লিফট উঠে গিয়েছিল ওপরে। বাবা সেটি বুঝতে না পেরে লিফটে ওঠার চেষ্টা করতেই নিচে পড়ে যান। এরপর সেখানেই দু'দিন পড়ে থাকে তার লাশ। কিন্তু একজন রোগী তার বেডে নেই, সেটা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দেখবে না? তারা এটার দায় এড়াতে পারে না। তাছাড়া হাসপাতালের মতো জায়গায় এমন ত্রুটিযুক্ত লিফট কেন থাকবে? আমার বাবা যখন একটু একটু করে সুস্থতার দিকে যাচ্ছিলেন, তখনই তাকে হারাতে হলো।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে হাসপাতালের পরিচালক স্বপন কুমার সমকালের কাছে দাবি করেন, এমন কোনো ঘটনা তার জানা নেই। খোঁজ নিতে হবে।

অবশ্য অন্য একটি গণমাধ্যমের খবরে দেখা যায়, তিনি বলেছেন- লিফটে হয়তো কিছু কারিগরি ত্রুটি ছিল। এটা লিফটের টেকনিশিয়ানরা বলতে পারবেন।

বনানী থানার ওসি নূরে আযম মিয়া জানান, খবর পেয়ে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায়। এ ঘটনায় মৃতের পরিবারের পক্ষ থেকে একটি অস্বাভাবিক মৃত্যু (ইউডি) মামলা করা হয়েছে। পুলিশ ঘটনাটি তদন্ত করে দেখছে।

মৃতের পারিবারিক সূত্র জানায়, ময়নাতদন্ত শেষে রাতে তারা লাশ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানেই তাকে দাফন করা হবে।