জার্মান দূতাবাসের এক কূটনীতিকের ছোট্ট এক টুইট বার্তা। তাতেই রাতারাতি লেগে গেল রাজধানীর অভিজাত গুলশান এলাকার খোলা ম্যানহোলগুলোর ঢাকনা। গত সোমবার দুপুরে ওই কূটনীতিক টুইট বার্তায় ম্যানহোলে পড়ে আহত হওয়ার বিষয় জানান। সেই বার্তা তিন ঘণ্টা পরই নজরে আসে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি)। এর পরই নেমে পড়েন ডিএনসিসির মাঠকর্মীরা। তবে দুর্ঘটনাস্থল হিসেবে তিনি যে স্থানটি উল্লেখ করেছিলেন, সেখানে তাঁরা কোনো ঢাকনাহীন ম্যানহোল খুঁজে পাননি। পরে গুলশানের ৭৫ নম্বর রোডে একটি খোলা ম্যানহোল দেখতে পান। রাতেই ডিএনসিসি কর্মীরা সেটি মেরামত করে দেন। পরে গুলশান এলাকায় আরও এ রকম সাতটি ঢাকনাহীন ম্যানহোলের খোঁজ মেলে। সেগুলোও মেরামত করে লোহার খাঁচার বদলে স্লাব লাগিয়ে দেওয়া হয়।

সংশ্নিষ্টরা বলছেন, এমন দুর্ঘটনা নতুন নয়। ২০১৪ সালে ঢাকনাহীন ম্যানহোলে পড়ে রাজধানীর শাহজাহানপুরে শিশু জিহাদ মারা যায়। ২০১৫ সালে শ্যামপুরে খোলা নর্দমায় পড়ে মারা যায় আরেক শিশু নীরব। এ ছাড়া ঝুমবৃষ্টি হলেই ম্যানহোলে পড়ে আহত হওয়ার ঘটনা ঘটে অহরহ। মাঝেমধ্যেই নগরবাসী ম্যানহোলে পড়ে আহত হন। তবে সেগুলো আসে না আলোচনায়। এবার জার্মান দূতাবাসের উপরাষ্ট্রদূতের আহত হওয়ার পর বিষয়টি বড় নাড়া দিয়েছে। এ ব্যাপারে ডিএনসিসির ৩ নম্বর অঞ্চলের (গুলশান এলাকা) নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহিল বাকি সমকালের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি। পরে ডিএনসিসির মুখপাত্র মকবুল হোসেন সমকালকে বলেন, জার্মান কূটনীতিকের টুইট বার্তার পর গুলশান এলাকায় আটটি ঢাকনাহীন ম্যানহোল পাওয়া যায়। সেগুলো সোমবার রাতেই ঠিক করা হয়েছে। যেখানেই খোলা ম্যানহোল পাওয়া যাবে, সেগুলো দ্রুত মেরামতের জন্য মেয়র নির্দেশনা দিয়েছেন। নগরবাসী 'আমার ঢাকা' অ্যাপসের মাধ্যমেও বিষয়টি জানাতে পারেন।
তবে ডিএনসিসির এক প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ম্যানহোল নিয়ে তাঁরা দীর্ঘদিন বিড়ম্বনায় আছেন।

মাঝেমধ্যেই ঢাকনা চুরি হয়ে যায়। এ নিয়ে গুলশান-বনানী থানায় এ পর্যন্ত অর্ধশতাধিক সাধারণ ডায়েরি ও মামলা করেছে ডিএনসিসি। কখনোই কোনো ঢাকনা উদ্ধার করা যায়নি। এখন ঢাকনা চুরি হলে মামলা তো দূরের কথা, সাধারণ ডায়েরিও নিতে চায় না।

গুলশানের ৮০ নম্বর সড়কে নরডিক ক্লাবের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত পুলিশ কর্মকর্তা সাদ্দাম বলেন, এ রকম কোনো ব্যক্তির ম্যানহোলে পড়ে আহত হওয়ার খবর আমরা পাইনি। আশপাশে কোনো ঢাকনাহীন ম্যানহোলও চোখে পড়েনি।
ডিএনসিসিতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তারা ৭৫ নম্বর সড়কের ফুটপাতে একটি ঢাকনাহীন ম্যানহোল পান। অন্য কয়েকটি সড়কেও ছিল কিছু ঢাকনাহীন ম্যানহোল। ডিএনসিসি ধারণা করছে, ৭৫ নম্বর রোডের ওই ফুটপাতের ড্রেন বক্সের ওই খাঁচাটিই উন্মুক্ত ছিল। ৮০ নম্বর রোড ও নরডিক ক্লাবের নিকটবর্তী হিসেবে ওই ড্রেন বক্সে পড়েই জার্মান কূটনীতিক আহত হতে পারেন।
জানা যায়, ঢাকায় নিযুক্ত জার্মানির উপরাষ্ট্রদূত জা জেনোস্কি হুইলচেয়ারে বসা অবস্থায় একটি ছবি দিয়ে সোমবার এক টুইট বার্তায় লেখেন, ঢাকাকে তিনি পছন্দ করেন। তবে তিনি জানতেন, পথ চলতে যত সতর্কই থাকুন, রাতে নগরীর ঢাকনাহীন ম্যানহোলের একটিতে পড়বেনই!

বিষয়টি নজরে আসার সঙ্গে সঙ্গে ডিএনসিসি মেয়র আতিকুল ইসলাম দুঃখ প্রকাশ করে ম্যানহোলটির অবস্থান জানতে চান, যাতে ডিএনসিসি দ্রুত মেরামত করে দিতে পারে। মেয়রের জবাবে উপরাষ্ট্রদূত আরেক টুইট বার্তায় জানান, খোলা ম্যানহোলটি গুলশানের ৮০ নম্বর সড়কে নরডিক ক্লাবের কাছাকাছি।
জা জেনোস্কির ওই টুইট বার্তার পর জার্মান বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক বার্নড স্পেইনার ভস্মে ঘি ঢালেন। তিনি আরেক টুইট বার্তায় লেখেন, তিনিও একই ধরনের ঘটনার শিকার হয়েছিলেন। ভাগ্যিস পা ভাঙেনি! তবে পুরোনো একটি স্যুটের ট্রাউজার নষ্ট হয়ে গিয়েছিল।

পাল্টা জবাবে জা জেনোস্কি বলেন, এ নিয়ে এক বছরে তিন জার্মান গুলশানের রাস্তার শিকারে পরিণত হলেন!

জানা গেছে, রাজধানীতে গড়ে প্রতি ৩০ মিটার অন্তর একটি ম্যানহোল রয়েছে। ঢাকা ওয়াসার ৩৫০ কিলোমিটার ভূগর্ভস্থ নালা এবং ৮৮০ কিলোমিটার পয়ঃনালায় ম্যানহোল রয়েছে ৪১ হাজার। দুই সিটি করপোরেশনের রয়েছে আরও ৩৩ হাজারের বেশি ম্যানহোল। এ ছাড়া গণপূর্ত অধিদপ্তর ও জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষেরও কিছু ম্যানহোল আছে। এসব সংস্থা ম্যানহোলে ঢাকনা লাগালেও কিছুদিন পরই সেগুলো খুঁজে পাওয়া যায় না। সংঘবদ্ধ চক্র চুরি করে ভাঙাড়ির দোকানে বেচে দেয়। আবার নানা কারণে সেগুলো ভেঙেও যায়। সব মিলিয়ে অন্তত ১০ শতাংশ ম্যানহোল সব সময় ঢাকনাহীনই থাকে। কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার কারণে সেগুলো দ্রুত পুনঃস্থাপিত হয় না।




বিষয় : ম্যানহোল ঢাকনাহীন

মন্তব্য করুন