চতুরঙ্গ

একটি মাথা আবশ্যক

 প্রকাশ : ৩০ এপ্রিল ২০১৮      

 সুমন্ত আসলাম

রাজধানীর বনানিতে বাসের চাপায় পা হারানো রোজিনা আক্তার রোববার সকালে মারা যান

রাজীবের ডান হাতটা এখনও রয়ে গেছে আমাদের কাছে। রেখে দিয়েছি সেটা খুব যতনে। সংরক্ষিত একটা জায়গায়, বুকের ভেতরে। একজন মানুষ বসে আছেন, দুটো বাসের চিপায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল তার হাত। তিনি দেখতে পেলেন, তার সেই হাতটা আটকে আছে বাসের গায়ে। তীব্র ব্যথায় ছেয়ে গেছে শরীর, তার চেয়েও বেদনায় কাতর হওয়া মন- জীবনে বুঝি আর কিছুই করা হলো না, পাওয়া হলো না এক টুকরো কাঙ্ক্ষিত সুখ, বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল বুঝি টুকরো টুকরো স্বপ্নগুলোও।

ব্যতিক্রমভাবে পাওয়া এ রকম হাত সহজে কাছে রাখা যায় না, পৃথিবীর কোথাও এমন নৃশংসভাবে পাওয়া হাত নেই, সম্ভবত এমন স্বপ্নগ্রস্ত বেদনাও নেই।

রাজীবের হাতটা কোথায় যেন উধাও হয়ে যায় মাঝেমধ্যে। বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর মতো সেটা ঘুরে বেড়ায় এখানে-ওখানে। অদৃশ্য হয়ে কাউকে কাউকে আঘাত করার চেষ্টা করে, পারে না। কারণ, এ হাত তো পাপ করেনি কোনো দিন- নিরীহ কোনো মানুষের ফাইল আটকিয়ে ঘুষ খায়নি, ক্ষমতার দাপটে খামচে ধরেনি কারও পিঠ, চাঁদা না পেয়ে কারও অফিসে গিয়ে একের পর এক থাপ্পড়ের কাণ্ড ঘটায়নি কারও চোখেমুখে, ওই হাতে লাঠি নিয়ে দখলও করেনি রাষ্ট্রের কোনো সম্পত্তি। ওই হাতটা দিয়ে এখনও মাঝেমধ্যে রক্ত ঝরে ফোঁটায় ফোঁটায়- ওগুলো রক্তবিন্দু নয়, মানবতার পতন; ওগুলো লাল মেশানো জল নয়, মনুষ্যত্বের স্খলন। প্রতিদিন ঝরে পড়া স্বপ্ন আর বাঁচার আকুলতার শেষ নির্লজ্জ প্রহসন।

হাত আরও একটা পেয়েছি আমরা- বগুড়ার আট বছরের শিশু সুমির হাত। বেপরোয়া ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে যা। তার বাবা দোকানের কর্মচারী দুলাল মিয়া, বাসায় ঝিয়ের কাজ করা মা মরিয়ম বেগম ওই কাটা হাতটা মাথায় ঠেকিয়ে কেঁদেছেন, বিলাপ করেছেন; ব্র্যাক স্কুলের প্রথম শ্রেণিতে পড়া মেয়ে সুমির দিকে তাকিয়ে মূর্ছা গেছেন ঘনঘন।

এই হাতটাও সংরক্ষণ করেছি আমরা। তাহলে মোট দুটো হাত হলো আমাদের।

রোজিনার পা-টা পেয়েছি আমরা অনেক আগেই, বাইশ বছরের রোজিনা। অন্যের বাসায় কাজ করে যে টাকাটা তিনি পেতেন, তা পাঠিয়ে দিতেন প্রত্যন্ত এক গ্রামে। প্রায় অচল মা-বাবার সংসার চলত তা দিয়ে। পা হারিয়ে তিনি নিজেও হয়ে গিয়েছিলেন অচল। শুধু শরীর নয়, সম্ভবত অচল হয়ে গিয়েছিল তার মনও। বিশোর্ধ্ব এক তরুণীর প্রতিনিয়ত স্বপ্ন- শেষ পর্যন্ত একটি সংসার, নিজের সংসার। যেটা আরও প্রগাঢ় হতো অন্যের সংসারে কাজ করে, গৃহকর্তা আর গৃহকর্ত্রীর প্রতিদিনের সুখের স্বাচ্ছন্দ্য দেখে, তাদের ফুটফুটে মেয়েটার প্রতিদিন লালনপালন আর যত্নের স্পর্শে। কিন্তু বনানীতে বাসের চাপায় প্রায় সব হারিয়ে ফেলেন তিনি। ছিল না স্বপ্ন, ছিল না সেই সংসার সাজানোর মৃদু ঠোঁট নাড়ানো গুনগুনানো সুরও। বেঁচে থাকাটাই তখন প্রতিদিনের কাতরতা ছিল, ছিল প্রতিমুহূর্তের আর্তি। কিন্তু তাও হলো না। তিনিও চলে গেলেন না ফেরার দেশে।

পা আরও একটা পেলাম আমরা, খুব তাড়াতাড়িই। কাজ শেষে বাসায় ফেরা প্রাইভেটকারের চালক রাসেল সরকারের পা। তার গাড়িতে ধাক্কা দেওয়ায় প্রতিবাদ করেছিলেন তিনি গাড়ি থেকে নেমে। মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের ঢালে গ্রিনলাইন বাসের চালক রাগ করে তার পায়ে তুলে দেন ভারী সেই বাসটা। সঙ্গে সঙ্গে বিচ্ছিন্ন তার পা।

রোজিনার একটা পা, রাসেলের একটা পা- মোট দুটো পা।

দুটো হাত জোগাড় হয়েছে আমাদের, দুটো পা-ও। শরীরের বাকি অংশও এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে জোগাড় করে ফেলেছি আমরা। এখন কেবল একটাই বাকি আছে- একটা মাথা। তবে আমরা যে সেই মাথা চাচ্ছি না। যে মাথাটায় ব্যথা হয় ঘনঘন। চারপাশে এত অরাজকতা দেখে যে মাথা ঘেমে ওঠে বারবার। আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কল্যাণে যে মাথাটার কাজ করার কথা প্রতিদিন- চাচ্ছি সেই মাথাটা।

ট্যাক্স দিই আমরা; আমাদের কষ্টার্জিত টাকায় লালন করি আমরা যাদের; যাদের মাথা ঠাণ্ডা রাখার জন্য এসির ব্যবস্থা করি সর্বক্ষণ; সেই মাথা যদি এত অন্যায় দেখে চুপচাপ বসে থাকে; সেই মাথায় যদি সামান্যতম মমত্ববোধ না জাগে; সেই মাথার চোখ দুটো যদি শয়নে-জাগরণে ক্ষমতার সিঁড়ি দেখে কেবল; তার মাথার মধ্যে শুধু থাকে নিজের স্বার্থচিন্তা; ওই মাথাটা যার আছে; যার দেহে আছে; ওখানে আর রাখার প্রয়োজন নেই।

ওটা এখন রাজীব, সুমি, রোজিনা আর রাসেলের দেহের খণ্ডাংশের সঙ্গে স্থাপন করব আমরা। নতুন একটা মানব তৈরি করব, যে মানব জীবনের পরতে পরতে বুঝবে- দেহ থেকে একটি মাত্র অংশ খসে পড়ার যন্ত্রণা কত তীব্র, কত মর্মস্পর্শী, কত প্রাণ আকুলিয়া।

দুই হাত-পাওয়ালা মানুষ চাই না আমরা, সুন্দর মাথার একজন মানুষ চাই। ওটা দিয়ে তৈরি হবে নতুন সেই মানুষ!

প্রকৃত একটা মাথা আবশ্যক এখন আমাদের।

আছে সেই মাথা?

আছে?



খালেদা জিয়ার জন্য পথে না নামলেও ...

 অজয় দাশগুপ্ত

কে বেশি জনপ্রিয়- খালেদা জিয়া, নাকি এইচএম এরশাদ? অনেকেই এ ...

০৯ ডিসেম্বর ২০১৮

আমাদের হারিয়ে যাওয়া মূল্যবোধ

  আবরার সাদী

ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজের আন্দোলন প্রসঙ্গে কিছু কথা বলব। ...

০৮ ডিসেম্বর ২০১৮

আমার নিছক আনন্দ যখন অন্যের না বলা কান্না

  ড. চৌধুরী সায়মা ফেরদৌস

একটি ক্লাসে বাবুল নামে দু'জন ছেলে আছে। বন্ধুরা কীভাবে তাদের ...

০২ ডিসেম্বর ২০১৮

নিঃশ্বাসে কষ্ট, বিশ্বাসে প্রত্যয়

 উমর ফারুক

বিজয় মাসের প্রথম দিনই না ফেরার দেশে চলে গেলেন বীর ...

০১ ডিসেম্বর ২০১৮