চতুরঙ্গ

একজন অনন্যা মায়ের গল্প

 প্রকাশ : ১৩ মে ২০১৮ | আপডেট : ১৩ মে ২০১৮      

 জেসমিন চৌধুরী

মা দিবস এলে মায়ের কথাই সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে। কাছে থেকে দেখা প্রথম নারী, ফলবতী গাছের শাখার মত নুয়ে থাকা একজন নারী, আকাশের মত উদার একজন নারী, পাহাড়ের মত ঋজু একজন নারী।

ছোটবেলা মাকে বড় দুঃখী মনে হতো আমার কাছে। মায়ের দুঃখের কারণগুলোর আলোচনায় যাব না, পরিবারের অনেকেই হয়ত একমত হবেন না। মায়ের কথা বলতে গিয়ে কোনো ধরনের তর্কে জড়িয়ে পড়ার ইচ্ছা নেই। কিন্তু মাকে সুখী দেখতে চাওয়ার কী প্রচণ্ড ইচ্ছা ছিল আমার, আর তাকে সুখী করার কী প্রাণান্তকর চেষ্টা তা তো বলতেই পারি।

বৃদ্ধ বয়সে মা যখন অসুখে আক্রান্ত, মৃত্যুর প্রহর গুনছেন তখন একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম তার কাছে কখনো কোনো অন্যায় করেছি কি না, করলে যেন ক্ষমা করে দেন। উত্তরে মা হেসে ফেলেছিলেন। বলেছিলেন, 'তুমি খুব ভালো বাচ্চা ছিলে, আমার অনেক দেখাশোনা করেছ।'

এমন সব কথা মা মনে করিয়ে দিলেন যা আমার নিজেরই মনে ছিল না— 'মনে আছে তুমি স্কুলে যাওয়ার আগে দুপুরের খাবার রান্না করে রেখে যেতে? সময় কম লাগার জন্য অনেক বেশি তেল ঢেলে দিতে ডেকচিতে যেন পেঁয়াজটা দ্রুত ভাজা হয়, তারপর মশলা দেয়ার আগে তেলটা ছেকে নিতে। কত বুদ্ধি ছিল তোমার!'

আমার নির্ভুলভাবে মনে আছে আরো অনেক ছোটবেলার কথা। মা পানসুপারি চিবুতে ভালোবাসতেন। তার দৈনিক কর্মযজ্ঞের একটা বড় অংশ ছিল সুপারি ছিলে নিয়ে রোদে শুকানো এবং ছরতা দিয়ে কুচিকুচি করে কেটে কৌটোয় ভরে রাখা। আমি শীতের ভোরে ঘুম থেকে উঠে সূর্যের আলো ফুটবার আগেই ছুটতাম বড়চাচার বাড়ির জঙ্গলে, যেখানে সারি সারি সুপারি গাছে ঝুলে থাকত হলুদ, কমলা আর সবুজ রঙের পাকা/আধপাকা সুপারি। রাতের বেলা কাঠবেড়ালি বা অন্যান্য নিশাচর প্রাণীর দাপাদাপিতে ঝরে পড়া কমলা রঙের সুপারি উঁকি দিত সবুজ ঘাসের ফাঁকে ফাঁকে। ভোরের আলো আধারিতে সুপারি কুড়িয়ে নিয়ে কোচড় ভরতে ভরতে মায়ের হাসিমুখ কল্পনা করে কী যে আনন্দ হতো আমার।

কখনো কখনো জাপানি লতার আড়ালে ঢাকা পড়ে যাওয়া শাসনি লেবু গাছে ধরে থাকা চালকুমড়া সাইজের বিশাল লেবু চোখে পড়ত। ওগুলো পাড়তে গিয়ে কাঁটার আঘাতে বিশ্রীভাবে হাত-পা ছড়ে গেছে কতবার, তবু শারীরিক যন্ত্রণার কাছে হার মানেনি মাকে আনন্দ দেয়ার লোভ।

একবার সুপারি কুড়াতে গিয়ে কী ভেবে এক আধমরা কচুগাছের নিচের মাটি খুঁড়তে শুরু করলাম, পেয়ে গেলাম ছোট দুটো মুখি। শুরু হলো খোঁড়াখুঁড়ি, অনেক পরিশ্রমের পর গোটা কয় মুখি নিয়ে বাড়ি ফিরে গেলাম। শীতের সময় মুখি ছিল দুর্লভ, তার উপরে আবার 'আন্না' কচুর মুখি। মায়ের খুশি দেখে কে!

মা মাছ ধরতে ভালোবাসতেন। দুপুরের খাওয়ার পর আব্বা ঘুমিয়ে গেলে প্রায়ই মা আমাদেরকে নিয়ে ছোটচাচার বাড়ির পুকুরে মাছ ধরতে যেতেন। আমার ভাইও যেত মাঝে মধ্যে, কিন্তু আমাকে রেখে যাওয়ার জো ছিল না মায়ের। মা ঠিক জানতেন পুকুরের কোন অংশটায় দিনের কোন সময়ে কোন ধরনের টোপ দিয়ে কী ধরনের মাছ ধরা যেতে পারে।

একদিন আমাদের বড়শি পড়ল গিয়ে এক শিঙ মাছের ঝাঁকে। বড়শি ফেলতে না ফেলতেই মাছ উঠে আসছে। মা মিনিটে মিনিটে এক ঝটকায় বড়শির সুতা পানি থেকে তুলে আনছেন আর আমি মাছটাকে 'বরি' থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বদনায় রাখছি। কিছুক্ষণের মধ্যেই বদনা ভরে গেল নানান আকারের শিঙ মাছে। মা আর আমি পরস্পরের দিকে তাকাই, দুজনের মুখে শিশুসুলভ হাসি। মা ইশারায় চুপ থাকতে বলেন আমাকে, কথা বললেই মাছের ঝাঁক পালিয়ে যাবে।

বড়শি থেকে মাছ ছাড়াতে গিয়ে হঠাৎ আমার হাতে কাঁটা ফুটে গেল। শিঙ মাছের কাঁটার গুতা যারা খেয়েছেন তারাই শুধু বুঝবেন সে কেমন ব্যথা! আমি ব্যথায় চিৎকার করে উঠলাম, সাথে সাথে আমার হাতের বাড়ি লেগে বদনাটা উলটে গেল, মাছগুলো পানির সাথে ঘাসের উপর দিয়ে গড়িয়ে পুকুরে গিয়ে পড়তে লাগল। মায়ের এতো সখ করে ধরা মাছ! আমি একমুহূর্তও না ভেবে দুই হাতে খাবলে খুবলে মাছগুলোকে বদনায় তুলতে লাগলাম। হাতে কাঁটা ফুটতে লাগল একের পর এক। কতগুলো মাছ পালালো, বাকিগুলো কোনোমতে বদনায় তুললাম। ততক্ষণে আমার ছোট্ট দুই হাত ব্যথায় নীল। মা সস্নেহে ধমকে দিলেন, 'এতো পাগল মেয়ে! মাছ বড় না নিজের জান বড়?' ছোট্ট বয়সের অল্প ভাষায় বুঝিয়ে বলতে পারিনি আমার মায়ের আনন্দ আর কষ্ট আমার কাছে সবচেয়ে বড়।

আমার শৈশব ছিল সম্পূর্ণরূপে খেলনাবিহীন। আমার মুক্তিযোদ্ধা বাবার রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক মুক্তির স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রথম গিনিপিগ ছিলাম আমরা— তার সন্তানেরা। ছেলেবেলায় অন্য বাচ্চাদের সাইকেল, পুতুল, রান্নাবাটির সেট, বল এবং খেলনা গাড়ির দিকে লোভনীয় দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছাড়া করার কিছু ছিল না। বাবা আমাদের চারপাশে মিতব্যয়িতার এবং কড়া শাসনের এমন একটা বলয় সৃষ্টি করে রেখেছিলেন যে খেলনার জন্য দাবি দাওয়া জানানোর কল্পনাও মনে আসতো না। তাই বলে কি আমার শৈশব আনন্দবর্জিত ছিল? আব্বা আমাদের শারীরিক এবং নৈতিক স্বাস্থ্য উন্নয়নের দিকে বিশেষ খেয়াল রাখতেন, কিন্তু আমাদের যে বিনোদনেরও প্রয়োজন আছে সেটা বোধ হয় তিনি কখনো চিন্তাই করেননি। এই বিষয়টা খেয়াল রাখতেন মা, তাও সম্ভবত অবচেতনভাবে, তার ব্যক্তিত্বের সাথে স্বাভাবিকভাবেই চলে আসত বিষয়টা।

মায়ের পুরোনো শাড়ি দিয়ে বানানো ঘর পরিষ্কারের ত্যানা ছিঁড়ে অদ্ভুত কৌশলে ছোট ছোট পুতুল তৈরি করতাম আমি, কার কাছ থেকে শিখেছিলাম মনে নেই। বড় চারকোণা এক টুকরা কাপড়ের মাঝখানে একটা কাপড়ের বল গুঁজে দিতাম। চারপাশটা মুচড়ে নিয়ে সুতা দিয়ে বেঁধে দিলেই হয়ে যেত একটা মাথা এবং শরীর। সেই শরীরের ভেতর দিয়ে ঢুকিয়ে দিতাম ছোট একটা বাঁশের কাঠি। ব্যস, হয়ে যেত দুই হাত বিশিষ্ট একটা পুতুল। তার গায়ে রঙ্গিন এক টুকরা কাপড় পেঁচিয়ে শাড়ি পরাতাম। কলম দিয়ে কপালে এঁকে দিতাম কালো টিপ। পুরুষ পুতুল বানানোর কৌশল জানা ছিল না বলে আমার পুতুল পরিবারে থাকতো একটি মা এবং অনেকগুলো মেয়ে। বাবার কোনো অস্তিত্বই ছিল না।

আমার পুতুলগুলো মায়ের চোখে পড়লেই হয়েছে কাজ, মা বলতেন, 'পুতুল বানানো শিরক, আল্লাহ ছাড়া আর কারো এই অধিকার নেই। তুমি কি এগুলোর শরীরে প্রাণ দিতে পারবে? মরার পর এইসব পুতুল সাপ হয়ে তোমাকে কামড়াবে। সাবধান, আর যেন কখনো পুতুল বানাতে না দেখি।'

নির্জীব পুতুলগুলো নতুন করে প্রাণ হারাতো আমার ধর্মভীরু মায়ের হাতে। মায়ের প্রতিটা কথা বিশ্বাস করতাম, তবুও আবারও লুকিয়ে লুকিয়ে পুতুল বানাতাম। এখন অবাক হয়ে ভাবি, একটা শিশুর সৃষ্টিশীলতার আকাঙ্ক্ষা কীভাবে অনন্তকাল দোযখের আগুন অথবা সর্পদংশনের ভয়কেও ছাপিয়ে উঠতে পারে।

মায়ের উপর রাগ হতো না একেবারেই। সবকিছুর পর আমার মা বড় কোমল ছিলেন। আমাদের দুপুরগুলো মায়ের উদ্ভাবিত অসংখ্য খেলনাবিহীন আমোদে আনন্দময় হয়ে উঠতো। হাতে সরিষার তেল মাখিয়ে পিড়িতে বসে বটি দিয়ে তেঁতুলের বিচি ছাড়াতেন মা। সেই বিচিগুলো ভরে রাখতেন বিস্কিটের টিনে। দুপুর হলে বিচিগুলো বিছানায় ছড়িয়ে দিয়ে জোড়/বেজোড় খেলা হতো। চোখের আন্দাজে বিচিগুলোকে সমান ভাগে তিন ভাগ করা হতো। মা, আমার চার বছরের বড় ভাই এবং আমি খেলতাম। হাতে কয়েকটা বিচি লুকিয়ে রেখে বলা হতো 'জোড়, না বেজোড়?' সঠিক অনুমানকারীকে হাতের বিচিগুলো দিয়ে দিতে হতো। কী অসাধারণ আনন্দ ছিল সেই খেলায়! সাথে যে অংকের হাতে খড়িও হয়ে যেত তা কি আর আমরা বুঝতাম?

তেতুলবিচি খেলা শেষ হলে শুরু হতো ধাঁধার আসর। অসংখ্যবার শোনা ধাঁধাগুলোও আবার শুনতে এবং সমাধান করতে গিয়ে উত্তেজনার অভাব হতো না। কে কার আগে উত্তর দেবে, প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যেত। পুরোটা ধাঁধা শেষ হবার আগে উত্তর দেয়া বারণ ছিল। মা মুচকি মুচকি হেসে সিলেটি ভাষায় বলে যেতেন, 'লাল গুলমুল লাল গুলমুল লাল তার বাকল, ই ফই যে ভাংগাইবো তার বড় আকল (ফই=ধাঁধা; বাকল=খোসা; আকল=বুদ্ধি)।' আমার ভাই এবং আমি দমবন্ধ করে কান খাড়া অবস্থায় হাঁটুর ওপর ভর দিয়ে প্রায় দাঁড়িয়ে যেতাম। মায়ের ধাঁধা বলা শেষ হবে আর চেঁচিয়ে উত্তরটা ঘোষণা করে বিজয়ী হবো— কমলা! কমলা! একটু বড় হবার পর আবার মায়ের সাথে ঝগড়া লেগে যেত, কমলার খোসা কি লাল? ওটা তো কমলা রঙের হয়। 'আপনার ধাঁধায় ভুল আছে মা!'

ছন্দের খাতিরে এ ধরনের কিছু ভুল থাকলেও অসম্ভব রকমের বুদ্ধিদীপ্ত কিছু ধাঁধাও মায়ের সংগ্রহে ছিল। সবচেয়ে চমৎকার ধাঁধাটি ছিল— আছে যত/আরো তত/তার আধা/তার পাই/তোরে দিয়া শ' পুরাই।/কত আছে?

বড় হয়ে কতজনকে এই ধাঁধা জিজ্ঞেস করেছি, কেউ উত্তর দিতে পারেনি। আমার মাও এর উত্তর বের করার সূত্রটা জানতেন কী না জানি না, হয়তো উত্তরটা তারও মুখস্ত ছিল। এভাবেই আমার শৈশবকে ভাবনার ব্যস্ততায় ভরে রেখেছিলেন আমার মা, যার নিজের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না। নিজের অজান্তেই ক্রিয়েটিভ থিকিং-এর ওপর জটিল প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন সন্তানদেরকে, যা হয়তো উন্নতমানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও সবসময় ঘটে না।

মাকে হারিয়েছি আজ পাঁচ বছরের বেশি হলো, মৃত্যুর সময় পাশে ছিলাম না, শেষকৃত্যেও অংশ নিতে পারিনি। মা নেই, এই উপলব্ধির সাথে অভ্যস্ততা হয়নি আজো, কখনো হবে না। আজকের মা দিবসে আমার মায়ের মত অসংখ্য মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানাই, যারা অনেক না থাকার মধ্যে সীমাহীন প্রাপ্তির জন্ম দিতে পেরেছিলেন।

লেখক: অভিবাসী শিক্ষক ও অনুবাদক



আবার প্রেমে পড়েছি

  তৌহিদুল হক

মানুষ স্বপ্নে হাবুডুবু খায়। স্বপ্নের বাস্তবায়নে মানুষের মনে বাসা বাঁধে ...

১৭ ডিসেম্বর ২০১৮

সাংবাদিকরা কি আগের মতই মার খাবেন

 রাশেদ মেহেদী

সিলেট, খুলনা, বরিশালসহ কয়েকটি সিটি করপোরেশন নির্বাচন এবং তারও আগে ...

১৩ ডিসেম্বর ২০১৮

খালেদা জিয়ার জন্য পথে না নামলেও ...

 অজয় দাশগুপ্ত

কে বেশি জনপ্রিয়- খালেদা জিয়া, নাকি এইচএম এরশাদ? অনেকেই এ ...

০৯ ডিসেম্বর ২০১৮

আমাদের হারিয়ে যাওয়া মূল্যবোধ

  আবরার সাদী

ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজের আন্দোলন প্রসঙ্গে কিছু কথা বলব। ...

০৮ ডিসেম্বর ২০১৮