বর্তমান জয়ের ধারা আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও অব্যাহত রাখতে চায় আওয়ামী লীগ। এ জন্য কৌশল প্রণয়নে ব্যস্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় নেতারা। দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-কোন্দল নিরসন, প্রার্থী বাছাই এবং বিদ্রোহী প্রার্থী যাতে না থাকে, সে জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা। একই সঙ্গে আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগে তৃণমূল পর্যায়ের নির্বাচনের মাঠে নিজেদের অবস্থানকে আরও সুসংহত করার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে ক্ষমতাসীন দলটি।
করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে দেড় বছরের বেশি সময় ধরে সারাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন একরকম ঝিমিয়ে পড়েছে। করোনার সংক্রমণ কমায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরুর তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। পাশাপাশি নির্বাচনী ডামাডোলও বাজতে শুরু করেছে। এরই মধ্যে নির্বাচন কমিশন (ইসি) থেকে স্থানীয় সরকারের অনেক নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। করোনা পরিস্থিতির উন্নয়ন সাপেক্ষে ডিসেম্বরের মধ্যেই ইউনিয়ন পরিষদসহ পর্যায়ক্রমে স্থানীয় সরকারের অন্যান্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের পরিকল্পনাও রয়েছে ইসির।
কুমিল্লা-৭ আসনের উপনির্বাচনসহ স্থানীয় সরকারের ২৩টি প্রতিষ্ঠানের ভোটের তারিখ ৭ অক্টোবর নির্ধারণ করে গত বৃহস্পতিবার তফসিল ঘোষণা করেছে ইসি। স্থানীয় সরকারের ২৩ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১২টি উপজেলা পরিষদ, ছয়টি পৌরসভা ও চারটি সিটি করপোরেশনের পাঁচটি ওয়ার্ডের উপনির্বাচন রয়েছে। করোনায় আটকে থাকা প্রথম ধাপের স্থগিত ১৬১টি ইউনিয়ন পরিষদ ও ৯টি পৌরসভায় ২০ সেপ্টেম্বর ভোটের দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। আর ডিসেম্বরের মধ্যে সারাদেশের কমবেশি সাড়ে তিন হাজার ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও উপজেলায় নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসি।
প্রথম দফায় ৭ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় কুমিল্লা-৭ আসনের উপনির্বাচনসহ স্থানীয় সরকারের ২৩টি প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনের প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়া শুরু করেছে আওয়ামী লীগ। মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে দলীয় মনোনয়ন ফরম বিতরণ ও জমা নেওয়ার কাজ চলমান রয়েছে। আগামীকাল বুধবার পর্যন্ত এ কার্যক্রম শেষ করে আগামী শনিবার সকাল সাড়ে ১০টায় সংসদীয় ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন মনোনয়ন বোর্ডের বৈঠকে দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করা হবে। এর আগে ৯ সেপ্টেম্বর দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি এবং দলীয় প্রার্থীদের বিজয়ী করার কৌশল নিয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকালে সর্বত্র সৎ-যোগ্য ও ত্যাগী নেতাদের দলীয় প্রার্থী করার প্রচেষ্টা নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন আওয়ামী লীগের কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা। তাদের ভাষ্য, দেশের সর্ববৃহৎ ও সুবিস্তৃত রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ এমনিতেই নির্বাচনের জন্য সব সময়ই প্রস্তুত থাকে। যে কোনো নির্বাচনে দলের একাধিক যোগ্য প্রার্থীও থাকেন। ফলে করোনা সংকটের কারণে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির থাকলেও স্থানীয় সরকারের আসন্ন নির্বাচনগুলোর জন্য খুব বেশি প্রস্তুতিও নিতে হবে না। কেন্দ্র থেকে প্রার্থী বাছাই করে ঘোষণা হওয়ামাত্রই সর্বস্তরের নেতাকর্মী নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে ঝাঁপিয়ে পড়বেন। এখন অতীতের নির্বাচনগুলোর জয়ের ধারা অব্যাহত রাখাটাই তাদের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
করোনার আগে স্থানীয় সরকারের সর্বশেষ বড় নির্বাচনী উৎসব গেছে ২০১৯ সালের মার্চ মাসজুড়ে এবং একই বছরের ১৮ জুন। সে সময় পাঁচ ধাপে দেশের ৪৯০টি উপজেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেটি ছিল ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়ের মাধ্যমে টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসা বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের প্রথম বড় ধরনের কোনো নির্বাচন। আর প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত উপজেলা পরিষদের এই নির্বাচনে সারাদেশের সিংহভাগ উপজেলায় বিপুলভাবে বিজয়ী হন আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা। যদিও নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত দলগুলোর মধ্যে সরকারবিরোধী বিএনপি ও বামপন্থি দলগুলো ওই নির্বাচন বর্জন করেছিল।
করোনার প্রাদুর্ভাব শুরুর পর চলতি বছরের ২২ জুন হয়েছিল দেশের ২০৪টি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন। এসব নির্বাচনসহ করোনাকালে বিচ্ছিন্নভাবে জাতীয় সংসদের যত আসনের উপনির্বাচন কিংবা স্থানীয় সরকারের নির্বাচন হয়েছে, সেগুলোতেও নিরঙ্কুশ জয়ের ধারা অব্যাহত ছিল ক্ষমতাসীন দলের। তবে এসব নির্বাচনও বর্জনের নীতিতে হেঁটেছে বিএনপিসহ বাম দলগুলো। কেবল আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও ১৪ দলের কয়েকটি শরিক দল ছাড়া ইসলামী দল এসব নির্বাচনে অংশ নিয়েছে।
এবারও স্থানীয় সরকারের নির্বাচন বর্জন করার ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছে বিএনপি ও তার রাজনৈতিক মিত্ররা। তবে ক্ষমতাসীন দলের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা বলেছেন, বিএনপি নির্বাচনে আসুক বা না আসুক, আওয়ামী লীগের নির্বাচনী কৌশল অক্ষুণ্ণই থাকবে। অতীতের মতো এবারও যোগ্য প্রার্থী দিয়ে এবং জনগণের মন জয় করেই নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবেন তারা। এ ক্ষেত্রে দলের মধ্যে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা, বিশেষ করে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ার প্রবণতা কঠোরভাবে দমন করা হবে। দলের যে বা যারাই বিদ্রোহী প্রার্থী হবেন, তাদের দলীয় পদপদবি থেকে বহিস্কারের পাশাপাশি কঠোর সাংগঠনিক শাস্তি দেওয়া হবে। ভবিষ্যতে অন্য কোনো নির্বাচনে প্রার্থী করার ক্ষেত্রেও তাদের বিবেচনায় নেওয়া হবে না।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সম্প্রতি দলীয় ফোরামের একাধিক অনুষ্ঠানে বলেছেন, স্থানীয় সরকারের নির্বাচনগুলোতেও সৎ, যোগ্য ও স্বচ্ছ ইমেজের এবং বিতর্কমুক্ত নেতাদেরই প্রার্থী করা হবে। কিন্তু নির্বাচনকে ঘিরে কোথাও কোনো ধরনের বিদ্রোহ কিংবা বিশৃঙ্খলা বরদাশত করা হবে। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গকারীদের কঠোর সাংগঠনিক শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক সমকালকে বলেন, জনকল্যাণমূলক ও নির্বাচনমুখী দল হিসেবে আওয়ামী লীগ সব সময় নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতই থাকে। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতেও এর কোনো ব্যত্যয় হবে না। এরই মধ্যে এমন প্রস্তুতি শুরুও হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের বিপুল উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সুফলভোগী দেশের মানুষ শুধু স্থানীয় সরকারের নির্বাচন নয়, আগামীতে যত নির্বাচনই হবে, সবক'টিতেই আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের বিপুল ভোটে জয়ী করবে বলেই তাদের বিশ্বাস।