বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক ঐতিহাসিক। বলা যায়, স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের ভিত্তির ভেতর থেকেই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের শুরু। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারত বিপন্ন বাংলাদেশের মানুষকে তাদের দেশে আশ্রয় দিয়েছে, খাদ্য ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় মিত্রবাহিনী আমাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছে। স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় ভারতের এই অবদান কখনোই ভোলার নয়।
গত ৫০ বছরে বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্ক ক্রমাগত এগিয়ে গেছে, নিবিড় হয়েছে। সম্পর্কের ভেতরে হয়তো কিছু টানাপোড়েনও ছিল। কিন্তু সম্পর্কের উচ্চতা যেভাবে বেড়েছে তার তুলনায় সেই টানাপোড়েন কখনোই বড় হয়ে ওঠেনি। এই পরিপ্রেক্ষিতেই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভেতরে তিনটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি।
প্রথমত, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রায় চার হাজার কিলোমিটার স্থলসীমান্ত নির্ধারিত হয়েছে। এ ছাড়া সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তি হয়েছে। আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে এই নিষ্পত্তি উভয় পক্ষ মেনে নিয়েছে। এ কারণেই সমুদ্রসম্পদ কাজে লাগানোর সুযোগ মিলেছে। এখন ভাবতে হবে দুই দেশের সীমান্ত কীভাবে দু'দেশের জনগণের কল্যাণে ব্যবহার করা যায়। নিয়মতান্ত্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ভেতরে সম্পৃক্ত করা যায়। স্থলসীমা এবং জলসীমা উভয় ক্ষেত্রেই এটা ভাবতে হবে। স্থল সীমানায় সীমান্ত হাট বসানোর মতো কিছু উদ্যোগ আছে। কিন্তু এটাকে আরও বিস্তৃত পরিসরে ভাবতে হবে। জলসীমায় ব্লু ইকোনমির কার্যক্রমকে যৌথভাবে এগিয়ে নেওয়ার বিষয়টিতে আরও বেশি মনোযোগী হতে হবে। সীমান্ত যখন জনকল্যাণ ও নিয়মতান্ত্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি ক্ষেত্র হবে, তখন সীমান্ত হত্যার মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাগুলোও আর থাকবে না। আগের চেয়ে সীমান্ত হত্যা কমেছে এটা সত্য, কিন্তু বন্ধুপ্রতিম দু'দেশের সীমান্তে একটি হত্যার ঘটনাও ঘটবে না, এটাই প্রত্যাশিত।
দ্বিতীয়ত, দু'দেশের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য আগের চেয়ে বেড়েছে। কানেক্টিভিটি বাড়ানোর জন্য অনেক ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মৈত্রী সেতুও চালু হয়েছে। এগুলো অবশ্যই ইতিবাচক। এখন দু'দেশের বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ আরও বাড়ানোর দিকে মনোযোগী হতে হবে। যেখানে যতটুকু সম্ভাবনা আছে, তা কাজে লাগাতে হবে। বিশেষ করে দু'দেশের ভেতরে পণ্য প্রবেশ নিয়ে শুল্ক্ক ও অশুল্ক্ক বাধাগুলো দূর করতে হবে। বাণিজ্য বাধা দূর করার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক উদ্যোগ খুবই প্রয়োজন। বাংলাদেশে ভারতীয় ঋণে বড় বড় প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। এটা যেমন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটা ইতিবাচক দিক, তেমনি দু'দেশের বিনিয়োগ বিস্তৃত করার বিষয়টিতে গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশে ভারতের বিনিয়োগ যেমন বাড়তে পারে, তেমিন ভারতের উত্তর-পূর্ব অংশে সেভেন সিস্টারে বাংলাদেশের বিনিয়োগের ক্ষেত্রও তৈরি হতে পারে। এভাবে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়টিতে নজর দিলে তা উভয় দেশের অর্থনীতিতেই ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
তৃতীয়ত, দু'দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির বিষয়টিতে গুরুত্ব দিতে হবে। এটা সত্যি যে, আগের চেয়ে দু'দেশের জনগণের মধ্যে সম্পর্ক বহুগুন বেড়েছে। এটা আরও বাড়াতে হবে এবং বহুমাত্রিক যোগাযোগ হতে হবে। মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ যত বাড়বে, দু'দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ততবেশি দৃঢ় হবে। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্বার্থে জনগণের মধ্যে বিভাজন এবং বিদ্বেষ ছড়ানোর একটা প্রচেষ্টা রয়েছে। এটা কখনোই কাম্য নয়। কোনো অবস্থাতেই এমন কোনো বক্তব্য দায়িত্বশীল কারও কাছ থেকে কাম্য নয়, যা জনগণের মধ্যে বিরাগ এবং বিভাজন তৈরি করে। বরং দুই বন্ধু রাষ্ট্রের মধ্যে বন্ধুত্ব কীভাবে বাড়ে, পারস্পরিক আস্থা ও শ্রদ্ধা বাড়ে- সে ধরনের সচেতন বক্তব্যই প্রত্যাশিত।
সবশেষে বলি, কভিড-১৯ মহামারি বিশ্ব অর্থনীতির বাস্তবতা বদলে দিচ্ছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। এই মহামারির সময়েও ভারত টিকা সরবরাহের ক্ষেত্রে আবারও গভীর বন্ধুত্বের স্বাক্ষর রেখেছে। এটাই প্রমাণ করে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক সামনের দিনগুলোতে আরও নতুন মাইলফলক স্থাপন করে এগিয়ে যাবে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে এটাই প্রত্যাশা।
সাবেক রাষ্ট্রদূত ও কূটনৈতিক বিশ্নেষক


মন্তব্য করুন