সম্প্রতি গেজেট হওয়া ডিটেইল এরিয়া প্ল্যানকে (ড্যাপ) ধনীবান্ধব হিসেবে আখ্যায়িত করেছে স্থপতিদের সংগঠন ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্ট, বাংলাদেশ (আইএবি)। তবে রাজউকের (রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ) পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, স্বার্থান্বেষী মহল সাধারণ মানুষকে উস্কানি দিতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।

সোমবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে আইএবি কার্যালয়ে আয়োজিত অংশীজন সম্মেলনে আইএবি এমন পর্যালোচনা তুলে ধরে। অনুষ্ঠানে আইএবির ড্যাপ বিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপের আহ্বায়ক স্থপতি ইকবাল হাবিব মূল প্রবন্ধে বলেন, বাংলাদেশ ইমারত নির্মাণ বিধিমালা-২০০৮ অনুযায়ী যে জমিতে ৮ তলা ভবন নির্মাণ করা যেতো, সেখানে এখন চার থেকে ছয়তলা ভবন করা যাবে। এর ফলে রাজধানীর বিপুল সংখ্যক মানুষের বাসস্থানের সংকট তৈরি হবে।

তিনি অভিযোগ করেন, এই ড্যাপে গুলশান, ধানমন্ডি, বারিধারা, বসুন্ধরা, পূর্বাচল, ঝিলমিলের মতো এলাকায় এফএআর (ফ্লোর এরিয়া রেশিও) বেশি দেওয়া হয়েছে। আর তুলনামূলকভাবে অনুন্নত এলাকা যেমন- বাড্ডা, শংকর, আদাবর, টোলারবাগ এলাকায় এফএআর দেওয়া হয়েছে সবচেয়ে কম, যা ধনী তোষণনীতি বলে মনে হয়।

তিনি বলেন, ড্যাপের কাঙ্ক্ষিত জনঘনত্ব ২০০ থেকে ২৫০ জন অনুযায়ী ঢাকার কেন্দ্রীয় অঞ্চলে ২০৩৫ সালে নেট আবাসিক জনঘনত্ব হবে ৩৯০ জন। অথচ ড্যাপের প্রাক্কলন অনুযায়ী ঢাকায় প্রতি একরে মানুষ থাকবে ৫৩১ জন, যার মানে ১৪১ জন মানুষ আবাসন পরিকল্পনার বাইরে থাকবে।

স্থপতি ইনস্টিটিউটের সভাপতি মোবাশ্বের হোসেন বলেন, এ পরিকল্পনার লক্ষ্য, বর্তমানে ঢাকায় বসবাসরতরা যেন সুস্থ সুন্দরভাবে থাকতে পারে। কিন্তু ড্যাপ পর্যালোচনা করে দেখলাম, সবার আবাসনের কথা ভাবা হয়নি। যে পরিকল্পনা করা হয়েছে তাতে ঢাকা থেকে বহু লোককে চলে যেতে হবে। জনসংখ্যার একটি বড় অংশকে কীভাবে বের করে দিতে হবে, কীভাবে চলে যেতে বলা হবে, সে প্রশ্নটি করতে চাই।

তিনি আরও বলেন, ঢাকায় যতদিন আয় থাকবে, ততদিন মানুষ আসবেই। তখন মানুষ বেশিরভাগ বস্তিতে বসবাস করবে। প্রয়োজনে ফুটপাতে শুয়ে থাকবে। ঢাকায় আসা বন্ধ করতে হলে ঢাকার চারপাশে উন্নয়ন করতে হবে।

অনুষ্ঠানে স্থপতি ইনস্টিটিউটের সাধারণ সম্পাদক ফারহানা শারমিন, সহ-সভাপতি খান মো. মুস্তফা পলাশ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে, আইএবির এমন অভিমত সম্পর্কে রাজউকের (রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ) পক্ষ থেকে ড্যাপের প্রকল্প পরিচালক আশরাফুল ইসলাম এক বক্তব্যে বলেছেন, ড্যাপ বাস্তবায়িত হলে ঢাকা শহর থেকে ৪০ শতাংশ মানুষকে চলে যেতে হবে বলে আইএবি যা বলছে তা একেবারেই ঠিক না। বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিক্সের (বিবিএস) জরিপে বলা হচ্ছে ২০৩৫ সাল নাগাদ ঢাকা শহরে লোকসংখ্যা হবে ২ কোটি ৬০ লাখ। বর্তমান ড্যাপে রাজউক এলাকায় ৬ কোটি ৩৬ লাখ মানুষের বসবাসের সুযোগ রাখা হয়েছে। সুতরাং, ৪০ শতাংশ মানুষকে ঢাকা থেকে বের করে দেওয়ার মতো অসত্য তথ্য প্রচার করে একশ্রেণীর স্বার্থান্বেষী মহল সাধারণ মানুষকে উস্কানি দিতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।

আবাসন যেমন মানুষের মৌলিক অধিকার তেমনি শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা ও বিকাশের অনুকূল পরিবেশও কি মানুষের মৌলিক অধিকার নয়? শুধু বড় বড় ইমারত নির্মাণ কি মানুষের সেই সুস্বাস্থ্য নিশ্চিতে ভূমিকা রাখতে পারবে বা পারছে?

বর্তমান ড্যাপে নিম্ন ও নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষের সুলভ মূল্যে আবাসন ব্যবস্থা করতে এই প্রথম শূন্য দশমিক ৭৫ প্রণোদনা এফএআর ব্যবস্থা করা হয়েছে যেন মানুষ একটি ফ্ল্যাট কিনতে পারে। ড্যাপ পুরো ঢাকা মহানগর অঞ্চলের জন্য একটি সমন্বিত মহাপরিকল্পনা। এতে শুধু ইট-কাঠের দালান ও এফএআর নয়। বরং মানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্য নাগরিক সুবিধাদি, অবকাঠামোসহ নানাবিধ প্রস্তাবনা রয়েছে। রাজউক যেকোনো ধরনের গঠনমূলক সমালোচনা ও পরামর্শকে স্বাগত জানায় এবং অসত্য তথ্যকে নিন্দা জানায়।