সরকারি চাকরিবিধিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কোম্পানি খুলে দেদার ঠিকাদারি ব্যবসা করেছেন সমবায় মন্ত্রণালয়ের অধীন পল্লী দারিদ্র্য বিমোচন ফাউন্ডেশনের (পিডিবিএফ) তিন কর্মকর্তা। নিজেরাই ঠিকাদারি কাজ করছেন, যা আরও গর্হিত। কোটি কোটি টাকার ঠিকাদারি কাজ করেছেন তাঁরা।

পিডিবিএফের কর্তাব্যক্তিরা বিষয়টি অবগত হলেও তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে নীরব আছেন। অভিযোগ আছে, শীর্ষ কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করেই নিয়মবিহর্ভূত এই ঠিকাদারি কাজ করছেন তাঁরা। এ রকম ব্যবসা করা সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা ও পিডিবিএফের নিজস্ব চাকরি প্রবিধানমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

অভিযুক্তরা হলেন- পিডিবিএফের প্রশাসনিক কর্মকর্তা এমডি নজরুল ইসলাম, প্রশাসনিক কর্মকর্তা তাপস কান্তি চন্দ ও প্রকল্প ব্যবস্থাপক (সৌরশক্তি প্রকল্প) মাহবুব হোসেন। এই সৌরশক্তি প্রকল্পেই তাঁরা ঠিকাদারি করছেন। গত চার বছরে তাঁরা অন্তত সাড়ে ৬ কোটি টাকার ঠিকাদারি কাজ করে বিল তুলেছেন।

ওই তিন কর্মকর্তার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম আমিতি ডিস্ট্রিবিউশন লিমিটেড। ঠিকানা ২৬/৩, পুরানা পল্টন লাইন, ঢাকা। প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নরসিংদীর রায়পুরা ইউনিয়নের মধ্যনগর গ্রামের বাসিন্দা মাহমুদুল হক। আর পরিচালক হিসেবে আছেন পিডিবিএফের ওই তিন কর্মকর্তা।

তবে মাহমুদুল হক সমকালকে বলেন, 'ওদের পরামর্শেই কোম্পানিটা খুলেছিলাম। কয়েকটা কাজও করেছিলাম। পরে ওরা বলছে, তারা সরকারি চাকরি করে। এ অবস্থায় ঠিকাদারি করতে হলে ঝামেলা হতে পারে। এ জন্য এখন আর কোনো কাজ করছি না।'

আমিতি ডিস্ট্রিবিউশনের পরিচালক ও পিডিবিএফের প্রশাসনিক কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম বলেন, কোম্পানি খুললেও তাঁরা কোনো কাজ করেননি। কোম্পানিটি ক্লোজ করে দিয়েছেন। এখন আর কোম্পানির কার্যক্রম নেই। তবে পিডিবিএফের নথিপত্র থেকে দেখা গেছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এক কোটি ৭৮ লাখ, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৫ কোটি ৫৮ লাখ এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে এক কোটি টাকার কাজ শেষ করে বিল তুলেছে আমিতি।

সূত্র জানায়, পিডিবিএফের একটি সৌরশক্তি প্রকল্পের মাধ্যমে মফস্বলের রাস্তায় সড়কবাতি স্থাপনের কাজ করা হয়। এই কাজই করেছে আমিতি। প্রতিষ্ঠানটি দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট, সিরাজগঞ্জের তাড়াশ, টাঙ্গাইলের বাসাইল ও গোপালপুর, চট্টগ্রামের আনোয়ারা, নরসিংদী সদর, নাটোরের বাগাতিপাড়া, কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর, মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর ও ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুরে সৌরবাতি বসানোর কাজ করেছে।

অভিযোগ আছে, তাপস চন্দ পিডিবিএফের সৌরশক্তি প্রকল্পের প্রকল্প ব্যবস্থাপক এবং নজরুল ইসলাম ও মাহবুব হোসেন প্রশাসনিক কর্মকর্তা হওয়ায় নিজেরা যোগসাজশ করে সহজেই এ কাজ করেছেন।

তবে তাঁদের এ ঠিকাদারি ব্যবসা সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা ১৯৭৯-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। যেমন এর বিধি-১৬-তে বলা হয়েছে, 'সরকারি কর্মচারী কোনো ব্যাংক বা অন্য কোনো কোম্পানি স্থাপন, নিবন্ধীকরণ বা ব্যবস্থাপনায় অংশগ্রহণ করতে পারবেন না।' আবার বিধি-১৭-তে বলা হয়েছে, 'কোনো সরকারি কর্মচারী সরকারের পূর্বানুমোদন ব্যতিরেকে সরকারি কার্য ব্যতীত অন্য কোনো ব্যবসায় জড়িত হতে অথবা অন্য কোনো চাকরি বা কার্য গ্রহণ করতে পারবেন না।'

এ ছাড়া পিডিবিএফের চাকরি প্রবিধানমালা ৪/২০০১-এর সাধারণ আচরণ ও শৃঙ্খলা ৪০(ঙ) ধারায় বলা হয়েছে, 'উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের অনুমতি ব্যতীত বাহিরের কোনো চাকুরি গ্রহণ করিবেন না।' অথচ এসব বিধি অমান্য করে তাঁরা পিডিবিএফের কোটি কোটি টাকার ঠিকাদারি ব্যবসা করছেন।

এ প্রসঙ্গে পিডিবিএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মওদুদ-উর রশিদ সফদার সমকালকে বলেন, এ ধরনের ঘটনা ঘটে থাকলে তা তাঁর দায়িত্ব নেওয়ার আগে ঘটেছে। তাঁর আমলে এমনটা ঘটেছে বলে জানা নেই। পরে ওই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিল নেওয়ার তথ্য তাঁকে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানোর পর তিনি ফোনে জানান, বিষয়টি তদন্ত করে দেখবেন। সত্য হয়ে থাকলে ব্যবস্থা নেবেন।