টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার দর্শনই হচ্ছে উন্নয়ন হতে হবে সবার অংশগ্রহণে। সমাজের একটি বৃহৎ অংশ প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী। তাঁদের বাদ দিয়ে দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাঁদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে হবে। ভাতানির্ভর না রেখে তাঁদের দক্ষতা বাড়াতে সৃজনশীল উদ্যোগ নিতে হবে। প্রযুক্তিগত সম্ভাবনা ও সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দক্ষতা অনুযায়ী কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে, অবকাঠামোগুলো প্রতিবন্ধীবান্ধব গড়ে তুলতে হবে।

প্রতিবন্ধী দিবস উপলক্ষে বৃহস্পতিবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বেঙ্গল-আরটিভি স্টুুডিওতে 'সবার বাংলাদেশ' শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। এ আলোচনা সভায় মিডিয়া পার্টনার ছিল দৈনিক সমকাল ও আরটিভি। এতে বক্তারা বলেন, গণপরিবহন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি-বেসরকারি দপ্তরে নানা বৈষম্য ও অসহযোগিতার শিকার হচ্ছেন প্রতিবন্ধীরা। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই সচেতনতা সৃষ্টিতে শিক্ষা কাঠামো পরিবর্তন করতে হবে।
আলোচনায় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী তরিকুল ইসলাম নাজিম বলেন, সরকার প্রতিবন্ধীদের জন্য অনেক প্রকল্প নিলেও সেগুলো কাজে আসছে না। আবার অনেক প্রকল্প দীর্ঘদিন ধরে ধীরগতিতে এগোচ্ছে। সরকার প্রতিবন্ধীদের সমস্যা চিহ্নিত করতে গবেষণাগার করলে তাঁদের প্রত্যেকের সমস্যা অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারত। তিনি বলেন, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের পড়ালেখার জন্য এখনও দেশে সহজতর হয়নি। ব্রেইলে সব বই পাওয়া যায় না। অডিও পাওয়া যায় না। অনেক সময় পরীক্ষার আগের রাতেও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য বই পাওয়া যায় না।
শারীরিক প্রতিবন্ধী ও খেলোয়াড় নূর মোহাম্মদ বলেন, সম্প্রতি ভারতের এক টুর্নামেন্টের অংশগ্রহণের আগে প্রস্তুতি সভা উপলক্ষে তাঁকে সাড়ে ৪ কিলোমিটার পথ হুইলচেয়ারে করে যেতে হয়েছে। আজকে মাশরাফি বিন মুর্তজার মতো খেলোয়াড়দের কোনো আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের প্রশিক্ষণ বা সভায় অংশগ্রহণের আগে ভিআইপি গাড়ি পাঠানো হতো।
উইমেন উইথ ডিজঅ্যাবিলিটিজ ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ও প্রতিষ্ঠাতা আশরাফুন্নাহার মিষ্টি বলেন, এসএসসিতে স্টারমার্ক আর এইচএসসিতে ফার্স্ট ডিভিশন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গেলে তাঁকে বলা হয়, তোমার প্রতিবন্ধিতা আছে, তুমি এখানে পড়তে পারবে না। আসলে এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমাবদ্ধতা ছিল আমার কোনো সীমাবদ্ধতা ছিল না। তিনি বলেন, সমাজে ১২ ধরনের প্রতিবন্ধী আছে। রাষ্ট্রকে সব প্রতিবন্ধীর সব সুবিধা বাস্তবায়নের দায়িত্ব নিতে হবে। প্রতিবন্ধীদের জন্য ভাতার ব্যবস্থা নয়, তাঁদের জন্য দরকার সম্মানজনক জীবন ব্যবস্থা এবং দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তোলা।
সমকালের উপদেষ্টা সম্পাদক আবু সাঈদ খান বলেন, প্রতিবন্ধীদের এগিয়ে নিতে সমাজ ও রাষ্ট্রের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন করা দরকার। সমাজে ও পরিবারে অনেক ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধীদের আলাদা করে দেওয়া হয়। তিনি বলেন, বিশেষ প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা নেওয়া প্রতিবন্ধীদের সাধারণ শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। প্রযুক্তির সঙ্গে তাঁদের পরিচয় করতে হবে। অনেক প্রতিবন্ধী পড়াশোনা শেষে চাকরি পান না, তাঁদের চাকরির ব্যবস্থা করতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রতি ১ হাজার জনের মধ্যে ১০ জন প্রতিবন্ধীকে চাকরি দিতে হবে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. আব্দুল আজিজ বলেন, প্রতিবন্ধীদের প্রত্যেকের আলাদা সমস্যা চিহ্নিত করে রাষ্ট্রকে ভাবতে হবে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী কমিটির সদস্য কাজী কানিজ সুলতানা বলেন, সরকার প্রতিবন্ধীদের জন্য অনেকগুলো পদক্ষেপ নিয়েছে কিন্তু সামাজিক সচেতনতা ছাড়া তা বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ শাহীন বলেন, দেশে বর্তমানে ২৯ লাখ ৪২ হাজার প্রতিবন্ধী আছেন। এর মধ্যে ২৩ লাখ ৫৭ হাজার জনকে এ পর্যন্ত ভাতার আওতায় আনা হয়েছে। খুলনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের চলার জন্য 'হোয়াইট ক্যান' ডিভাইসটি আরও আপডেট করা হচ্ছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও আইসিটি বিভাগের সাবেক সচিব নজরুল ইসলাম বলেন, প্রতিবন্ধীদের জন্য মানসম্মত শিক্ষক নেই। তাঁদের প্রশিক্ষণের জন্য কোনো প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নেই। অনেক স্কুল প্রতিষ্ঠিত হলেও প্রশিক্ষিত শিক্ষক নেই। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রতিবন্ধীদের বিষয়ে বিভাগ খুলতে হবে এবং প্রাথমিক বিশ্ববিদ্যালয় ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রতিবন্ধীদের বিষয়ে লেখাপড়া করে লোকদের নিয়োগ দিতে হবে।