রাজধানীর সদরঘাটের কাছে শ্যামবাজার এলাকায় বুড়িগঙ্গা নদীতে যাত্রীবাহী লঞ্চ ‘এমভি ময়ূর-২’ এর ধাক্কায় যাত্রীবাহী আরেকটি লঞ্চ ‘এমএল মর্নিং বার্ড’ ডুবিতে প্রাণহানির ঘটনায় নৌপরিহন মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের বেধে দেওয়া সাত দিনের সময় শেষে সোমবার রাতে এই প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়।

এদিকে, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করবে। দুপুর ১টায় সচিবালয়ের মন্ত্রণালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী তদন্ত প্রতিবেদনটি প্রকাশ করবেন।

গত ২৯ জুন লঞ্চ দুর্ঘটনার দিনই সাত সদস্যের উচ্চপর্যায়ের ওই তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। তদন্ত কমিটিতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (উন্নয়ন) রফিকুল ইসলাম খানকে আহ্বায়ক এবং বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সংস্থার (বিআইডব্লিউটিএ) পরিচালক (নৌনিরাপত্তা) রফিকুল ইসলামকে সদস্য সচিব করা হয়। কমিটিকে সাত দিনের মধ্যে দুর্ঘটনার কারণ উদঘাটন, দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তি/সংস্থাকে সনাক্তকরণ এবং দুর্ঘটনা প্রতিরোধে করণীয় উল্লেখ করে সুনির্দিষ্ট সুপারিশসম্বলিত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছিল। গত সাত দিন তদন্ত শেষ করে সোমবার রাত ৯টায় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দেয় তদন্ত কমিটি।

তদন্ত প্রতিবেদনে ওই লঞ্চ দুর্ঘটনার জন্য কাদের দায়ী করা হয়েছে এবং দুর্ঘটনা রোধে কী কী সুপারিশ করা হয়েছে- সে বিষয়ে জানাতে সম্মত হননি তদন্ত কমিটির কোনো সদস্যই। তবে তদন্ত সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, ওই দুর্ঘটনার জন্য কাউকে এককভাবে দায়ী করা হয়নি। অভিযুক্ত লঞ্চ ‘ময়ূর-২’ পরিচালনায় দায়িত্বরত মাস্টার, চালক ও সুকানিরাসহ অন্যদের দায়িত্বে অবহেলাকেই মূলত দায়ী করা হয়েছে। এ ছাড়া ডুবে যাওয়া ভাঙাচারো ছোট আকারের লঞ্চ মর্নিং বার্ডের চলাচলে অনুমোদনের বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এই অনুমোদনের জন্য সংশ্লিষ্ট বিআইডব্লিটিএ কর্মকর্তাদের গাফিলতিকেও দায়ী করা হয়েছে। প্রতিবেদনে ভবিষ্যতে নৌদুর্ঘটনা প্রতিরোধে বেশ কিছু সুপারিশও তুলে ধরা হয়েছে। তবে সুপারিশ বিষয়ে বিস্তারিত জানা যায়নি।

তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক রফিকুল ইসলাম খান সমকালকে বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই তদন্ত শেষ করে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন তারা। তবে যেহেতু প্রতিবেদনটি গোপনীয় সেই কারণে এই বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে চান না তারা। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে প্রতিবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশের পরই সবাই এ বিষয়ে জানতে পারবেন।

তদন্ত কমিটির এক সদস্য জানান, তদন্তকালে ময়ূর-২ লঞ্চ মালিক মোসাদ্দেক হানিফ সোয়াদ পলাতক থাকায় তার কোনো বক্তব্য পাননি তারা। তবে তার প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স সি হর্স করপোরেশন’-এর ম্যানেজার দেলোয়ার হোসেনের বক্তব্য রেকর্ড করা হয়েছে। এ ছাড়া ময়ূর-২ লঞ্চের কেরানি মো. সেলিমকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।

এ দিকে লঞ্চডুবির ঘটনায় পাওয়া সিসিটিভি ফুটেজকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়েছে বলেও জানান তদন্ত কমিটির সদস্যরা। মর্নিং বার্ড লঞ্চের বেঁচে যাওয়া ১১ যাত্রীসহ প্রত্যক্ষদর্শী ২৫ জনের বক্তব্যও নিয়েছেন তারা।

তদন্ত কমিটি সূত্রে জানা যায়, লঞ্চ দুঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন বড় আকারের লঞ্চ ময়ূর-২ হঠাৎ করেই ছোট আকারের লঞ্চ মর্নিং বার্ড-এর দিকে চেপে আসছিল। প্রথমে পেছনে বেপরোয়াভাবে ধাক্কা দিলে লঞ্চের ভেতরে সবাই ভয়ে চিৎকার দিয়ে ওঠেন। এর মাত্র ৬ সেকেন্ডের মাথায় আরেক ধাক্কায় লঞ্চটি ডুবে যায়।

‘সি হর্স করপোরেশন’-এর ম্যানেজার দেলোয়ার হোসেন তদন্ত কমিটির সদস্যদের জানিয়েছেন, লঞ্চের মাস্টার ও ড্রাইভারের অদক্ষতা এবং অবহেলার কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। ময়ূর-২ লঞ্চের কেরানি সেলিম কমিটিকে জানান, ঘটনার সময়ে তিনি লঞ্চে ছিলেন না। এ কারণে দুর্ঘটনা কীভাবে ঘটেছে, কে লঞ্চ চালিয়েছে তা তিনি জানেন না।

গত ২৯ জুন সকালে মুন্সিগঞ্জের কাঠপট্টি থেকে ঢাকার সদরঘাটের উদ্দেশে ছেড়ে আসা শতাধিক যাত্রীবোঝাই লঞ্চ ‘এমএল মর্নিং বার্ড’ টার্মিনালে ভেড়ার আগ মুহূর্তে শ্যামবাজার এলাকায় চাঁদপুর থেকে ঢাকাগামী আরেকটি যাত্রীবাহী লঞ্চ ‘এমভি ময়ূর-২’ এর ধাক্কায় বুড়িগঙ্গায় ডুবে যায়। এ দুর্ঘটনায় এ পর্যন্ত ৩৪ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

এই দুর্ঘটনার রাতেই নৌপুলিশ সদরঘাট থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মোহাম্মদ শামসুল আলম বাদি হয়ে লঞ্চডুবির ঘটনায় অবহেলাজনিত হত্যার অভিযোগ এনে সাতজনের বিরুদ্ধে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় একটি মামলা করেন। এই মামলার আসামিরা হচ্ছেন, এমভি ময়ূর-২ এর মালিক মোসাদ্দেক হানিফ সোয়াদ, লঞ্চের মাস্টার আবুল বাশার মোল্লা ও জাকির হোসেন, চালক শিপন হাওলাদার ও শাকিল হোসেন এবং সুকানি নাসির মৃধা ও মো. হৃদয়। তবে অভিযুক্ত লঞ্চটি আটক হলেও গত সাতদিনে কোনো আসামিই গ্রেপ্তার হননি। অভিযুক্ত লঞ্চের মালিক, মাস্টার ও চালক পলাতক রয়েছেন বলে পুলিশের দাবি।