রাজধানীর বেসরকারি স্কুলের প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছয় বছরের শারমীন আক্তার। ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে গত চার দিন বারডেম জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি। চিকিৎসকের পরামর্শে নেওয়া হয়েছে আইসিইউতে। শারীরিক অবস্থা কিছুটা উন্নতি হলেও এখনও শঙ্কা কাটেনি। উদ্বেগের বিষয়, এ শিশুর ডেঙ্গু উপসর্গ ছিল ভিন্ন। জ্বরের সঙ্গে ডায়রিয়া, পেট ব্যথা, বমি দেখা দিলে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। পরে পরীক্ষা করে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। শুধু শারমীনই নয়, সম্প্রতি ডেঙ্গু আক্রান্ত অনেক শিশু ভিন্ন উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, গতকাল মঙ্গলবার ডেঙ্গুতে শিশুসহ আরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে।

চিকিৎসকরা বলছেন, শিশুদের ডেঙ্গুর উপসর্গ ও ধরনে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। তারা নতুন লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে আসছে। আগে এ রকম দেখা যায়নি। এমন অনেক শিশু আসছে যাদের জ্বর নেই। তবে পরীক্ষার পর ডেঙ্গু ধরা পড়ছে। অনেকেই গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। হঠাৎ অবস্থার অবনতি হয়ে মারা যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে শিশুদের তীব্র জ্বর দেখা দিলেই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, দেশে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর ৩৩ শতাংশই শিশু। শিশুদের অবস্থা দ্রুত অবনতি হওয়ায় হাসপাতালে ভর্তি ৭২ ঘণ্টায় মধ্যে তারা মারা যাচ্ছে। ৪৮ শতাংশই মৃত্যু হয়েছে হাসপাতালে ভর্তির তিন দিনের মধ্যে। মোট ডেঙ্গু আক্রান্তের ২৬ শতাংশ শিশু।

শিশু হাসপাতালের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক সফি আহমেদ সমকালকে বলেন, এবার ডেঙ্গুতে শিশুদের ডায়রিয়া, পেটে ব্যথা, বমি, খাদ্যনালিতে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। কার্ডিয়াক কমপ্লিকেশন, নিউরোলজিক্যাল কমপ্লিকেশনও হচ্ছে। মোটা ও বেশি ওজনের শিশুদের দ্রুত সময়ে শক সিমড্রম দেখা দিচ্ছে। তিনি বলেন, আগে দ্বিতীয়বার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত শিশুদের যেসব জটিলতা দেখা দিত, এবার প্রথম বার আক্রান্তদের সেসব জটিলতা দেখা দিচ্ছে।

করোনা নিয়ন্ত্রণে গঠিত জাতীয় কারিগরি কমিটির সভাপতি ও শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সহিদুল্লাহ বলেন, আগে শুধু জ্বর দেখা দিলেও এবার অনেক শিশু জ্বর ছাড়া ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছে। অনেকের মাথা ব্যথা, হূৎস্পন্দন বেড়ে যাওয়াসহ মস্তিস্কে নানা জটিলতা দেখা দিচ্ছে। আক্রান্তদের অবস্থা দ্রুত সময়ের মধ্যে অবনতির দিকে যাচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের (এনসিডিসি) লাইন ডিরেক্টর রোবেদ আমিন বলেন, ডেঙ্গুজনিত রোগীর মৃত্যুঝুঁকি কমাতে রক্তচাপ কমে যাওয়া, অবসাদগ্রস্ততা, ঘাম হওয়া ও বমিভাব দেখা দিলেই তাৎক্ষণিকভাবে হাসপাতালে ভর্তি করে ফ্লুইড বা স্যালাইন দেওয়া জরুরি। সঠিক সময়ে সঠিক ফ্লুইড না দিলে ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যুঝুঁকি থাকে। তিনি বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা এবং ডেঙ্গু হলে রোগী ব্যবস্থাপনা নিয়ে লোকজনকে আরও সচেতন হতে হবে।

কীটতত্ত্ববিদ ও বাংলাদেশ প্রাণিবিজ্ঞান সমিতির সাবেক সভাপতি মঞ্জুর আহমেদ চৌধুরী বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এডিস মশা নিধন কার্যক্রমে গতি নেই। মশা ধ্বংসকরণে প্রয়োজনীয় ওষুধ ছিটানো হয় না। মাঠ পর্যায়ে এ কার্যক্রমে মনিটরিংয়ে দেখা মেলেনি কাউন্সিলরদের। সচেতনতামূলক কর্মসূচির ঘাটতি রয়েছে। এ কারণে এবার বেড়েছে ডেঙ্গুর প্রকোপ।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জোবায়দুর রহমান বলেন, ডিএনসিসি প্রতি ওয়ার্ডে মশা নিধন কর্মসূচি পরিচালনা করছে।

আরও পাঁচ মৃত্যু :গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় আরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে আট বছরের এক শিশুও রয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সে মারা যায়। এ বছর ডেঙ্গুতে এখন পর্যন্ত ১৮২ জনের মৃত্যু হলো। এরমধ্যে ১১২ জন ঢাকায় এবং ঢাকার বাইরে ৭০ জন মারা যান। চলতি মাসে ৪১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ মাসে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ৬ হাজার ৭৭৮ জন।