জামিরুল ইসলাম। গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়ায়। বসবাস করেন রাজধানী ঢাকার মিরপুরে। চাকরি থেকে অবসরে গিয়ে পাওয়া অর্থ দিয়ে ব্যবসা করার পরিকল্পনা করছিলেন সাবেক এই সেনাসদস্য। এরই মধ্যে সাবেক এক সহকর্মী পরামর্শ দেন তাকে, মূলধন নষ্ট হবে না, লভ্যাংশ আসবে- এমন কিছু করা ভালো।

সাবেক সেই সহকর্মী জামিরুল ইসলামকে জানান, 'হোপ ডিজিটাল সিটি লিমিটেড' নামে একটি প্রতিষ্ঠানে টাকা রাখলে প্রতি লাখে মাসে চার হাজার টাকা লভ্যাংশ পাওয়া যাবে। সদস্য সংগ্রহ করে এনে দিলে মোটা অঙ্কের কমিশনও মিলবে। তিনি নিজেও টাকা জমা রেখেছেন হোপ ডিজিটালে।

এভাবে হোপের টোপের দেখা পান অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য জামিরুল। পরে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ফারুক হোসেনের সঙ্গেও তার পরিচয় হয়। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে জামিরুল পাঁচ লাখ টাকা দেন তাকে। মাত্র এক মাস লভ্যাংশের টাকা হাতে পান তিনি। এর পর থেকেই খিলক্ষেত এলাকার নিকুঞ্জে এই প্রতিষ্ঠানের অফিসে তালা ঝুলছে।

জামিরুল ইসলামের মতো সহস্রাধিক মানুষের পকেট ফাঁকা হয়ে গেছে হোপ চক্রের এমন টোপে। নিকুঞ্জের অফিস বন্ধ করে দিয়ে এই চক্রটি এখন ভিন্ন নামে আরেকটি অফিস খুলেছে মহাখালী ডিওএইচএস এলাকায়। এটির কার্যক্রমও একই ধরনের। এ চক্রের অন্যতম তিন প্রধান হলেন- হোপের চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য (সার্জেন্ট) ফারুক হোসেন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইফুল ইসলাম ও তাজুল ইসলাম।

তাদের মধ্যে ফারুকের বাড়ি নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের পশী গ্রামে। তার বাবার নাম রফিজ উদ্দিন বেপারী। সাইফুলের গ্রামের বাড়ি ভোলার চরনোয়াবাদে। তার বাবা সাইদুর রহমান। তাজুল ইসলামের বাবার নাম মোহাম্মদ রইছউদ্দিন। তাদের বাড়ি হবিগঞ্জে।

চক্রটি যাদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে, তারা প্রায় সবাই সরকারি অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী। তাদের মধ্যে আবার অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্যের সংখ্যাই বেশি। অবসরে গিয়ে পাওয়া টাকাপয়সা খুইয়ে অভাব-অনটনে দিন কাটাচ্ছেন প্রায় সবাই। প্রতারণার মাধ্যমে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ফারুক হোসেনসহ চক্রের সদস্যদের বিরুদ্ধে অন্তত ১৪ জন ভুক্তভোগী ঢাকার আদালতে পৃথক ১৪টি পিটিশন মামলা করেছেন।

প্রতারণার শিকার ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, হোপ ডিজিটালে সদস্য সংগ্রহ প্রক্রিয়া অনেকটাই এমএলএম ব্যবসার মতো। তবে লাভের অংশ দেওয়ার ক্ষেত্রে খানিকটা ভিন্নতা রয়েছে, যা তাদের কৌশল। প্রতি মাসে এক লাখে চার হাজার টাকা লাভ এবং একই সঙ্গে মূলধন বাবদ চার হাজার টাকা, সর্বমোট আট হাজার টাকা দেওয়ার প্রলোভন দেয় তারা। নতুন সদস্য সংগ্রহকারীদের এককালীন কমিশনও রয়েছে- এমন প্রলোভনেও অনেকে হন্যে হয়ে ওঠেন সদস্য সংগ্রহ করতে।

হোপের গ্রাহকদের বলা হয়েছিল, সংগৃহীত মূলধন দিয়ে পেট্রোল পাম্প ও ডেভেলপার কোম্পানির ব্যবসা করা হবে। এতে মুনাফা বেশি, তাই লাখে চার হাজার টাকা লাভ দেওয়া অসম্ভব কিছু নয়। চক্রটি টার্গেট করে সরকারি চাকরি থেকে অবসরে যাওয়া ব্যক্তিদের। আইডি খুলতে বা সদস্য ফির নামে নেওয়া হয় পাঁচ হাজার টাকা।

জামিরুল ইসলাম জানান, ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে তিনি পাঁচ লাখ পাঁচ হাজার টাকা দিয়েছিলেন হোপ ডিজিটালে। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে এক মাসের লভ্যাংশ ২০ হাজার এবং মূলধনের ২০ হাজারসহ মোট ৪০ হাজার টাকা পেয়েছেন তিনি। এরপর থেকেই প্রতিষ্ঠানটিকে বন্ধ পান তিনি। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, চক্রের মূল হোতারা মহাখালী ডিওএইচএস এলাকায় একটি অফিস খুলেছে। গত জানুয়ারিতে তিনি সেখানে যান এবং চেয়ারম্যান ফারুকের সঙ্গে দেখা করেন। ফারুক তাকে টাকা ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নতুন করে দুই হাজার টাকা দিয়ে অ্যাকাউন্ট খুলতে বলেন সেখানে। কিন্তু আজও টাকা ফেরত পাননি তিনি। এখন ফারুক তার সঙ্গে দেখাও করছেন না বলে দাবি করেন তিনি।

প্রতারণার শিকার অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য (ল্যান্স করপোরাল) পটুয়াখালীর দুমকী থানার আঙ্গরিয়া গ্রামের আমিনুল ইসলাম জানান, ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত তিনি ১৮ লাখ ৬৫ হাজার টাকা দিয়েছেন ফারুক ও তার চক্রের লোকজনকে। তিন মাস তিনি লভ্যাংশ ও লাখে চার হাজার টাকা মূলধন বাবদ পেয়েছেন। তিনি আরও দু'জনকে সেখানে সদস্য করিয়েছিলেন। এর মধ্যে অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য (সার্জেন্ট) বখতিয়ার জমা দিয়েছেন তিন লাখ পাঁচ হাজার এবং (সার্জেন্ট) মহসিন মিয়া বিনিয়োগ করেছেন দুই লাখ পাঁচ হাজার টাকা। আইডি খোলা বা সদস্য ফি বাদে এ ক্ষেত্রে তাদের দু'জনের পৃথক মূলধন যথাক্রমে তিন লাখ ও দুই লাখ টাকা। মহসিন দুই মাসের লভ্যাংশ ও দুই লাখের আট হাজার টাকা করে মূলধন পেলেও বখতিয়ার এক কিস্তিও পাননি।

আমিনুল বলেন, অনেক খোঁজ করে ফারুক হোসেনের খোঁজ মিলেছে। টাকা দিচ্ছি, দেব বলে ঘুরাচ্ছেন তিনি। চক্রটির বিরুদ্ধে ৯ ভুক্তভোগী দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) চিঠি দিয়েছেন বলে জানান তিনি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভুক্তভোগীদের করা মামলায় গত বছরের মার্চে ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইফুল ইসলাম আত্মসমর্পণ করে জামিন আবেদন করলে আদালত তাকে কারাগারে পাঠান। তিন মাস জেল খেটে জামিনে বেরিয়ে তিনি গাঢাকা দিয়েছেন।

১৪টি মামলার মধ্যে একটি মামলার বাদী কুমিল্লার মুরাদনগরের ছালিয়াকান্দির বাসিন্দা ইউনুছ সরকার। ২০২০ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে তার পিটিশন মামলায় বলা হয়েছে, হোপ ডিজিটালে তিনি ১০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন। পরে তিনি আরও সদস্য সংগ্রহ করে তাদের কাছ থেকে ৭৬ লাখ টাকা এনে দেন প্রতিষ্ঠানটিতে। অপর একটি মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, আ. জব্বার মীর নামের এক ব্যক্তি এক কোটি ৬০ লাখ ১০ হাজার, নিজাম উদ্দিন ১৪ লাখ ৮০ হাজার, কাজী মাসুদুর রহমান এক কোটি ৪৭ লাখ ৯০ হাজার, শহিদুল ইসলাম ৮৭ লাখ ৬৫ হাজার, মীর ইয়াহিয়া খান এক কোটি ৪০ লাখ, মিজানুর রহমান এক কোটি ২৯ লাখ ৮০ হাজার, বাদশা আলম ২০ লাখ ৬৫ হাজার, নুরুল ইসলাম ২৪ লাখ ৮৫ হাজার, আনোয়ার হোসেন ৭৭ লাখ ৪০ হাজার, ইমরান হোসেন ৩৭ লাখ ১০ হাজার এবং আনারুল ইসলাম এক কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন ওই প্রতিষ্ঠানে।

মন্তব্য নেওয়ার জন্য ফারুক হোসেন ও সাইফুল ইসলামের মোবাইল ফোনে কল করলেও সেগুলো বন্ধ পাওয়া গেছে। তাজুল ইসলামের ফোনের রিং বাজলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

মন্তব্য করুন