জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের মাধ্যমে আফ্রিকায় পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় দুই সহকর্মীর সঙ্গে প্রাণ হারিয়েছেন সৈনিক শরীফ হোসেন (২৬)। টহলরত গাড়িতে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় অকালে প্রাণ হারান তিনি। মঙ্গলবার সকাল ৯টার দিকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মাধ্যমে দুর্ঘটনার খবর পেয়ে শোকে মুহ্যমান তার স্বজনরা। দিনভর কাঁদতে কাঁদতে যেন চোখের পানি শুকিয়ে গেছে তার বাবা-মা, ভাইবোন ও স্ত্রীসহ স্বজনদের। এখন তারা শরীফের লাশের অপেক্ষায় রয়েছেন।

নিহত শরীফ হোসেন সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলা সদরের বেড়াখাড়ুয়া গ্রামের লেবু তালুকদারের ছেলে। বাবা-মা, দু’ভাই-বোন ও শরীফের সদ্য বিবাহিত স্ত্রীসহ বেলকুচির গ্রামের বাড়িতে পাঁচজনের বসবাস।

শরীফের ছোট ভাই কাউসার হোসেন মঙ্গলবার রাতে সমকালকে বলেন, ‘বেলকুচির আলহাজ সিদ্দিক উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাশ করার পর গত ২০১৭ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে সৈনিক পদে যোগদান করেন বড় ভাই শরীফ। গত বছর ডিসেম্বর মিশনে যাওয়ার আগে ভাই বিয়েও করেন। আজ (মঙ্গলবার) সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ফোন করে ‘মামুন হক’ পরিচয় দিয়ে তার সহকর্মী আমাদের বলেন, ‘পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় টহলরত গাড়িতে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় শরীফ গুরতর আহত হয়েছেন। আপনারা তার জন্য দোয়া করবেন।’ এর আধাঘণ্টা পর আবারও ফোন করে জানালেন, ‘শরীফ ভাই আর দুনিয়াতে নেই।’ এরপর আমরা বাড়ির কেউই আর কান্না থামাতে পারছি না। বাবা-মা ও ভাবিসহ বাড়ির সবাই এখন প্রহর গুনছি কখন তার লাশ আসবে।’ 

শরীফের চাচাতো ভাই হাবিব বলেন, ‘চাচা-চাচির মানসিক আবস্থা ভাল না। ভাবির নতুন বিয়ে হয়েছে। এখনও সংসার শুরু হয়নি। অথচ তার আগেই শরীফ ভাই দুনিয়া থেকে চলেন গেলেন। এ কথা ভাবতেই যেন আমাদের চোখের পানি আটকাতে পারছি না।’ প্রতিবেশী এরশাদ আলী বলেন, ‘দারিদ্র্যতার কারণে শরীফের ছোট ভাই কাউসার ও বোন লাকী পড়াশুনা করাতে পারেনি। তাই তাদের প্রতিষ্ঠিত করতে বাবাকে দিয়ে তাঁত ব্যবসাও শুরু করেছিল শরীফ। মিশন থেকে টাকা-পয়সা পাঠিয়ে বাবা ও ভাইকে দিয়ে বাড়িতে বিদ্যুৎ চালিত চারটি মেশিনও বসাতে সহয়তা করে শরীফ।’        

আইএসপিআর সূত্রে জানা যায়, সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকের পশ্চিম সেক্টরে বোয়ার এলাকায় মোতায়েন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি পদাতিক ব্যাটালিয়ন (ব্যানব্যাট-৮) ২০২১ সালের ৯ নভেম্বর থেকে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে শান্তিক্ষায় নিয়োজিত রয়েছে। দুর্গম এলাকায় মোতায়েন অন্যতম অস্থায়ী ক্যাম্প কুই থেকে পরিচালিত যান্ত্রিক টহলের একটি দল মেজর আশরাফের নেতৃত্বে স্থানীয় সময় গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় কাইতা এলাকায় টহলে যায়। বাংলাদেশ সময় রাত ১টা ৩৫ মিনিটে ফেরার পথে টহল কমান্ডার মেজর আশরাফকে বহনকারী প্রথম গাড়িটি মাটিতে পুঁতে রাখা আইইডি বিস্ফোরণে পতিত হয়। এতে গাড়িটি প্রায় ১৫ ফুট দূরত্বে ছিটকে পড়ে। ঘটনাস্থলেই সৈনিক শরিফ, সৈনিক জাহাংগীর ও সৈনিক জসিম মারাত্মকভাবে আহত হন। জরুরি ভিত্তিতে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য ১৪৪ কিলোমিটার দূরে দূরে বোয়ারে মিনুসকা হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা তাদের মৃত ঘোষণা করেন। আহত শান্তিরক্ষী মেজর মো. আশরাফুল হক চিকিৎসাধীন। বর্তমানে তার অবস্থা স্থিতিশীল। সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকে নিয়োজিত অন্যান্য শান্তিক্ষীরা নিরাপদে আছেন।