চতুরঙ্গ

কী অভিমান শহীদকন্যা মেঞ্জেরা বেগমের

 প্রকাশ : ২৬ জুলাই ২০১৮ | আপডেট : ২৬ জুলাই ২০১৮      

 সাইফুল ইসলাম

একাত্তরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তার দোসরদের নিয়ে ছড়িয়ে পড়ে বাংলার গ্রামে গ্রামে, শুরু করে অগ্নিসংযোগ, হত্যা, লুণ্ঠন, নারী ধর্ষণ

অনেক চেষ্টা করেও যোগাযোগ করা যায়নি মেঞ্জেরা বেগমের সঙ্গে। দেশ স্বাধীন হওয়ার সমান বয়স তার। মায়ের কাছে শুনেছেন শহীদ বাবা মেঞ্জের হোসেনের কথা। কিন্তু দেখেননি নিজের চোখে। দেখবেন কীভাবে? বাবা যখন শহীদ হন তখন তো তিনি মায়ের পেটে। তার বাবা মেঞ্জের হোসেন এবং কাকা মোজাম্মেল হোসেনকে নির্মমভাবে হত্যা করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী, ১৯৭১ সালের জুনে।

শহীদ মেঞ্জের হোসেন ও শহীদ মোজাম্মেল হোসেনের বাড়ি তৎকালীন সিরাজগঞ্জ মহুকুমার সদর থানার শিয়ালকোল ইউনিয়নের উত্তর সারটিয়া গ্রামে। তাদের বাবা সবেদ আলী শোটকা, মায়ের নাম চিন্তা বিবি। সবেদ-চিন্তাবিবি দম্পতির দুই ছেলে তিন মেয়ে। বিশাল বাড়িসহ প্রায় ১০ বিঘা ধানি জমি তাদের। গাঁয়ের হিসেবে ধনী পরিবারই বলা চলে। 

যুদ্ধের আগেই মারা যান সবেদ আলী শোটকা। বাবা মারা যাওয়ার পর সংসারের দায়িত্ব পরে ২৬ ও ২৩ বছর বয়সী দুই ভাইয়ের ওপর। তারা বাড়ির সামনে রাস্তার পাশে খোলেন একটি মনোহারী দোকান। গ্রামের দোকান হলেও খরিদ্দার সামাল দিতে হিমশিম খেতে হতো দুই ভাইকে। ১০ গ্রামের মানুষ এক কথায় চিনতো মেঞ্জের-মোজামের সেই দোকান। আশপাশের গ্রামের বাসিন্দারা নিয়মিত খরিদ্দার ছিল দোকানের। কওমী জুট মিল, স্পিনিং মিলের শ্রমিক, শহর-ফেরতা মানুষ রাতে এ দোকান থেকেই সদাইপাতি কিনে ঘরে ফিরতো। বড় ছেলে মেঞ্জেরকে বিয়ে করিয়ে বউও এনেছিলেন চিন্তাবিবি। তাই গ্রামের মানুষ বলতো, স্বামী হারালেও দুই ছেলে, তিন মেয়ে, ছেলেবউ নিয়ে সুখেই আছেন চিন্তাবিবি।

এদিকে পাকিস্তানি শোষণ-বঞ্চনার প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে ওঠে পূর্ব বাংলা। তাদের দমন করতে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ ‘মানুষ চাইনা, মাটি চাই’ বলে হামলে পড়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। তাদের সঙ্গে জুটে যায় কিছু এদেশি দালাল। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তার দোসরদের নিয়ে ছড়িয়ে পড়ে বাংলার গ্রামে গ্রামে। শুরু করে অগ্নিসংযোগ, হত্যা, লুণ্ঠন, নারী ধর্ষণ। হায়েনারা জুন মাসের কোনও একদিন চলে আসে প্রত্যন্ত গ্রাম উত্তর সারটিয়াতেও। তখনও দোকান খোলা, দুই ভাই ব্যস্ত সেখানে। দোকান রক্ষা করতেই হয়তো তারা থেকে যান সেখানে। বাড়ি ও গ্রামের অন্যরা পালিয়ে যেতে পারলেও দুই ভাইকে ধরে ফেলে পাকিস্তানিরা, এগিয়ে আসার সাহসই পায় না কেউ। আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয় মেঞ্জের-মোজামের বিশাল মনোহারী দোকান। তাদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয় পাশ্ববর্তী শিয়ালকোল গ্রামে। সেখানে এক পরিত্যক্ত হিন্দু বাড়িতে নিয়ে বেদম পেটানো হয় দুই ভাইকে। এক সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাদের গুলি করে লাশ ফেলে রাখে সেখানেই। শহীদ হন বিধবা চিন্তাবিবির কর্মক্ষম দুই সন্তান মেঞ্জের হোসেন ও মোজাম্মেল হোসেন। এর কিছুদিন পর শহীদ মেঞ্জেরের স্ত্রী জন্ম দেন এক মেয়ে শিশু। শহীদের স্মৃতি ধরে রাখতে নবজাতকের নাম রাখা হয় মেঞ্জেরা বেগম। 

সদ্য স্বাধীন দেশ শহীদ মেঞ্জের ও শহীদ মোজামের দায়িত্ব নিতে ব্যর্থ হয়! তিন মেয়ে, এক ছেলে বউ আর নাতনিকে নিয়ে দিশেহারা চিন্তাবিবি পড়েন অথই সাগরে, নতুন যুদ্ধ শুরু হয় তার। একের পর এক জমি বিক্রি করতে থাকেন। তা দিয়ে সংসার খরচ চালান আর মেয়েদের বিয়ে দেন। বিয়ে দেন সদ্য বিধবা ছেলেবউকেও। এসব করতে করতেই স্বামী-সন্তানদের জমি-জমা, এমনকী বসত-ভিটাও শেষ হয়ে যায়। চিন্তাবিবি তখন একা। তাই দ্বিধাহীনভাবে নেমে পড়েন রাস্তায় ভিক্ষার থালা হাতে।

শহীদকন্যা মেঞ্জেরা বেগম বড় হন সৎ-বাবার বাড়িতে। মা ও সৎ-বাবা তাকে আদর যত্নে বড় করেন, বিয়ে দেন। মেঞ্জেরাও মা ও সৎ-বাবাকে ভালোবাসেন। জন্মদাতা বাবাকে তার মনে পড়ার কথাও নয়। তবুও নিশ্চয়ই মনে পড়ে মাঝে মাঝে, কারণ শহীদ বাবার নামটি তার নামের সঙ্গে গেঁথে দেওয়া হয়েছে। মাঝে মধ্যে মেঞ্জেরার নিশ্চয়ই গর্ব করতে ইচ্ছে করে, যখন তিনি ভাবেন যে, তার বাবা-কাকার রক্তের বিনিময়ে স্বাধীন হয়েছে এই দেশ। আবার হয়তো অভিমানও হয় মেঞ্জেরার। হয়তো ভাবেন, কী রাষ্ট্র বানালেন তার বাবা-কাকারা যে রাষ্ট্র এক শহীদের মেয়ের খবরই নেয় না? সে অভিমান থেকেই কী সব সময় নিজেকে গুটিয়ে রাখেন শহীদ মেঞ্জেরকন্যা মেঞ্জেরা বেগম?

লেখক: সাংবাদিক



বাংলাদেশে মানবাধিকার : আনুষ্ঠানিকতা নয় চর্চাই মুখ্য

 ড. মো. কামাল উদ্দিন

মানবাধিকার ধারণার ব্যাপ্তি, পরিধি ও ব্যবহারের ব্যাপকতা বেড়েছে অনেক গুণ। ...

১ ঘণ্টা আগে

আবার প্রেমে পড়েছি

  তৌহিদুল হক

মানুষ স্বপ্নে হাবুডুবু খায়। স্বপ্নের বাস্তবায়নে মানুষের মনে বাসা বাঁধে ...

১৭ ডিসেম্বর ২০১৮

সাংবাদিকরা কি আগের মতই মার খাবেন

 রাশেদ মেহেদী

সিলেট, খুলনা, বরিশালসহ কয়েকটি সিটি করপোরেশন নির্বাচন এবং তারও আগে ...

১৩ ডিসেম্বর ২০১৮

খালেদা জিয়ার জন্য পথে না নামলেও ...

 অজয় দাশগুপ্ত

কে বেশি জনপ্রিয়- খালেদা জিয়া, নাকি এইচএম এরশাদ? অনেকেই এ ...

০৯ ডিসেম্বর ২০১৮