ট্রেনে তিন বছরের কম বয়সের শিশুর ভাড়া লাগে না। ৩ থেকে ১২ বছরের শিশুরা যাতায়াত করতে পারে অর্ধেক ভাড়ায়। তবে আগামী ডিসেম্বরে চালু হতে যাওয়া ঢাকার মেট্রোরেলে এর কোনো সুবিধাই থাকছে না। সব শিশুর জন্য গুনতে হবে প্রাপ্তবয়স্কদের সমান ভাড়া। অথচ পাশের দেশ ভারতের দিল্লি ও কলকাতার মেট্রোরেলেও শিশুর জন্য ভাড়ায় ছাড় রয়েছে। দিয়াবাড়ী থেকে কমলাপুর পর্যন্ত নির্মাণাধীন মেট্রোরেলের (এমআরটি-৬) দিয়াবাড়ী-আগারগাঁও অংশ আগামী ১৬ ডিসেম্বর চালু হবে বলে আশা করা হচ্ছে। গত ৮ সেপ্টেম্বর ভাড়ার তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। তালিকা অনুযায়ী, মেট্রোরেলে সর্বনিম্ন ভাড়া ২০ টাকা। উত্তরা নর্থ স্টেশন (দিয়াবাড়ী) থেকে আগারগাঁওয়ের ভাড়া ৬০ টাকা। কমলাপুর পর্যন্ত ভাড়া ১০০ টাকা। স্মার্ট কার্ডে ভাড়া পরিশোধ করলে ১০ শতাংশ ছাড় পাবেন যাত্রীরা। বিনা ভাড়ায় ভ্রমণ করতে পারবেন যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধারা।

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের প্রতিটি সিঙ্গেল ট্রিপে ভাড়ায় ছাড় দিতে মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডকে (ডিএমটিসিএল) সুপারিশ করেছে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) ভাড়া নির্ধারণ কমিটি। তবে রেয়াত বা ছাড় দেওয়া হবে কিনা- তা নির্ধারণ করবে ডিএমটিসিএল।

ছুটির দিন বাদে অন্য সময়ে শিক্ষার্থীরা ঢাকা ও চট্টগ্রামের গণপরিবহনের বাসে অর্ধেক ভাড়ায় যাতায়াত করতে পারেন। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে গত ৫ ডিসেম্বর তাঁদের জন্য পৃথক ভাড়া নির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ। বেসরকারি মালিকানাধীন বাসে শিক্ষার্থীদের জন্য অর্ধেক ভাড়া কার্যকর হলেও শতভাগ সরকারি কোম্পানি ডিএমটিসিএলে মেট্রোরেলে এ সুবিধা থাকছে না। ইতোমধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ভাড়ার দাবি জানিয়েছে।

এদিকে, ২১ দশমিক ২৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি-৬ লাইনে ভাড়া ২০ থেকে ১০০ টাকা। তবে দিল্লির মেট্রোরেলে ভাড়া ১০ থেকে ৬০ রুপি। সেখানে ২১ কিলোমিটার পর্যন্ত ভাড়া ৪০ রুপি। ঢাকার সঙ্গে তুলনা করলে, এই পথে দিল্লিতে ভাড়া সাড়ে ১২ থেকে ৫০ টাকা। দিল্লির মেট্রোতে তিন ফুট বা ৯০ সেন্টিমিটারের কম উচ্চতার শিশুরা প্রাপ্তবয়স্ক সঙ্গীর সঙ্গে বিনা ভাড়ায় যাতায়াত করতে পারে। কলকাতা মেট্রোতে পাঁচ বছরের কম বয়সের শিশুরা একই সুবিধা পায়।

ঢাকার মেট্রোরেলের ভাড়া নির্ধারণ কমিটির সভাপতি ছিলেন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব নীলিমা আখতার। মেট্রোরেলে শিশুদেরও পুরো ভাড়া দিতে হবে কিনা- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ভাড়া নির্ধারণের সময় এ বিষয়টি আসেনি। আসলে শিশুদের কথা বিবেচনা করা হয়নি।

মেট্রোরেল আইন ভাড়া নির্ধারণে ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালকের নেতৃত্বে সাত সদস্যের কমিটি রয়েছে। কমিটির এক সদস্য সমকালকে জানান, শিশুদের বিষয়টি উল্লেখ না থাকায় কোলের সন্তানের জন্যও পুরো ভাড়া লাগবে মেট্রোরেলে। স্টেশনের পরিদর্শকরা হয়তো কোলের শিশুর বিষয়ে কঠোর হবেন না। কিন্তু হাঁটতে পারে- এমন শিশুর ভাড়া লাগবে।

উড়োজাহাজেও শিশুদের ভাড়ায় ছাড় রয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত পরিবহন বাংলাদেশ বিমানে শূন্য থেকে দুই বছরের শিশুরা ১০ শতাংশ ভাড়ায় যাতায়াত করতে পারে। দুই থেকে ১২ বছরের শিশুদের ভাড়া প্রাপ্তবয়স্ক যাত্রীর ৭৫ শতাংশ।

দিল্লি ও কলকাতার মেট্রোরেলে শিশুদের ভাড়ায় ছাড়ের বিষয়টি অবশ্য প্রথমে সঠিক নয় বলে দাবি করেন ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ এন ছিদ্দিক। ওই দুই শহরের হালনাগাদ ভাড়ার তালিকাতেও ছাড় রয়েছে- এ তথ্য জানানোর পর তিনি বলেন, 'কীভাবে নির্ধারণ করা হবে কোন শিশুর বয়স কত। এতে বরং বিশৃঙ্খলা হবে। উচ্চতার ভিত্তিতে শিশুদের ভাড়ায় ছাড় দেওয়ার প্রক্রিয়া অনুসরণ করাও সহজ নয়। স্টেশনে তো তাহলে উচ্চতা মাপার যন্ত্র বসাতে হবে।' ট্রেনে ছাড় রয়েছে, মেট্রোরেলে কেন শিশুদের জন্য পূর্ণ ভাড়া দিতে হবে- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ডিএমটিসিএল বাংলাদেশ রেলওয়ের মতো নয়। এভাবে ভাড়ায় ছাড় দেওয়া যাবে না।

ভারত, পাকিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশে মেট্রোরেলে ভাড়া বেশি- এ অভিযোগ তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা চলছে। ঢাকায় বাসের ভাড়া কিলোমিটারে ২ টাকা ৪৫ পয়সা। মেট্রোরেলে কিলোমিটারে ভাড়া ৫ টাকা। ঢাকায় বাসে সর্বনিম্ন ভাড়া ৮ টাকা। মেট্রোরেলে ২০ টাকা। মিরপুর-১০ নম্বর থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত বাসে ভাড়া ১৬ টাকা। মেট্রোরেলে ৩০ টাকা। বাসের তুলনায় অনেক কম সময়ে এবং যানজট এড়িয়ে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মেট্রোরেলে যাতায়াত করা যাবে- এ যুক্তিতে ভাড়া বাসের তুলনায় বেশি নয় বলে অভিমত নীলিমা আখতারের।

গণপরিবহনের আনুষ্ঠানিক ভাড়ার তালিকাতেও শিশুদের জন্য ছাড় নেই। তবে ঢাকার একাধিক বাস মালিক সমকালকে জানান, কোলে বসে যেসব শিশু যাতায়াত করে, তাদের জন্য আলাদা করে ভাড়া নেওয়া হয় না। কাজীপাড়ার বাসিন্দা রোমানা আক্তার জানান, প্রথম শ্রেণিতে পড়া সন্তানকে স্কুলে পৌঁছে দিতে প্রতিদিন তিনি মিরপুর-১০ নম্বরে যান। বাসে আসা ও যাওয়ায় ১০ টাকা করে ২০ টাকা ভাড়া লাগে। মেট্রোরেলে শিশুর জন্য ছাড় না থাকলে ৪০ টাকা করে আসা ও যাওয়ায় ৮০ টাকা লাগবে।

মেট্রোরেলের বগিতে সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা ২ হাজার ৩০৮ যাত্রী। দুই মিনিটেরও কম সময়ে এক স্টেশন থেকে আরেক স্টেশনে যাবে মেট্রোরেলের বিদ্যুৎচালিত ট্রেন। স্মার্ট কার্ড ছাড়াও স্টেশন থেকে টিকিট কেটে ভ্রমণ করা যাবে ৩৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকায় নির্মাণাধীন মেট্রোরেলে। ভাড়া টাকায় ট্রেন পরিচালনার ব্যয় এবং নির্মাণ খরচের ঋণ শোধ করতে হবে। ভাড়ার টাকায় তা হবে না, ফলে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হবে।