ঢাকা শনিবার, ১৮ মে ২০২৪

আবারও বিস্ফোরণ, মৃত্যু কান্না

জমজমাট সিদ্দিকবাজার মুহূর্তে মৃত্যুপুরী

জমজমাট সিদ্দিকবাজার মুহূর্তে মৃত্যুপুরী

রাজধানীর সিদ্দিকবাজারে বিস্ফোরণে ধ্বংসস্তূপে উদ্ধার অভিযান। বুধবার দুপুরে তোলা -মামুনুর রশিদ

সাহাদাত হোসেন পরশ

প্রকাশ: ০৮ মার্চ ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ০৮ মার্চ ২০২৩ | ২৩:১৭

রাজধানীর গুলিস্তানের পাশেই সিদ্দিকবাজার। সেখানকার নর্থ সাউথ সড়কটি খুব চেনা চা দোকানি মোহাম্মদ ফয়েজের। এই সড়কের ১৮০/১, ক্যাফে কুইন ভবনের উল্টো পাশেই প্রতিদিন সাতসকালে দোকান খুলে বসেন কুমিল্লার নাঙ্গলকোটের এই তরুণ। সদরঘাটের প্রবেশপথ হওয়ায় ফয়েজের চা বিকিকিনিও দিনরাত জম্পেশ। তবে মঙ্গলবারের বিকেলটা অনেকের মতো তাঁর কাছেও ছিল ভীতিময় আর বিভীষিকার। ক্যাফে কুইন ভবনে ভয়াবহ বিস্ফোরণের সময় তিনি দোকানে ক্রেতা সামলাচ্ছিলেন। ফয়েজ বললেন, ‘হঠাৎ কানের পর্দা ফাটানো শব্দ; কেঁপে উঠল আশপাশ। ধোঁয়া আর ধুলাবালিতে একাকার। ভয়ে প্রাণ বাঁচাতে শুয়ে পড়ি। কয়েক সেকেন্ড পর দেখি, ভবনের কাচ, ইট-পাথর, লোহার টুকরো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে সড়কে। ধ্বংসস্তূপের চারদিকে মানুষের চিৎকার আর রোদন। পোড়া রক্তমাখা দেহ। কারও হাত নেই, কারও নেই পা। সেই ভয়াল স্মৃতি মনের আয়নায় আর দেখতে চাই না।’

গেল রোববার সকালে রাজধানীর সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকায় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে বিস্ফোরণের খবর গণমাধ্যম থেকে না সরতেই মঙ্গলবার বিকেলে পুরান ঢাকার গুলিস্তানে ঘটল আরও বড় মর্মন্তুদ দুর্ঘটনা। বিস্ফোরণে সায়েন্স ল্যাব মোড়ে ঝাঁকুনির এক দিন পরই কাঁপল গুলিস্তানের সিদ্দিকবাজার। আগুন ট্র্যাজেডির সেই নিমতলী থেকে অল্প দূরত্বে আরেক ভয়াবহতা দেখল পুরান ঢাকাবাসী। এর আগে শনিবার চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে অক্সিজেন প্লান্টে ঘটেছিল আরেক হৃদয়স্পর্শী ঘটনা। সপ্তাহ না ঘুরতেই ধারাবাহিক তিনটি বিস্ফোরণে জনমনে দেখা দিয়েছে আতঙ্ক। পরপর কয়েকটি কারণে অনেকে এসব নাশকতা বলে সন্দেহ করছে। যদিও তদন্ত সংশ্লিষ্টরা এমন সন্দেহে এখনও একমত নন। 

ক্যাফে কুইন ভবনে বিস্ফোরণের ঘটনায় বুধবার রাত দেড়টায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত দুই নারীসহ ২০ জন নিহত হয়েছেন। আহত শতাধিক; এঁদের মধ্যে ১০ জন সংকটাপন্ন। তাঁরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল এবং শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসা নিচ্ছেন। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস। দুর্ঘটনাস্থলে ইমপ্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) পাওয়া যায়নি। প্রাথমিকভাবে এটিকে নাশকতা নয়; দুর্ঘটনা মনে করছেন তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা। গতকাল বিকেলেও ভবনটির বেজমেন্ট থেকে দু’জনের লাশ উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিস। তাঁদের একজন মমিন উদ্দিন সুমনের (৪৪)। ভবনের নিচতলায় ‘আনিকা অ্যাজেন্সি’ নামে স্যানিটারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছিল। উদ্ধার হওয়া আরেকজন তাঁর দোকানেরই কর্মচারী রবিন হোসেন।  এদিকে বুধবার রাত ১১টার দিকে মো. মুসা নামে এক ব্যক্তি চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাসপাতালে মারা যান। তাঁর শরীরের ৯৮ শতাংশ পুড়ে গিয়েছিল।

গুলিস্তানে বিস্ফোরণের ঘটনায় রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। সরকারের একাধিক মন্ত্রী, মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান, বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতারা দুর্ঘটনাস্থলে গিয়ে শোকাহতদের সহমর্মিতা জানিয়েছেন।

এ ঘটনায় চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ফায়ার সার্ভিস। কমিটিকে আগামী পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। আলাদা কমিটি করেছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। 

দুই ভবন লন্ডভন্ড : ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, ক্যাফে কুইন ভবনের স্যানিটারি মার্কেট পুরোটাই লন্ডভন্ড। ভবনটি সাততলা। বেজমেন্ট ছাড়াও প্রথম ও দ্বিতীয় তলায় স্যানিটারি মার্কেট। বেজমেন্টের দোকানটির নাম ‘বাংলাদেশ স্যানিটারি’। তৃতীয় তলায় সুজুতি এন্টারপ্রাইজ নামে একটি প্রতিষ্ঠান। চতুর্থ ও পঞ্চম তলায় ভবন মালিক দুই ভাই পরিবার নিয়ে বাস করেন। অন্য ফ্লোর গুদাম হিসেবে ভাড়া দেওয়া ছিল। ভবনটির তৃতীয় তলার ওপর থেকে বাকি অংশ প্রায় অক্ষত।  মঙ্গলবার বিকেলে যখন দোকানে দোকানে কেনাবেচা চলছিল, তখন ভবনটির নিচের অংশে বিকট শব্দে ঘটে বিস্ফোরণ। তাতে নিচের দুটি ফ্লোরের একাংশ ধসে বেজমেন্টে মিশে যায়। ভবনের প্রতিটি তলার কাচ ভেঙে পড়ে। নিচতলা ও দ্বিতীয় তলার দেয়াল ও দোকানের শাটার ভেঙে মূল সড়কে আছড়ে পড়ে। বিস্ফোরণস্থলের ওই ভবন লাগোয়া দক্ষিণ পাশে আরেকটি পাঁচতলা ভবনের দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় ব্র্যাক ব্যাংকের কার্যালয়। পঞ্চম তলায় ছোট্ট পোশাক কারখানা। বিস্ফোরণে ব্যাংকের তিনটি ফ্লোর বিধ্বস্ত হয়েছে। এ সময় ব্যাংকের বেশ কয়েকজন কর্মকতার-কর্মচারী আহত হন। ব্যাংকের শাখাটি আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে। এই শাখার গ্রাহককে নওয়াবপুর শাখা থেকে সেবা নিতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে ক্যাফে কুইন ভবনের আশপাশে ১০-১২ ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিধ্বস্ত ওই ভবনের মালিক ছিলেন রেজাউর রহমান। এক সময় তিনি ক্যাফে কুইন নামে একটি রেস্তোরাঁ খুলেছিলেন ওই ভবনে। এ কারণে ভবনটি ‘ক্যাফে কুইন’ নামে সবাই চেনে। রেজাউর রহমান মারা যাওয়ার পর তাঁর তিন ছেলে ও দুই মেয়ে ভবনের মালিক। তিন ভাই হলেন মশিউর রহমান, ওয়াহিদুর রহমান ও মতিউর রহমান। মশিউর রহমান ও তাঁর এক বোন বিদেশে থাকেন। ওয়াহিদুর ও মতিউর এবং তাঁদের বোন ভবনটি দেখাশোনা করেন। বিস্ফোরণের সময় দুই ভাই ওই ভবনে তাঁদের ফ্ল্যাটে ছিলেন। তবে পরিবারের কোনো সদস্য হতাহত হননি।

এদিকে, গতকাল দুই ভাই ওয়াহিদুর ও মতিউরকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) ড. খন্দকার মহিদ উদ্দিন বলেন, তাঁদের কাছে ভবন নির্মাণে অনুমতি, ভাড়াটিয়া কতজন, কোথায় সেপটিক কিংবা রিজার্ভ ট্যাঙ্ক আছে, বেজমেন্ট এলাকায় ভাড়া দেওয়ার বৈধতার বিষয়গুলো জানার চেষ্টা করেছি। ডিএমপির লালবাগ বিভাগের উপকমিশনার মো. জাফর হোসেন বলেন, রাজউক, ফায়ার সার্ভিসসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করছে বাড়ির মালিকের বিরুদ্ধে পরে কী ধরনের আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনটি ভবন ছাড়াও পেছনের দিকে ১০-১২টি ভবনে সামান্য ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

‘ভেবেছি তুরস্কের মতো ভূমিকম্প’: বিধ্বস্ত ভবনের ঠিক পেছনেই ১৭২/১/এ নম্বর বাসার পঞ্চম তলায় বাস করেন শেখ বোরহান উদ্দিন কলেজের ছাত্র বাদশা ফারদিন রোহান। তিনি বলেন, বিকেলে ডাইনিং টেবিলে খেতে বসেছিলাম। এমন সময় তীব্র শব্দ। হাত থেকে ভাত ছিটকে পড়ল থালাতে। কেঁপে উঠল পুরো ভবন। এর পরই থাই গ্লাস ভেঙে মেঝেতে পড়ল। রান্নাঘরের গ্লাসও ভেঙে চুরমার। ধরে নিয়েছি– তুরস্কের মতো ভূমিকম্প। দ্রুত সবাইকে বাসার ভেতর থেকে বের করে নিচে নেমে আসি। এসে দেখি, পাশের দুই ভবন লন্ডভন্ড। চারদিকে সবাই দৌড়াদৌড়ি করছে। বিধ্বস্ত ভবনের সামনে একাধিক মোটরসাইকেল, রিকশা-ভ্যান পড়ে আছে। ভবনগুলোর সামনে ‘সাভার পরিবহন লিমিটেড’ নামে একটি বাস দাঁড়িয়ে ছিল। সেটিও রূপ নিয়েছে ধ্বংসস্তূপে। গতকাল ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা গেল, সিদ্দিকবাজারের জুতার গলিতে (স্পঞ্জ গলি হিসেবে বেশি পরিচিত) ভ্রাম্যমাণ এক বেল বিক্রেতা ঘিরে জনাদশেক লোক। পরে জানা গেল, বেল বিক্রেতার নাম দিলীপ দাস। বিস্ফোরণের সময় ভবনের সামনে প্রতিদিনের মতো ফুটপাতে বেল বিক্রি করছিলেন তিনি। এলাকার অনেকে তাঁর কাছে জানতে চান– কীভাবে বেঁচে গেলেন। নানা প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে ক্লান্ত দিলীপ বলেন, বিস্ফোরণের পরপরই শরীরে একটি ধাক্কা লাগল। কিছুটা দূরে ছিটকে পড়ি। কয়েক সেকেন্ড পর দেখি, আশপাশে রক্তভেজা লোকজন। দৌড়ে প্রথমে নিরাপদে যাই। কয়েক মিনিট পর আবার দুর্ঘটনাস্থলে হাজির। কেউ আহতদের উদ্ধার করছিলেন। কেউ ভিডিও করছিলেন। তখন দেখি পকেটে থাকা মোবাইল ফোনটা নেই। ভবন-সংলগ্ন ইত্যাদি জেনারেল স্টোরের কর্ণধার মোশাররফ হোসেন বলেন, বিকট শব্দে দোকানের ফ্রিজে থাকা বিভিন্ন বোতল হুড়মুড় করে পড়ছিল। প্রথমে বুঝতে পারিনি, এত বড় দুর্ঘটনা। কিছু সময় পর দেখি, রক্তাক্ত লোকজন নিয়ে দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়েছে।

ওই ভয়াবহ ঘটনার সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল সাভার পরিবহনের একটি বাস। বাসের ভেতরে পড়ে ছিল হতাহত যাত্রীদের রক্তে ভেজা মাস্ক, চশমা ও জুতা। এ ছাড়া ভবনের দেয়ালভাঙা টুকরো, ভবনের কাচ উড়ে এসে গাড়িতে পড়ে। এতে গাড়ির কাচসহ ভেতরটা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। বাসে থাকা ৪৮ যাত্রীর মধ্যে ৩৫ জনই গুরুতর আহত হয়েছেন। এ সময় ঘটনাস্থলেই বাসচালকের সহকারী নিহত হন।

দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনের সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, বিস্ফোরণের কারণ জানতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। ফায়ার সার্ভিস উদ্ধারকাজ করছে। তাদের সেনাবাহিনী, পুলিশসহ বিভিন্ন সংস্থা সহযোগিতা করছে।

গ্যাস জমার ৫ কারণ : ক্যাফে কুইন ভবনে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনাকে দুর্ঘটনা বলেই মনে করছেন ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাইন উদ্দীন। উদ্ধার অভিযানের দ্বিতীয় দিন বুধবার ঘটনাস্থল পরিদর্শনের সময় তিনি বলেন, নিছক দুর্ঘটনা মনে করা হলেও তদন্ত চলছে। তদন্তের পর পরিপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে। ঢাকার পুলিশ কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুকও বলেছেন, ‘বিস্ফোরণের কারণ অনুসন্ধান করে দেখা হচ্ছে। এখনও বিস্ফোরকের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। সেপটিক ট্যাঙ্ক কিংবা গ্যাস লিকেজ ছিল কিনা, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এরই মধ্যে আমরা বেশকিছু পরিকল্পনা নিয়েছি। ঢাকা শহরের স্যুয়ারেজ ও গ্যাস লাইন এবং অনেক পুরোনো ভবন রয়েছে। এগুলোর কী অবস্থা, তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা প্রয়োজন। পুলিশের তরফ থেকে এসব বিষয়ে সিটি করপোরেশনকে অনুরোধ জানানো হবে। পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দল ভবনটি পরিদর্শন করে বলেছে, ভবনের বেজমেন্টে বিস্ফোরণ হয়ে থাকতে পারে। তবে ভবনের ধ্বংসস্তূপ, আহত ও নিহত হওয়ার ধরন দেখে বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দলটি মনে করছে, ভবনের বেজমেন্টের বদ্ধ কোনো কক্ষে গ্যাস জমে সেটি ‘গ্যাস চেম্বার’-এ পরিণত হয়েছিল। সেখানে যে কোনো উপায়ে স্পার্ক (আগুনের স্ফুলিঙ্গ) হওয়ার পরই বিস্ফোরণ ঘটেছে। এ ক্ষেত্রে সম্ভাব্য পাঁচটি উপায়ে গ্যাস জমতে পারে বলে মনে করছেন তাঁরা।

সিটিটিসির বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দলের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) রহমত উল্লাহ চৌধুরী বলেন, যে কোনো উপায়েই হোক ভবনের আবদ্ধ কক্ষে গ্যাস জমেছিল। সেখানে বৈদ্যুতিক সার্কিট বা অন্য কোনো উপায়ে স্পার্ক থেকে ভবনে বিস্ফোরণ ঘটেছে। র‍্যাবের বোমা ডিসপোজাল ইউনিটের প্রধান মেজর মশিউর রহমান বলেন, বিস্ফোরণের ঘটনাটি গ্যাসলাইনে লিকেজ বা অন্য কোনো কারণে ঘটতে পারে। তবে বিস্ফোরণের মাত্রা ব্যাপক ছিল। বেজমেন্ট থেকে বিস্ফোরণের সূত্রপাত হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছি। এটা স্বাভাবিক কোনো বিস্ফোরণ নয়। গ্যাস জমে কিংবা অন্য কোনোভাবে বিস্ফোরণ ঘটেছে। এসি থেকে ঘটেনি– এটা নিশ্চিত হয়েছি।

এদিকে রাজউকের এক কর্মকর্তা জানান, ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত নথিপত্র খোঁজ করে ওই ভবন নির্মাণ সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ভবনটি আবাসিক, নাকি বাণিজ্যিক; তাও জানা নেই কারও। ভবনের অনুমোদন না থাকলে তাঁরা আইনি ব্যবস্থা নেবেন। এটি ভাঙা হবে, নাকি সংস্কার করা হবে– ঠিক করতে আজ দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের  কারিগরি কমিটির বৈঠক করার কথা রয়েছে।

সন্দেহে গ্যাসলাইনের লিকেজ : বিভিন্ন তদন্ত সংস্থা এখন পর্যন্ত বিস্ফোরণের প্রধান সম্ভাব্য কারণ গ্যাসলাইনের লিকেজ বলে মনে করছে। স্থানীয় বাড়ির মালিকরাও বলছেন, দুর্ঘটনাস্থল ও তার আশপাশের একাধিক বাড়ির গ্যাসলাইনের সমস্যা পুরোনো। বিধ্বস্ত ভবন লাগোয়া ১৭২/১/এ নম্বর বাড়ির মালিক বাদশা ফেরদৌস রয়েল বলেন, ১৫ দিন আগে ক্যাফে কুইন ভবনে গ্যাসের লাইন মেরামত করতে গিয়েছিল তিতাস। শুনেছি, সেখানে নতুন পাইপ লাগানো হয়েছে। দুর্ঘটনার পর মঙ্গলবার সন্ধ্যার দিকে ওই এলাকার বেশ কয়েকটি বাড়ির গ্যাসের লাইনের রাইজারের আশপাশে গ্যাসের গন্ধ পাওয়া যায়। পরে তিতাসের লোকজন এসে লাইন বন্ধ করে দেন। রয়েল বলেন, বিধ্বস্ত ভবনটির গ্যাসের লাইন ঠিক ছিল কিনা– এই সন্দেহ আমাদের। ভবনটির বেজমেন্ট ও নিচতলায় রেস্টুরেন্ট ছিল। রেস্টুরেন্ট বন্ধ করে সেখানে স্যানিটারি দোকান হিসেবে ভাড়া দেওয়া হয়। বিধ্বস্ত ভবনের পেছনের অংশে গিয়ে দেখা যায়, সরু একটি গ্যাসের লাইন সেখানে রয়েছে। তবে তিতাস কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, ওই ভবনের রাইজার অক্ষত আছে। 

নিহত যাঁরা : এ ঘটনায় যাঁরা নিহত হয়েছেন তাঁদের মধ্যে আছেন ব্যবসায়ী, দোকানের কর্মচারী, পথচারী। স্যানিটারি সামগ্রী কিনতে গিয়েও অনেকে প্রাণ হারিয়েছেন। ওই এলাকার বাসিন্দা নিয়াজ মোর্শেদ বলেন, বিস্ফোরণ এতটাই ব্যাপক ছিল; রাস্তার উল্টো পাশে থাকা কয়েকজনও নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া স্যানিটারি মার্কেট হওয়ায় অনেক ভ্যানচালক সব সময় সেখানে অপেক্ষা করতেন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন হতাহত হন। নিহতরা হলেন– বংশালের সুরিটোলার মো. সুমন, বরিশালের কাজিরহাটের ইসহাক মৃধা, পশ্চিম যাত্রাবাড়ীর মুনসুর হোসেন, পুরান ঢাকার আলুবাজারের ইসমাইল, চাঁদপুরের মতলবের আল আমিন, কেরানীগঞ্জের রাহাত হোসেন, ইসলামবাগের মমিনুল ইসলাম, চকবাজারের নদী বেগম, মুন্সীগঞ্জ সদরের সৈয়দপুরের মাঈন উদ্দিন, বংশালের নাজমুল হোসেন, মানিকগঞ্জ সদরের ওবায়দুল হাসান বাবুল, মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ার আবু জাফর সিদ্দিক, বংশালের আগামাসিহ লেনের আকুতি বেগম, যাত্রাবাড়ীর ইদ্রিস মীর, মাতুয়াইলের নুরুল ইসলাম ভূঁইয়া, বংশালের জাবেদ গলির মো. হৃদয়, ধানমন্ডির মমিন উদ্দিন সুমন, মো. সম্রাট, মুসা ও মোহাম্মদ সিয়াম।

কাজ শুরু করতে ব্যাঘাত : দুর্ঘটনার পর প্রথম দফায় মঙ্গলবার রাত ১১টার দিকে উদ্ধার কার্যক্রম স্থগিত করে ফায়ার সার্ভিস। তবে গতকাল সকালে জাতীয় কমিটির ছাড়পত্র না পাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের ভেতরে উদ্ধার শুরু করতে দেরি হয়। ছাড়পত্র পাওয়ার পর বেলা সাড়ে ৩টা থেকে ফের উদ্ধার কার্যক্রম শুরু হয়। পরে রাত ৯টার পর সাময়িকভাবে তা স্থগিত করা হয়।

ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক (ঢাকা) দিনমনি শর্মা বলেন, আমরা অভিযান শেষ করিনি; অব্যাহত রয়েছে। আমাদের কাছে যতক্ষণ নিখোঁজের অভিযোগ থাকবে ততক্ষণ অভিযান চলমান থাকবে। তবে ভবনটি অনেক ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকায় সতর্কতার সঙ্গে আমরা উদ্ধারকাজ চালিয়ে যাচ্ছি।

ফায়ার সার্ভিস অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. আখতারুজ্জামান বলেন, বুধবার পৌনে ৫টার দিকে বেজমেন্টে অনেক মাছির আনাগোনা দেখেন আমাদের কর্মীরা। ডগ স্কোয়াড দিয়ে তল্লাশি করলে কুকুরগুলো ওই মাছির কাছেই দাঁড়িয়ে থাকে। এর পর সেখানে দু’জনের লাশ মেলে।

আরও পড়ুন

×