ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ মে ২০২৪

ঢাকায় সড়ক খুঁড়লেই কষ্টের একশেষ

ঢাকায় সড়ক খুঁড়লেই কষ্টের একশেষ

কোলাজ

 লতিফুল ইসলাম

প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৪ | ০৫:২৬ | আপডেট: ১৬ মে ২০২৪ | ০৬:২৬

রাজধানীতে আগমন ও বহির্গমনে পোস্তগোলা ও বাবুবাজার সেতু ব্যবহার করেন দক্ষিণবঙ্গের মানুষ। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর এ দুই সেতুপথে গাড়ির চাপ বেড়েছে কয়েক গুণ। গত কয়েক মাস ধরে এ দুই সেতুমুখ বাবুবাজার এবং টিকাটুলী সড়কে বিভিন্ন সংস্থার খোঁড়াখুঁড়িতে যানজটে নাজেহাল যাত্রীরা।

সকাল থেকে শুরু হওয়া টিকাটুলীর এ যানজট রাত পর্যন্ত প্রবেশমুখ ছেড়ে কাকরাইল পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করে। ফলে দীর্ঘ সময় যানজটে বসে থাকায় ওই অঞ্চলের মানুষের কাছে ঢাকায় আসা-যাওয়া অনেকটা যুদ্ধের মতো। চলতি বর্ষা মৌসুমে এ সমস্যা আরও প্রকট আকার ধারণ করবে বলে আশঙ্কা তাদের। তবে এ চিত্র শুধু প্রবেশমুখেই নয়; বর্ষা মৌসুমের শুরুতে রাজধানীর অভ্যন্তরের প্রধান সড়ক থেকে অলিগলিতেও। নগরজুড়ে কমপক্ষে শতাধিক সড়কে চলছে বিভিন্ন সংস্থা ও সিটি করপোরেশনের উন্নয়নের খোঁড়াখুঁড়ি। সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে যানজট ও ভোগান্তি।

সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, রাজধানীর বিভিন্ন সংস্থার সড়ক খনন ও পুনর্নির্মাণে সমন্বয় আনতে দুই সিটির দুটি ওয়ানস্টপ সমন্বয় সেল কাজ করে। সংস্থাগুলো তাদের উন্নয়ন কাজের আগে ওয়ানস্টপ সমন্বয় সেলের কাছে অনুমতি নেয়। গত ১২ মার্চ ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ওয়ানস্টপ সমন্বয় সেলের ৮০তম সভায় ৮টি সংস্থাকে ৪৩টি সড়ক খনন ও সংস্কারের অনুমতি দেওয়া হয়। এ ছাড়া ডিএসসিসি এই সময়ে তাদের নিজস্ব সড়কের উন্নয়ন ও সংস্কারের কাজ করছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) সর্বশেষ ওয়ানস্টপ সমন্বয় সেলের সভায় তাদের নিজস্ব ৩৪টি সড়কসহ মোট ৮০টি সড়ক খনন ও সংস্কারের অনুমতি দেওয়া হয়। 

অক্টোবর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সাধারণত সড়কের মধ্যে শুষ্ক মৌসুম ধরে উন্নয়ন কাজের অনুমতি দেয় ওয়ানস্টপ সমন্বয় সেল। তবে সিটি করপোরেশনের দাবি, সংস্থাগুলো শেষ সময়ে এসে উন্নয়ন কাজের অনুমতি চায়। তাদের ২৩টি শর্ত জুড়ে অনুমতি দিলেও তারা এসব শর্ত মানে না। যার কারণে নগরজুড়ে দেখা দেয় দুর্ভোগ ও যানজট।

গত সোমবার দুপুরে সরেজমিন দেখা যায়, রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র মতিঝিল শাপলা চত্বর থেকে টিকাটুলী মোড় পর্যন্ত ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ডিপিডিসি) ভূগর্ভস্থ কেবল স্থাপনের কাজ চলছে। শাপলা চত্বরের অংশে কাজ শেষে বালিচাপা দিলেও ইত্তেফাক মোড় থেকে টিকাটুলী পর্যন্ত দিনের বেলায় নিয়ম না মেনেই চলছে খোঁড়াখুঁড়ি। টিকাটুলীর ফুট ওভারব্রিজের পাশের সড়ক এমনিতেই ভাঙাচোরা। তার ওপর সড়কের একদিকে ইট, বালি, সুরকি রেখে ভবন নির্মাণের কাজ চলায় পানি জমে কর্দমাক্ত।

 সড়কের অন্য পাশে ডিপিডিসির খোঁড়া গর্ত। ফলে এ অংশের তিন লেনের সড়কের মাঝ দিয়ে একটি গাড়ির বেশি যাওয়ার উপায় নেই। আশপাশের গলির সড়কগুলোতেও সিটি করপোরেশনসহ অন্যান্য সংস্থা তাদের উন্নয়ন কাজ করছে। ফলে খুবই ধীর গতিতে গাড়ি চলায় এ অংশের যানজট গিয়ে ঠেকেছে পুরোনো পল্টন মোড়ে। তবে সকাল-সন্ধ্যায় এই যানজট কাকরাইল মোড় পর্যন্ত চলে যায়। 

টিকাটুলী মোড়ের জেডিএস নামে সায়েন্টিফিক দোকানের মালিক ওহিদুল ইসলাম বলেন, এই সড়ক প্রায় তিন মাস ধরে খোঁড়া। প্রথমে একই জায়গায় ওয়াসা তাদের উন্নয়ন কাজ করেছে; এখন করছে ডিপিডিসি। খোঁড়াখুঁড়ি লেগে থাকায় যানজটও লেগে আছে।

ওয়ানস্টপ সমন্বয় সেলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গত ৩০ এপ্রিলের মধ্যে ডিপিডিসির এ অংশের কাজ শেষ করার কথা থাকলেও তারা কাজই শুরু করেছে এপ্রিলের শেষের দিকে। সিটি করপোরেশনের ওয়ানস্টপ সেল তাদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার তাগিদ দিয়ে মৌখিক ও লিখিতভাবে চিঠি দিলেও সংস্থাটির তাতে ভ্রুক্ষেপ নেই। 

রাজধানীজুড়ে ডিপিডিসির ভূগর্ভস্থ বৈদ্যুতিক কেবল স্থাপনের কাজ বাস্তবায়ন করছে চীনা প্রতিষ্ঠান টিভিইএ। তাদের থেকে সাব-কন্ট্রাক্টে কাজ করছে মুন পাওয়ার লিমিটেড নামে দেশীয় একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। 

মুন পাওয়ার লিমিটেডের উপসহকারী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম বলেন, মাস দুয়েক আগে ভূগর্ভস্থ কেবল স্থাপনের কাজ শুরু করলে পুলিশের পক্ষ থেকে তাদের রমজানের পর কাজ করার জন্য চিঠি দেওয়া হয়। ঈদের পরে পুলিশের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে কাজ শুরু করা হয়েছে। এ জন্যই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ শুরু করা যায়নি।

ডিপিডিসির নির্বাহী প্রকৌশলী তারিকুল ইসলাম টিটু সমকালকে বলেন, কাজ শুরু করার আগে ওয়ানস্টপ সমন্বয় সেল ছাড়াও ডিএমপি ও অন্যান্য সংস্থার অনুমতি পেতে সময়ক্ষেপণ হয়েছে। এ ছাড়া দেশে প্রথমবারের মতো ১৩২ কেভির তার মাটির নিচে স্থাপন করা হচ্ছে। এটি খুবই চ্যালেঞ্জিং। অনেক সময় ত্রুটির কারণে তার ছিঁড়ে গেলে নতুন করে খুঁড়তে হচ্ছে। আবার সড়ক খোঁড়ার পর দেখা যাচ্ছে, সেখানে ওয়াসা, তিতাস থেকে আরও অন্যান্য সংস্থার সার্ভিস লাইন। রাতে ছাড়া কাজও করা যায় না। এ কারণেই মূলত দেরি হয়েছে।

এদিকে বাবুবাজার সেতু থেকে বংশাল আলুবাজার পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার প্রধান সড়কের মধ্যে ড্রেনেজ নির্মাণ কাজ করছে দক্ষিণ সিটি। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া নির্মাণ কাজ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। তবে এই ড্রেনেজ নির্মাণ কাজটি ঠিকাদার মাত্র গত ছয় মাস আগে শুরু করেছে। তিন লেনের সড়কটির এক লেনজুড়ে ড্রেন নির্মাণে খোঁড়াখুঁড়ি চলছে। তবে বাকি দুই লেনের মধ্যে শুধু একটি লেনে গাড়ি চলাচলে ব্যবহার করা যাচ্ছে। ফলে দক্ষিণবঙ্গের প্রবেশমুখে যানজট লেগেই আছে। 

তাঁতীবাজার মোড়ের আজমীর আয়রন স্টোরের স্বত্বাধিকারী নাসির উদ্দিন বলেন, বাবুবাজার সেতু থেকে সড়কে ঠিকাদার খোঁড়াখুঁড়ি করে ঢিমেতালে কাজ করছে। দোকানের সামনের সড়কটি খোঁড়া থাকায় লোহার জিনিসপত্র লোড-আনলোডে অনেক সমস্যা হচ্ছে।

তাঁতীবাজার ট্রাফিক পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ সাইফুল ইসলাম বলেন, ছয় মাস ধরে সড়কের একপাশে একটি লেন খোঁড়া হলেও তিন লেনের মধ্যে মাত্র এক লেন ব্যবহার করা যাচ্ছে। আর এক পাশের গাড়ির চাপ সামলাতে আরেক পাশেও যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে।

এ বিষয়ে ডিএসসিসির পরিবেশ সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী খাইরুল বাকের বলেন, বংশাল এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে বাবুবাজার থেকে বংশাল পর্যন্ত ড্রেনেজ নির্মাণের কাজ চলছে। এই বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্মাণ কাজের সময় থাকলেও জুলাইয়ের মধ্যে কাজটি শেষ হবে।

এদিকে মোহাম্মদপুরের তাজমহল রোড, নূরজাহান রোড, বিজলী মহল্লা, আজিজ মহল্লা, টিক্কাপাড়া, নবোদয় হাউজিং, মোহাম্মদী হাউজিং সোসাইটি, কাটাসুর থেকে জাফরাবাদ হয়ে রায়েরবাজারের গদিগর পর্যন্ত বেশিরভাগ সড়কই খোঁড়াখুঁড়ি শেষে পড়ে আছে এবড়ো-খেবড়ো অবস্থায়। 
সরেজমিন দেখা গেছে, রিং রোডের টিক্কাপাড়া ও কাদেরাবাদ এলাকার বেশ কয়েকটি সড়কে নতুন করে শুরু হয়েছে কাটাকাটির কাজ। কিছু সড়কে ফেলা হচ্ছে ইট, বালু, সুরকি। মোহাম্মদপুরের প্রায় প্রতিটি এলাকায় রাস্তাগুলো মাঝ বরাবর সরু করে কাটা। সড়কে একটু পরপর তৈরি হয়েছে গর্ত। পুরো রাস্তা বন্ধ করে বড় বড় পানির পাইপ, রাস্তার এক পাশ কেটে বৈদ্যুতিক লাইন ও ফুটপাতের নিচের নালায় চলছে সংস্কারের কাজ। নূরজাহান রোডে পয়ঃনালা নির্মাণের কাজ শুরু প্রায় চার মাস আগে। এই সড়কের সব কাজ শেষ হয়নি। তাজমহল রোডের এক পাশের ফুটপাতের কাজ শেষে শুরু করা হয়েছে অন্য পাশের নালা সংস্কার। 

ডিএনসিসি অঞ্চল-৫ এর নির্বাহী প্রকৌশলী নূরুল আলম বলেন, আমাদের কাজের সেশন মূলত জুলাই থেকে জুন। এই এক বছরের মধ্যেই আমরা সড়ক মেরামত ও অন্যোন্য কাজ শেষ করি। বৃষ্টি-বাদলের সমস্যা ও ঠিকাদাররা দেরি করলে অনেক সময় কাজ শেষ হয় না। তবে আমাদের মোটামুটি সব ধরনের কাজই শেষ। জুনের মধ্যে প্রথম লেয়ারের কাজ শেষ হবে।

যেসব সড়কে নতুন করে খোঁড়াখুঁড়ি চলছে তা নিয়ে এ প্রকৌশলী বলেন, টিক্কাপাড়াসহ যেসব এলাকায় নতুন করে খোঁড়াখুঁড়ি চলছে তা বেশির ভাগ ওয়াসা ও ডিপিডিসির কাজ। এ ছাড়া রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, রাজারবাগ, শেওড়াপাড়া, মিরপুর-২, মিরপুর-১০, উত্তরখান, দক্ষিণখান, বাড্ডা, গুলশান-তেজগাঁও লিঙ্ক রোড, বাসাবো, খিলগাঁও, ওয়াইজঘাট, সিদ্ধেশ্বরী, জুরাইন, শ্যামপুর, ধানমন্ডি এলাকার সড়কে খোঁড়াখুঁড়ির কাজ চলছে। 

ওয়াসার ঢাকা ওয়াটার সাপ্লাই নেটওয়ার্ক ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্টের পরিচালক ওয়াজ উদ্দিন ওয়াজেদ বলেন, ওয়ানস্টপ সমন্বয় সেল আমাদের সর্বশেষ কাজের অনুমতি দিয়েছে ১৫ মার্চের পরে। তারা আমাদের একেকটি অংশের কাজ শেষ করতে এক মাস সময় দিয়েছে। কিন্তু আমাদের কাজ শেষ করতে সময় লাগে কমপক্ষে তিন মাস। আবার তারা বলছে, বর্ষা মৌসুম মে-সেপ্টেম্বর। কিন্তু বর্ষা শুরু হতে দেরি আছে। আমাদের কাজ শেষ করতে আরও এক মাসের মতো সময় লাগবে। এর মধ্যে আমরা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এই সময়ের অনুমতি নিয়ে সিটি করপোরেশনকে জানিয়েছি। তিনি আরও জানান, গতকাল বুধবারের বৈঠকে সব সংস্থাকে দ্রুত কাজ শেষ করার জন্য তাগিদ ও বিশেষভাবে সতর্ক করা হয়। বর্ষা মৌসুমে কোনো সংস্থা জরুরি ভিত্তিতে কাজ করতে চাইলে তাদেরকে আরও ৫০ ভাগ জরিমানা দিয়ে কাজ করতে হবে।

ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মীর খাইরুল আলম বলেন, জনবহুল রাজধানীতে অনেক সংস্থার উন্নয়ন কাজ চলমান। তাদের কাজের পরিধি ও সময়সীমাও ভিন্ন। এসব কাজ সমন্বয় করতে অনেক সময় ওভারল্যাপিং হয়ে থাকে। তারপরও আমাদের জোনের নির্বাহী প্রকৌশলীরা সমন্বয় করে উন্নয়ন কাজ পরিচালনা করছেন।

এ বিষয়ে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও ওয়ানস্টপ সমন্বয় সেলের সভাপতি মিজানুর রহমান সমকালকে বলেন, বিভিন্ন সংস্থার উন্নয়ন কাজের জন্য সড়ক খননের অনুমতি দেওয়া হয়। সংস্থাগুলো বর্ষা মৌসুম শুরুর আগে একদম শেষ মুহূর্তে এসে সড়ক খোঁড়ার অনুমতি চায়। এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে এসে অনেক সংস্থা টাকা জমা দিয়ে কাজ শুরু করতে চাইলেও আমরা অনুমতি দিইনি। এসব কাজ দ্রুত শেষ করতে তাদের নিয়ে সভা করার পাশাপাশি লিখিতভাবে সতর্কও করা হচ্ছে। অনেককেই জরিমানা করা হবে।

আরও পড়ুন

×