জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শাহাদাতবরণের পর কলঙ্কময় ৩ নভেম্বর জেল হত্যাকাণ্ডে শহীদ হন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। সেদিন ছিল ২২ আগস্ট। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নেওয়ার আগে স্ত্রী সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীনকে প্রয়োজনীয় কিছু কাগজপত্র বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। 'কেন এসব বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে'- স্ত্রীর এমন জিজ্ঞাসার জবাবে তিনি বলেছিলেন, 'আমি আর নাও ফিরে আসতে পারি।' অর্থাৎ জেলে খুন হতে পারেন- এই আশঙ্কা ছিল তাজউদ্দীন আহমদের। শেষ পর্যন্ত তাঁর ওই আশঙ্কাই সত্য হয়েছে।
সমকালের সঙ্গে আলাপকালে এভাবেই বাবা হারানোর দুঃসহ স্মৃতিচারণ করেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক তাজউদ্দীন আহমদের সন্তান তানজিম আহমদ সোহেল তাজ। তিনি আরও বলেছেন, 'আমার বয়স তখন ৬। নিজ হাতে বাবাকে দাফনের পরও বাসায় ফিরে মায়ের কাছে জানতে চেয়েছি, বাবা কোথায়? কখন আসবেন? দীর্ঘদিন আমাকে বলা হতো, বাবা বিদেশ গেছেন। চলে আসবেন। কিন্তু বাবা আর আসেননি। আসবেনও না। বাবা হারানোর আঘাত এবং ক্ষত এখনও যায়নি আমার।'

সোহেল তাজ জানান, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাসায় মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের সময় গুলির শব্দ শুনে ঘুম ভেঙেছিল তাঁর। ওই সময় তাঁদের ধানমন্ডির সাতমসজিদ রোডের বাড়িটি ঘিরে রেখেছিল ২০-৩০ জন সশস্ত্র সেনাসদস্য। তারা তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে কথা বলছিল। বিচ্ছিন্ন করেছিল টেলিফোন সংযোগ। বাড়ির সবাইকে গৃহবন্দি করে রাখে তারা।

সোহেল তাজ তাঁর বাবাকে দেখতে কয়েকবারই কারাগারে গেছেন। প্রতিবারই কারাগারের বন্দিদশার দুর্বিষহ যন্ত্রণা বেমালুম ভুলে গিয়ে তাজউদ্দীন আহমদ তাঁর প্রিয় সন্তানকে দেশ ও মানুষকে ভালোবাসার কথা শিখিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বাবা খবর দেওয়ায় হত্যাকাণ্ডের আগের দিন কারাগারে গিয়েছিলেন মা। কিছু একটা ঘটার আশঙ্কা অনুভব করছিলেন বাবা। তিনি কারাগারকে রেড ক্রসের আওতায় আনার চেষ্টা করতে বলেছিলেন মাকে। সেটা হলে হয়তো হত্যাকাণ্ডটি এড়ানো যেত।

তাজউদ্দীন আহমদ ৩ নভেম্বর ভোরে কারাগারে শহীদ হলেও সন্ধ্যার দিকে বাবা হারানোর দুঃসহ সংবাদ শুনতে পান সোহেল তাজ। এর আগে দিনভর গুজব ছড়িয়ে পড়ে- জাতীয় চার নেতা মুক্তি পাচ্ছেন, তাঁরা বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার করবেন। আবার কারাগার থেকে গুলির শব্দও আসছিল।
মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠকের এই সন্তান আরও বলেছেন, হত্যাকাণ্ডের পর খুনিরা অযত্ন-অবহেলায় তাজউদ্দীন আহমদের লাশ ফেলে রাখে। ৪ নভেম্বর শেষ বিকেলে মরদেহ আনা হয় বাসায়। সেদিনই রাজধানীর বনানী কবরস্থানে সমাহিত হন তিনি।
তানজিম আহমেদ সোহেল তাজ তাঁর বাবার আত্মদানে গর্বিত। তিনি বলেছেন, 'আমার বাবা জীবন দিয়ে বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাঁর আস্থা-বিশ্বাসের প্রমাণ দিয়ে গেছেন। আদর্শের প্রশ্নে অবিচল ছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলো, ৪৭ বছরেও জাতীয় চার নেতার অবদান স্বীকৃতি পেল না। মুজিবনগর সরকার ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এখনও সঠিক তথ্য প্রকাশ পায়নি। এটা ভবিষ্যতের জন্য অন্ধকার ডেকে আনবে। তাই প্রাণশক্তির জোগান দিতে নতুন প্রজন্মকে গৌরবের ইতিহাস জানাতে হবে।

এ জন্য তিন দফা দাবি উত্থাপন করেছেন সোহেল তাজ। তিনি দাবি আদায়ের জন্য সংসদ ভবন অভিমুখে পদযাত্রা ও স্পিকারের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, '৪৭টি বছর পেরিয়ে গেল। অথচ জাতীয় বীর সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামারুজ্জামান রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি পেলেন না। এটা মেনে নেওয়া যায় না। অথচ তাঁদের নেতৃত্বেই সফলভাবে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছিল। তাঁদের নেতৃত্বেই জাতি পেয়েছে বাংলাদেশ নামে স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র। তাঁদের প্রচেষ্টায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে বাংলার বুকে ফিরে পেয়েছে জাতি।'

তিনি বলেছেন, ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠিত হয়। তাই এই দিনটিকে 'প্রজাতন্ত্র দিবস' ঘোষণা করতে হবে। ৩ নভেম্বর কলঙ্কময় জেলহত্যা দিবসকে জাতীয় শোক দিবস হিসেবে ঘোষণা করে রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করতে হবে। জাতীয় চার নেতাসহ মুক্তিযুদ্ধের সব বেসামরিক-সামরিক সংগঠক, পরিচালক, অমর শহীদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নাম, অবদান, জীবনীসহ মুক্তিযুদ্ধের সঠিক এবং পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস যথাযথ মর্যাদা ও গুরুত্বের সঙ্গে পাঠ্যপুস্তকসহ সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এই তিন দাবি ন্যায্য ও যৌক্তিক। এটা স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের সবার প্রাণের দাবি।

এসব দাবি নিয়ে সরকারের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব বাড়বে কিনা- এই প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সোহেল তাজ বলেছেন, দূরত্ব বাড়বে কেন? তিন দফা দাবি মেনে নেওয়া হলে আওয়ামী লীগই লাভবান হবে। তিনি আরও বলেছেন, বর্তমান সরকার গত ১০-১২ বছর নানা কাজে ব্যস্ত রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পদ্মা সেতু নির্মাণসহ দেশজুড়ে ব্যাপক উন্নয়নমূলক কাজ হয়েছে। এখন তিন দফা দাবি বাস্তবায়নে মনোযোগী হতে হবে।

সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে আসা সোহেল তাজ পদত্যাগও করেছেন। সেই থেকে তিনি আওয়ামী লীগ ঘরানার রাজনীতিতে নিষ্ফ্ক্রিয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তিনি আলোচনার শিরোনাম হয়েছেন। অনেকেই জানতে চাইছেন, তিনি কি আবার আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হচ্ছেন- এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, 'আমার রক্তে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগ আমার রাজনীতি। আমি আওয়ামী লীগ পরিবারের সদস্য। আওয়ামী লীগই আমার শেষ ঠিকানা। তাই আমাকে ডাকা হলে দেশ ও দলের প্রয়োজনে অবশ্যই সাড়া দেব। আমি সাধ্যমতো ইতিবাচক ভূমিকা রাখার চেষ্টা করব।'



বিষয় : জেলে খুন হওয়ার আশঙ্কা ছিল তাজউদ্দীনের

মন্তব্য করুন