সরকারি কলেজের জন্য প্রায় এক কোটি ২০ লাখ টাকা মূল্যের আসবাব দরপত্র ছাড়াই কিনতে চাইছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন একটি প্রকল্পের পরিচালক। নিজের পছন্দের প্রতিষ্ঠান থেকে বেশি দামে আসবাব কিনতে চান তিনি। এজন্য নিয়েছেন কৌশলের আশ্রয়। কৌশল হিসেবে সামনে রাখা হয়েছে একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানকে, তবে সে প্রতিষ্ঠানটি আদৌ কোনো আসবাব তৈরি করে না। 'ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লিমিটেড' নামের সরকারি এ প্রতিষ্ঠানটি জাহাজ নির্মাণ শিল্পের সঙ্গে জড়িত। প্রকল্প পরিচালকের পছন্দের বেসরকারি তিনটি প্রতিষ্ঠান মূলত আসবাবগুলো এই সরকারি প্রতিষ্ঠানকে সরবরাহ করবে।

আর এসব কিছু করতে গিয়ে প্রতিযোগিতামূলক উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি (ওপেন টেন্ডার মেথড বা ওটিএম) বাদ দিয়ে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি (ডিরেক্ট প্রকিউরমেন্ট মেথড বা ডিপিএম) অনুসরণ করতে চাইছেন প্রকল্প পরিচালক। আলোচিত এ প্রকল্পের নাম 'শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে জেলা সদরে অবস্থিত সরকারি পোস্ট গ্র্যাজুয়েট কলেজসমূহের উন্নয়ন (২য় সংশোধিত) প্রকল্প।' চলতি মাসে এ প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে। অথচ এখনও প্রায় ৫০ কোটি টাকার আসবাব কেনা বাকি রয়েছে। প্রকল্পটি তার নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রও পূরণ করতে পারেনি।

তবে সমকালের প্রশ্নের জবাবে প্রকল্প পরিচালক অধ্যাপক মুহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, 'আমাদের হাতে আর বেশি সময় নেই। তাই আসবাব কেনার প্রক্রিয়া আমরা বাতিলও করতে পারি।'

সরকারি প্রতিষ্ঠান সামনে রেখে আড়ালে আপনার পছন্দের বেসরকারি তিন প্রতিষ্ঠান থেকে আসবাব কেনার উদ্যোগ নিয়েছেন কেন- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, 'যেভাবে বলা হচ্ছে বিষয়টি আসলে সে রকম নয়। হাতে সময় কম থাকায় আমরা সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি অনুসরণ করতে চেয়েছিলাম। এখন কেনার প্রক্রিয়া বাতিলও করে দিতে পারি। তাহলে তো আর কোনো বিতর্ক থাকে না। তাই না?'

মাধ্যমিক উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) অধীনে পরিচালিত এই প্রকল্প শুরু হয়েছিল ২০১০ সালের আগস্টে। আগামী ৩০ জুন এ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে। প্রকল্পটি পার করেছে প্রায় ১২ বছর। দফায় দফায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হলেও বিভিন্ন জটিলতা ও পরিচালকের অদক্ষতায় প্রকল্পের কার্যক্রম শেষ করা যাচ্ছে না। এটি একটি রুগ্‌ণ প্রকল্পে পরিণত হয়েছে। এর পরও প্রকল্পের মেয়াদ আরও এক বছর বাড়াতে চলতি মাসে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগে প্রস্তাব পাঠিয়েছে মাউশি।

অভিযোগ উঠেছে, এ প্রকল্পের পরিচালক অধ্যাপক মুহাম্মদ নাসির উদ্দিন যথাসময়ে প্রকল্প শেষের বদলে জড়িয়ে পড়ছেন আর্থিক দুর্নীতিতে। প্রকল্পভুক্ত সরকারি কলেজের আসবাব কেনার ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক পদ্ধতি ওটিএমের বদলে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি ডিপিএমের আশ্রয় নিয়েছেন তিনি।

জানা গেছে, সরকারি ক্রয় বিধিমালা অনুসারে কেবল অতি জরুরি প্রয়োজনে, একক উৎপাদক এবং সরকারি উৎপাদক প্রতিষ্ঠান থেকেই ডিপিএম পদ্ধতিতে মালপত্র কেনা যায়। কিন্তু প্রকল্প পরিচালক নাসির উদ্দিন এমন একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সরকারি কলেজের আসবাব কিনতে যাচ্ছেন, যারা কলেজের আসবাব উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত নয়। ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লিমিটেড জড়িত জাহাজ নির্মাণ শিল্পের সঙ্গে।

প্রকল্পের কর্মকর্তারা জানান, এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশন একমাত্র সরকারি প্রতিষ্ঠান, যারা কলেজের আসবাব উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত এবং তাদের নিজস্ব আসবাব তৈরির কারখানা রয়েছে। ফলে কেবল তাদের কাছ থেকেই সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে আসবাব কেনা যেতে পারত। এ ছাড়া এই সরকারি প্রতিষ্ঠানটি এই প্রকল্প পরিচালক আসার আগে এই প্রকল্পে আসবাব সরবরাহ করেছেও।

সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস তাদের দর প্রস্তাবে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যৌথভাবে আসবাবপত্র সরবরাহের কাজটি করবে বলে উল্লেখ করেছে, যা সরকারি ক্রয় বিধিমালার পরিপন্থি। অনুসন্ধানে জানা গেছে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যৌথভাবে আসবাবপত্র সরবরাহ করার মাঝেই রয়েছে দুর্নীতির বীজ। এ ক্ষেত্রে প্রকল্প পরিচালক তাঁর পছন্দের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে আসবাবপত্র সরবরাহের জন্য নির্বাচন করে আর্থিক দুর্নীতির সুযোগ পাবেন। কাজটিকে নির্বিঘ্ন করার জন্য আসবাবপত্র ক্রয় সংক্রান্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গঠিত কমিটিকে বাদ দিয়ে নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে। নতুন কমিটিতে মন্ত্রণালয়ের কোনো প্রতিনিধিকে রাখা হয়নি, রাখা হয়েছে কেবল জুনিয়র কর্মকর্তাদের।

জানা গেছে, হাতে পর্যাপ্ত সময় থাকার পরও প্রকল্প পরিচালক ওটিএম পদ্ধতিতে আসবাবপত্র ক্রয়ে অনীহা প্রকাশ করেন এবং সর্বশেষ ই-জিপিতে দরপত্র আহ্বান করেন গত সেপ্টেম্বরে। এখনও প্রায় ৫০ কোটি টাকার আসবাবপত্র কেনা বাকি রয়েছে। ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লিমিটেডের দর প্রস্তাব পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সেখানে একটি হাইবেঞ্চের দর দেওয়া হয়েছে প্রায় ১১ হাজার টাকা। অন্যদিকে ওটিএম পদ্ধতিতে এর আগে কেনার জন্য নির্বাচিত মেসার্স সুস্মিতা এন্টারপ্রাইজকে গত এপ্রিলে পরিশোধ করা বিলে দেখা যায়, একটি হাইবেঞ্চের দর পড়েছে ৫ হাজার ২০০ টাকা। অর্থাৎ এখন কেবল একটি হাইবেঞ্চেই দরের পার্থক্য দাঁড়াচ্ছে ৫ হাজার ৮০০ টাকা। একইভাবে একটি সিটবেঞ্চের দরের পার্থক্য ৪ হাজার ৭০০ টাকা। প্রকল্পভুক্ত ৭০টি সরকারি কলেজের জন্য এমন হাজার হাজার হাইবেঞ্চ, সিটবেঞ্চ, টেবিল, চেয়ার, আলমারি প্রভৃতি কেনা হবে।

এসব বিষয়ে গত ২২ মে প্রকল্পের নিজ কার্যালয়ে প্রকল্প পরিচালক অধ্যাপক মুহাম্মদ নাসির উদ্দিন সমকালকে বলেন, সময় কম থাকায় ডিপিএম পদ্ধতিতে আসবাব কিনতে চেয়েছিলেন। এখন যে অবস্থায় আছে, তাতে ক্রয় প্রক্রিয়া বাতিল করে দিলেও সমস্যা নেই। আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যে যাই বলুক তাঁর প্রকল্পের অগ্রগতি বেশ ভালো। তিনি দাবি করেন, প্রকল্পের অগ্রগতি ৮৫ শতাংশের বেশি।

তবে মাউশির কাগজপত্রে দেখা যায়, এই প্রকল্পের অগ্রগতি ৭২ শতাংশ। এ নিয়ে প্রকল্পে পরিচালক বলেন, ঢাকা কলেজসহ বেশ কিছু কলেজে তাদের ভবন নির্মাণ শেষ। এখন লিফট কেনার টেন্ডার হবে। আরও কিছু কলেজে লিফট কেনার টেন্ডার হবে। চলমান সব কাজ একসঙ্গে যুক্ত করা হলে প্রকল্পের অগ্রগতি ৮৫ থেকে ৮৭ শতাংশ হবে।