চতুরঙ্গ

সোশ্যাল মিডিয়া: যোগাযোগ, বন্ধুত্ব ও পরিণতি

 প্রকাশ : ১৬ মে ২০১৮      

 তৌহিদুল হক

মানুষ প্রথম থেকেই স্বাদপূর্ণ জীবনের জন্য সঙ্গী খুঁজেছে। বাঁচতে গেলে সঙ্গী বা বন্ধুর সঙ্গ এড়িয়ে যাওয়া যায়; কিন্তু ভুলে থাকা যায় না। সঙ্গী খোঁজা, বন্ধুত্ব গড়ার প্রক্রিয়ায় সময়ের তালে তাল মিলিয়েছে নতুন নতুন উপায়।

সমাজ কাঠামোর কঠিন অনুশাসনে একসময় বন্ধুর সঙ্গে দেখা, মেলামেশা প্রত্যক্ষভাবে না হয়ে পরোক্ষভাবেই হয়েছে বেশি। আবার সময়ের কারণে সেই অনুশাসন এখন সেকেলে মনে হয়। মানুষ সৃষ্টি করেছে কাছে আসার সহজ উপায়। নিজের চিন্তা, চেতনা, ভালোলাগা শেয়ার করার সহজ কিংবা বাটন টাইপ প্রক্রিয়ার উদ্ভাবন মানুষকে বন্ধু জোগাড় করে দিয়েছে, এটি ঠিক। কিন্তু সে বন্ধু কখনও কখনও বন্দুকে পরিণত হয়েছে। কেড়ে নিয়েছে জীবন।

সোশ্যাল মিডিয়ার কথা বলছি! সোশ্যাল মিডিয়া উদ্ভাবনের কারণতত্ত্বে বিশ্ববাসীকে জানানো হয়েছিল- মানুষ হবে আরও আপন। খুঁজে পাবে ঠিকানা, জয় হবে মানবতার। বিপদে-আপদে, চিন্তা শেয়ার করে মানুষ কাছে আরও আসবে। এক চোখে দেখবে বিশ্ব,  পরস্পর বন্ধুত্ব হবে বেঁচে থাকার স্পিরিট। কথাগুলো শুনতে চমৎকার লাগে, অবাক বিস্ময়ে অপেক্ষা করি- সুদিন আসবে, সেই দিন হবে মানুষের।

সোশ্যাল মিডিয়ার উপকরণ বা মাধ্যম হিসেবে ফেসবুক এ দেশের তরুণদের বুকে নতুন ঝড় তুলেছে। এ ঝড় নিজেকে উপস্থাপনের ঝড়, নিজেকে ‘হিরোইজম’ ভঙ্গিতে প্রকাশ করে অন্যের দৃষ্টি আকর্ষণ, বিশেষ করে বিপরীত লিঙ্গের প্রতি বিশেষ মনোযোগ।

ফেসবুক ব্যবহার, ব্যবহারে সহজবোধ্যতা প্রায় সব বয়সের মানুষকে সম্পৃক্ত করেছে। যারা সম্পৃক্ত হন নি- হয় তারা জানেন না কীভাবে পরিচালনা করতে হয় কিংবা নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করেন।

ফেসবুকে অপরিচিত ব্যক্তিও হয়ে যাচ্ছেন পরিচিত। ভেঙে যাচ্ছে বন্ধুত্ব তৈরির সকল বৈশিষ্ট্য। একসময় বন্ধুত্ব সৃষ্টিতে জেন্ডার, বয়স মূল প্রাধান্য বিস্তার করত। এখন বন্ধুত্ব তৈরি হয় সম্পূর্ণ ইচ্ছার ভিত্তিতে, কিংবা কেউ প্রশংসা করছে ফেসবুকে প্রকাশ করা ছবির, মনে হচ্ছে- আহা! কত দিনের চেনা। একেই তো খুঁজছি। যেন পেয়ে যাওয়ার কিংবা যোগাযোগের সহজ উপায় ফেসবুক, যা সপ্তাহের সাত দিনই চব্বিশ ঘণ্টা খোলা।

ফেসবুক কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ার অন্যান্য মাধ্যম ব্যবহারে আমার কোনো আপত্তি নেই, কারণ বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার না করলে আমরা পিছিয়ে থাকব। কিন্তু যে জায়গায় আপত্তি সেটি হলো, অনেকের কাছে ফেসবুক এখন শুধু যোগাযোগ কিংবা মন ফ্রেশ করার মাধ্যম নয়; বরং এখন ফেসবুক অনেক তরুণের আসক্তিতে পরিণত হচ্ছে।

স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাসের সময়, মসজিদ-মন্দিরে প্রার্থনার সময়, খাবার সময়, এমনকি টয়লেটে গিয়ে ছবি তুলে ফেসবুকে প্রচার ও প্রদর্শন করা হচ্ছে। ছবির ওপর লেখা, ‘আমাকে কেমন লাগছে’ কিংবা ‘আজ নামাজের পরে’। ফেসবুকের এই দাপট আমরা চাই না।

বাংলার মাটিতে ফেসবুক হোক সত্যিকার অর্থে মানুষে-মানুষে সংযোগের মাধ্যম। সেখানে সংস্কৃতি ও রুচির স্পষ্ট ছাপ থাকবে, থাকবে ব্যক্তিত্ব। বন্ধুত্বের একটি যোগসূত্র থাকবে, যে যোগসূত্রের ভিত্তিতে আমরা বিশ্বভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হবো। এর বাইরে যা কিছু হবে তার পরিণতি হবে ধ্বংস, হত্যা, নির্যাতন কিংবা সম্মানহানি।
 
একটি বেসরকারি টেলিভিশনের রিপোর্টে দেখলাম, একদল আকর্ষণীয় তরুণী ফেসবুক ফাঁদের মাধ্যমে বিবাহিত পুরুষ, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ও শিক্ষক এবং উচ্চবিত্তের সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে, ছবি তুলে পরে তা প্রকাশ করার ভয় দেখিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে অর্থ। রিপোর্টে এক ভিকটিম সাক্ষাৎকার দিচ্ছে, 'আমি এখন কী করবো?' বুঝতেই পারছেন, ফেসবুকের জ্বালা, বন্ধুত্বের শক্তি, বন্ধুত্বের বন্ধন! ফেসবুকের কোন দোষ নেই, দোষ মানুষের- বিনা পুঁজিতে বন্ধুত্বের স্বাদ নিতে গেলে অর্থ বা সম্মান গচ্চা দিতে হবে, এর বিকল্প নেই।

আবার, ফেসবুকের বন্ধুত্ব অনেক গভীর হয়েছে, হয়েছে সংসার, সন্তান। বিষয় হলো, কিভাবে পরিচালনা করা হবে? ফেসবুক বা সোশ্যাল মিডিয়া যেভাবে পরিচালনা করা হবে সেভাবে আওয়াজ দেবে। তবে দেশের সংস্কৃতি ও সামাজিক ঐতিহ্য বিচার করে নিজেদের তুলে ধরা এবং অন্যের সঙ্গে সম্পর্কের গতি-প্রকৃতি নির্ধারণ করা উচিত। বাংলাদেশে এই মুহূর্তে  সোশ্যাল মিডিয়া বিশেষ করে ফেসবুক ব্যবহারকে কেন্দ্র করে যে ধরনের সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, এ জন্য দায়ী আমাদের কর্তৃপক্ষ। যে জাতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণের কৌশল জানে না, তাদের ক্ষেত্রে প্রায় বিনা পুঁজিতে বন্ধুত্বের সুযোগ উন্মুক্ত করা ঠিক হয়নি।
 
তরুণ সমাজের প্রায় সবাই আজ ফেসবুকের তাড়নায় তাড়িত এবং ঘরে-বাইরে তটস্থ। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য আমাদের সজাগ হওয়াটা জরুরি, সে ক্ষেত্রে নিন্মোক্ত পদক্ষেপগুলো প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পরিচালনা করা যেতে পারে: (ক) অভিভাবকদের দৃঢ় অঙ্গিকার করা যে, বিশ্ববিদ্যালয়ে না পড়া পর্যন্ত সন্তানকে স্মার্টফোন দেওয়া হবে না। যোগাযোগের জন্য ক্ষেত্র বিশেষে এনালগ মোবাইল ফোন কিনে দেওয়া যেতে পারে। বিভিন্ন কৌশলের আশ্রয় নিয়ে সন্তানদের ভার্চুয়াল জগতের চলাফেরা পর্যবেক্ষণ করতে হবে। মনে রাখতে হবে পুঁজিবাদের খপ্পর এবং প্রযুক্তির আধুনিকায়নে আপনার সন্তান বিপথে গেলে তার দায়ভার আপনাকেই বহন করতে হবে। এক্ষেত্রে অভিভাবকদের সচেতনতার বিকল্প নেই। (খ) শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের একটি বড় দায়িত্ব রয়েছে। অনেক শিক্ষকও ফেসবুক জ্বরে আক্রান্ত। সামাজিক আদব-কায়দা, শিষ্টাচার, মূল্যবোধ শেখার অন্যতম ভরসার জায়গা হলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। প্রয়োজনে সচেতনতামূলক কার্যক্রমের আয়োজন করা উচিত। ক্লাস চলাকালীন কিংবা স্কুল-কলেজে অবস্থানকালীন কারও কাছে কোনো ধরনের মোবাইল ফোন রাখতে দেওয়া উচিত নয়। (গ) আমাদের দেশের সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো অনেক দুর্বল ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। এই দুর্বল ভূমিকার সুযোগে তরুণ সমাজ প্রযুক্তিকে আপন ভেবে বন্ধুত্বের খপ্পরে পড়ে কেউ আত্মহত্যা করছে, কেউ হতাশাগ্রস্ত হচ্ছে, কেউ সম্মানের ভয়ে কাবু হয়ে পড়ছে।

উপায় কী? উপায় আমাদের জানা, কিন্তু এর বাস্তবায়ন আমাদের পক্ষে কতটা সম্ভব- এটাই প্রশ্ন।

তরুণ সমাজকে যতক্ষণ পর্যন্ত নিজস্ব সমাজ ও সংস্কৃতির উপাদানের সঙ্গে পরিচিতি করা এবং ভালোলাগা তৈরি না করা যাবে ততক্ষণ পর্যন্ত তারা বিভিন্ন প্রযুক্তিগত উপায়ে মজা খুঁজবে, খুঁজবে বিনোদন। আর এই প্রযুক্তিগত বিনোদনে বিপদের মাত্রা বেশি, জীবনের ঝুঁকি বেশি। ব্যক্তি সংস্কৃতিবিমুখ হলে কিংবা অপসংস্কৃতিতে আসক্ত হলে সে নিজেই একটি বোমাসদৃশ। তাই ফেসবুক বন্ধুদের সম্পর্কে সতর্কতা অবলম্বন জরুরি। বন্ধুত্ব থাকবে তবে নির্দিষ্ট মেজাজে, আদবে ও পরিশীলিত মননে।

লেখক: কবি ও সহকারী অধ্যাপক, সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ই-মেইল: tawohid@gmail.com



খালেদা জিয়ার জন্য পথে না নামলেও ...

 অজয় দাশগুপ্ত

কে বেশি জনপ্রিয়- খালেদা জিয়া, নাকি এইচএম এরশাদ? অনেকেই এ ...

০৯ ডিসেম্বর ২০১৮

আমাদের হারিয়ে যাওয়া মূল্যবোধ

  আবরার সাদী

ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজের আন্দোলন প্রসঙ্গে কিছু কথা বলব। ...

০৮ ডিসেম্বর ২০১৮

আমার নিছক আনন্দ যখন অন্যের না বলা কান্না

  ড. চৌধুরী সায়মা ফেরদৌস

একটি ক্লাসে বাবুল নামে দু'জন ছেলে আছে। বন্ধুরা কীভাবে তাদের ...

০২ ডিসেম্বর ২০১৮

নিঃশ্বাসে কষ্ট, বিশ্বাসে প্রত্যয়

 উমর ফারুক

বিজয় মাসের প্রথম দিনই না ফেরার দেশে চলে গেলেন বীর ...

০১ ডিসেম্বর ২০১৮