ঢাকা রবিবার, ১০ ডিসেম্বর ২০২৩

‘লাইন খরচে’ রাজধানী দাপাচ্ছে লেগুনা

‘লাইন খরচে’ রাজধানী দাপাচ্ছে লেগুনা

মাজহারুল ইসলাম রবিন

প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৩ | ১৮:০০

রাজধানীর মূল সড়ক থেকে শুরু করে গলির রাস্তা– সর্বত্রই দাপিয়ে বেড়াচ্ছে লাইসেন্সহীন লেগুনা। এসব লেগুনার অধিকাংশরই নেই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, নেই চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স। তবু রাজধানীর বিভিন্ন পথে প্রশাসনের নাকের ডগায় এসব লেগুনা চললেও অজানা কারণে নেওয়া হচ্ছে না কার্যকর ব্যবস্থা। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই লেগুনা চালাচ্ছে অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোররা। ‘ওস্তাদে’র কাছ থেকে শিখে লাইন্সেস ছাড়াই তারা বসে পড়ছে চালকের আসনে। অদক্ষ হাতে বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোর কারণে বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনা। অন্যদিকে, ‘লাইন খরচ’ নামে প্রতিদিন দিতে হয় মোটা অঙ্কের চাঁদা। আর এসব চাঁদার বলেই অবৈধ ঘোষণার পরও বীরদর্পে চলছে এসব লেগুনা।

পরিবহন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, চাঁদাবাজি বন্ধ না হলে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব হবে না। এই চাঁদার টাকা জোগাড়ের জন্য চালকরা বেপরোয় গাড়ি চালায়। যে কারণে সড়কে বাড়ছে দুর্ঘটনা। আর গাড়ি চলার ক্ষেত্রে কমিশনিং সিস্টেম বন্ধ করতে হবে বলেও মত দেন তারা।

২০১৮ সালে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের পর সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে ১৭টি নির্দেশনা আসে। সেগুলো এখনও বাস্তবায়ন হয়নি। ওই নির্দেশনার পর ২০১৮ সালের ৪ সেপ্টেম্বর ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তৎকালীন ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া রাজধানীতে লেগুনা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। এর পর বেশ কিছুদিন বন্ধ থাকলেও আবারও অবাধে চলাচল শুরু করেছে এসব অবৈধ যান। কয়েকদিন রাজধানীর লেগুনার বেশ কয়েকটি রুট ঘুরে দেখা যায়, দড়ি দিয়ে বাঁধা ভাঙা দরজা, ভাঙা লুকিং গ্লাস ও জানালার কাচ, ভাঙাচোরা সিট, জীর্ণ কাঠের পাটাতন, তার ওপর প্লাস্টিকের আবরণ দেওয়া লক্কড়ঝক্কড় লেগুনা চলছে সড়কে। তাতে নেই স্টার্ট সুইচ, দুই তারে ঘষাই ভরসা। হর্নের বদলে হাত দিয়ে আঘাত করা হয় গাড়ির বডিতে। পেছনে সিটের নিচে রাখা গ্যাস সিলিন্ডার যে কোনো সময় বিস্ফোরণের শঙ্কা রয়েছে।

লেগুনা চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নীলক্ষেত থেকে সেকশন রুটে গাড়ি চলে প্রায় ৩২টি। এই রুটে প্রতিদিন চাঁদা দিতে হয় গাড়িপ্রতি ৭৫০ টাকা। মোহাম্মদপুর-শ্যামলী রুটে গাড়ি চলে প্রায় ৭০টি, প্রতিদিন গাড়িপ্রতি চাঁদা দিতে হয় ৯০০ টাকা। মোহাম্মদপুর থেকে ফার্মগেট রুটে গাড়ি চলে ৭০টি। এই রুটে বন্ধের দিনে, অর্থাৎ শুক্রবার চাঁদার পরিমাণ গাড়িপ্রতি ৮০০ টাকা, শনিবার ৯০০ টাকা এবং সপ্তাহের অন্য সব দিন ১ হাজার টাকা। ফার্মগেট থেকে জিগাতলা রুটেও চাঁদা আদায় হয় একই পদ্ধতিতে। শ্যামলী থেকে ঢাকা উদ্যান রুটে গাড়ি চলে ৪৫টি। এই রুটে প্রতিদিন চাঁদা দিতে হয় ৭০০ টাকা। গাবতলী টু সেকশন রুটে লেগুনার চলে ১২৫টি। এই রুটে প্রতিদিন চাঁদা দিতে হয় ১ হাজার ৩৫০ টাকা করে। পুরান ঢাকার বিডিআর গেট (বিজিবি) থেকে গুলিস্তান রুটে লেগুনা চলে ৩৫টি। এই রুটে গাড়িপ্রতি চাঁদা দিতে হয় ৭৩০ টাকা। ফার্মগেট থেকে ৬০ ফিট রুটে লেগুনা চলে প্রায় ৫০টি। এই রুটে প্রতিদিন চাঁদা দিতে হয় ৭০০ টাকা করে। নীলক্ষেত থেকে ফার্মগেট রুটে লেগুনা চলে প্রায় ৮৩টি। এই রুটে প্রতিদিন চাঁদা দিতে হয় ৬০০ টাকা করে। নীলক্ষেত থেকে কামরাঙ্গীরচর রুটে প্রতিদিন ৩০টি লেগুনা চলে। এই রুটে প্রতিদিন গাড়িপ্রতি চাঁদা দিতে হয় ৬০০ টাকা। নীলক্ষেত থেকে চকবাজার রুটে ২৫টি লেগুনা চলে। এই রুটে চাঁদা দিতে হয় ৫৬০ টাকা করে। নীলক্ষেত থেকে গুলিস্তান রুটে লেগুনা চলে ২৭টি, চাঁদা দিতে হয় ৬০০ টাকা করে। নীলক্ষেত থেকে সেকশন রুটে গাড়ি চলে ৩২টি। চাঁদা ৭৩০ টাকা করে। নীলক্ষেত থেকে বিডিআর (বিজিবি) রুটে লেগুনা চলে ৩৫টি, গাড়িপ্রতি চাঁদা ৭৩০ টাকা।

এই ১৪টি রুটে প্রতি মাসে ১ কোটি ৯০ লাখ ৪১ হাজার ৩০০ টাকা চাঁদা আদায়ের তথ্য মিলেছে। এ ছাড়া রাজধানীর অন্য এলাকায়ও এসব অবৈধ লেগুনা দেদার দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। প্রতিটি রুটেই ‘লাইন খরচ’ নামের চাঁদা আদায়ের তথ্য পাওয়া গেছে। গাড়িপ্রতি চাঁদা ৬০০ টাকা থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। অনুসন্ধানে জানা যায়, এসব চাঁদা তোলার জন্য বিভিন্ন রুটে লোক নিয়োগ রয়েছে। যাদের লেগুনা শ্রমিকরা বলেন ‘লাইনম্যান’। তারা চাঁদা তুলে সিন্ডিকেটের মূল নেতার হাতে তুলে দেন। সেখান থেকে ভাগবাটোয়ারা হয়ে সংশ্লিষ্টদের কাছে নির্দিষ্ট পরিমাণ অঙ্ক চলে যায়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ফার্মগেট এলাকার লেগুনার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন চুন্নু নামে এক ব্যক্তি। তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেন। নিকুল ও মিনু নামে তাঁর আরও দু’জন সহযোগী রয়েছেন। মোহাম্মদপুর-শ্যামলী রুটের ‘লাইনম্যান’ শাকিল নামে এক ব্যক্তি। তিনি শ্যামলী স্ট্যান্ডে অবস্থান করেন। এখান থেকেই সব গাড়ির চাঁদা তোলেন শাকিল। চালকরা জানান, কোনো গাড়িরই কাগজপত্র ঠিক নেই। গাড়ির ফিটনেসও খারাপ। লাইন খরচ না দিলে রাস্তায় এসব গাড়ি বের করা মুশকিল। তাই বাধ্য হয়ে প্রতিদিন লাইন খরচ দিতে হয়। লাইন খরচ, তেল খরচ এবং মালিকের অংশ দেওয়ার পর খুব বেশি টাকা চালক-হেলপারদের ভাগে থাকে না।

চাঁদা কেন দেন– এ প্রশ্নে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নিউমার্কেট থেকে ফার্মগেট রুটের এক চালক বলেন, ‘যেসব গাড়ি চলে, এর একটির কাগজও ঠিক নেই। রাস্তার ওপর ফালাই রাখছি। পুলিশ ধরে না, কেউ কিছু বলে না। চাঁদা দেই বলে ধরে না।’ আরেক চালক বলেন, ‘রাস্তায় গাড়ি বের করলে ট্রিপ হোক বা না হোক চাঁদা দিতেই হবে। আমাদের সারাদিন লেগে যায় তেল খরচ আর চাঁদার টাকা তুলতেই। এর পর সন্ধ্যায় যে কয়টা ট্রিপ মারতে পারি, তা মালিক আর আমরা কমিশন আকারে নিই। মালিক ৬০ আর আমরা পাই ৪০ পার্সেন্ট।

বাধ্য হয়ে চাঁদা দিলেও এই চাঁদায় সন্তুষ্ট নয় লেগুনার মালিক সমিতিও। জানতে চাইলে ক্ষোভের সঙ্গে সেকশন থেকে গাবতলী লেগুনা মালিক সমিতির এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দিনশেষে আমাদের কিছুই থাকে না। দুপুরের মধ্যে পকেট থেকে হলেও তাদের চাঁদা দিতে হয়। অনেক সময় বিকেলে গাড়ি নষ্ট হয়ে যায়। তখন তারা কোনো টাকা ফেরত দেয় না। গাড়ি না চালিয়েও তখন পকেট থেকে চাঁদা দিতে হয়।

২০১৮ সালে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা লেগুনা রাজধানীতে কীভাবে চলছে– এ প্রশ্নের জবাবে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার মুনিবুর রহমান বলেন, ‘আসলে এখানে একটা তথ্যগত ভুল আছে। ২০১৮ সালে সেই সময়ের কমিশনারের নেতৃত্বে একটা মিটিং হয়েছিল। সেই মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় লেগুনা চলবে না। এ ছাড়া ঢাকার আশপাশের যেসব এলাকায় গণপরিবহন সহজে পাওয়া যায় না, সেসব এলাকার মানুষের যাতায়াতের সুবিধার্থে তখন সেখানে লেগুনা চালু রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। সেই সিদ্ধান্তেই এখনও লেগুনা চলছে। লাইন খরচের বিষয়ে তিনি বলেন, প্রশাসনের লোকজন কোনো বেআইনি কাজের সঙ্গে জড়িত– এমন প্রমাণ পেলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আরও পড়ুন