চতুরঙ্গ

রাজনীতি কাদের হাতে

 প্রকাশ : ১১ অক্টোবর ২০১৮ | আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০১৮      

 ইমতিয়ার শামীম

একুশে আগস্টের গ্রেনেড হামলা রায়ের পর্যবেক্ষণে এবং মহামান্য রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের কয়েকটি অনুষ্ঠানে দেয়া সাম্প্রতিক বক্তব্যে এমন কিছু কথা রয়েছে, যা আমাদের আবারও রাজনীতি ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। প্রশ্নগুলো পুরানোই বটে, কিন্তু সেগুলোর মীমাংসা করা না গেলে মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে স্বাধীন একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেও আমরা যে রাজনৈতিক দুঃশাসন, দুর্বৃত্তায়ন ও অস্থিতিশীলতার মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছি, যে দুরপনেয় সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদিতা আমাদের এখনও ঘিরে রেখেছে, যে অসাম্য ও বৈষম্য আমাদের এখনও তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে তা শুধু প্রলম্বিতই হবে।

গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেছেন, ‘রাজনীতি মানেই কি পৈশাচিক আক্রমণ? বিরোধীদলীয় নেতৃবৃন্দকে হত্যা করে ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক ফায়দা অর্জন মোটেই গণতান্ত্রিক চিন্তার বহিঃপ্রকাশ নয়।’ আদালত জনগণের মনের কথাটিই বলেছেন, ‘সাধারণ জনগণ এ রাজনীতি চায় না।’

অন্যদিকে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫১তম সমাবর্তন অনুষ্ঠানে তার বক্তব্যে বলেছেন, রাজনীতি এখন গরিবের বউয়ের মতো হয়ে গেছে। অবসর নিয়েই আমলা, সামরিক ও পুলিশ কর্মকর্তা, ডাক্তার কিংবা উপাচার্য-শিক্ষক অনেকেই রাজনীতিতে নেমে পড়েন। রাষ্ট্রপতি হাস্যরসের মধ্যে দিয়ে বললেও এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটিকে নতুন করে উত্থাপন করেছেন, রাজনীতি কাদের হাতে রয়েছে বা যাচ্ছে? রাজনীতি কাদের হাতে থাকা উচিত?

অবসরপ্রাপ্তরা রাজনীতি করবেন, তাতে নিশ্চয়ই কেউ আপত্তি তুলবেন না; কিন্তু প্রশ্ন হলো,রাজনীতিতে নেমেই তিনি কর্মজীবনে কথিত ‘বিশ্বস্ততার’ প্রতিদান হিসেবে সংসদ সদস্য হতে চাইছেন, মন্ত্রী হতে চাইছেন। আর তার আগে কর্মজীবনে ওই বিশ্বস্ততার রেকর্ড গড়তে গিয়ে তিনি মূলত প্রতিষ্ঠানে দলবাজি করছেন, দলীয়করণ ঘটাতে সরকারি দলকে সহায়তা করছেন।

রাজনীতি যে রাজনীতিকদের হাতে থাকছে না, এই কথাগুলো আমাদের মতো অভাজন বহুবার বলেছে, বড় বড় দলগুলো ছোট ছোট যেসব দলকে নিয়ে উপহাস করে থাকে তারাও বলেছে, এমনকি সরকারি দলের সাংসদরাও বলেছেন। যেমন, ২০১৪ সালের বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে সরকারি দল আওয়ামী লীগের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা ও মন্ত্রী বলেছিলেন, রাজনীতি এখন আর রাজনীতিকদের হাতে নেই। তিনি অবশ্য এ জন্যে ১৯৭৫ পরবর্তী সামরিক শাসন ও শাসকদের দায়ী করেছিলেন। কিন্তু মাত্র কয়েকটি উদাহরণ যদি আমরা পেছন ফিরে দেখি, তা হলেই দেখা যাবে, সমস্যাটি আরও অনেক গভীরের, আরও অনেক সুদূরের এবং সত্যিকার অর্থে বলতে গেলে, ১৯৭২ সাল থেকেই রাজনীতি রাজনীতিকদের হাত থেকে সরে যেতে শুরু করেছে। আর নির্মম হলেও সত্য, রাজনীতিকরাই তাদের নানা তাৎক্ষণিক স্বার্থে এই প্রক্রিয়ার সূত্রপাত ঘটিয়েছেন।

যেমন, এতে কোনও সংশয় ছিল না যে, ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগই নিরংকুশ বিজয়ী হবে। কিন্তু তার পরও এই নির্বাচন শেষ পর্যন্ত যথেষ্ট স্বচ্ছ থাকেনি। যার ফলে জাতীয় সংসদে কয়েকজন বিরোধী দলীয় নেতা এমপি হিসেবে থাকলেও সাংবিধানিকভাবে তাদের পক্ষে বিরোধী দলীয় নেতা নির্বাচন করা সম্ভব হয়নি।

একই বছর অনুষ্ঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন। এ নির্বাচনের ভোট গণনার সময় ব্যালট পেপার ছিনতাই করে বিরোধী ছাত্র সংগঠনের অবশ্যম্ভাবী বিজয়কে রুখে দেয়া হয়।

আবার স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ যে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের যুগে প্রবেশ করে, তাতে সংসদীয় রাজনীতিও বিপণ্ন হয়ে পড়ে। মুক্তিযুদ্ধের পরপরই ১৯৭২-এর ৬ জুন খুলনার আবদুল গফুরকে হত্যার মধ্যে দিয়ে সাংসদ হত্যার সূচনা হয়। প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সহিংসতা দানা বাধতে থাকে, যা নির্বাচনের পরও অব্যাহত থাকে। প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরপরই কোটালীপাড়ার সিকির বাজার থেকে নৌকায় করে গোপালগঞ্জে আসার সময় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ও সিপিবি নেতা ওয়ালিউর রহমান লেবু, এমপি পদপ্রার্থী ন্যাপনেতা কমলেশ বেদজ্ঞ, ছাত্র ইউনিয়ন নেতা বিষ্ণুপদ ও মানিককে কুপিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। তোলপাড় তোলা এই রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের আজও কোনও বিচার হয়নি। এরপর ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যার পূর্ব পর্যন্ত বিভিন্ন সময় ছয় জন সাংসদ নিহত হন। এসবের পাশাপাশি আরও কত যে সরকারি ও বিরোধী দলীয় নেতাকর্মী রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও সন্ত্রাসে জীবন দিয়েছেন, তার ইয়ত্তা নেই। রাজনৈতিক হত্যার যে অপসংস্কৃতি তখন শুরু হয়, তা সব রাজনীতিকের জীবনকেই অনিশ্চিত করে তোলে। এরকম সব হত্যার বিচার গত ৪৫ বছরেও হয়নি।

কার্যত বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে রাজনীতিও ন্যাক্কারজনক ভূমিকা রাখছে। তাই গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণ যেন শুধু গ্রেনেড হামলাকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে নয়, এ রাষ্ট্রের বিগত কয়েক দশকেরও প্রতিনিধিত্ব করছে।

ভারত ও পাকিস্তান একই সঙ্গে স্বাধীন হলেও পাকিস্তান কেন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে উঠতে ব্যর্থ হয়েছে, এর কারণ সম্পর্কে ভারতের বিশিষ্ট রাজনীতিক ও সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জী বলে থাকেন, স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই ভারত একটি ব্যাপারে সতর্ক ছিল-রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর দলীয় রাজনীতিকরণ যাতে না ঘটে, সে ব্যাপারে দেশটির রাজনীতিকরা সতর্ক ছিলেন। দু-একটি ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ঘটলেও রাজনৈতিক দলগুলো দেশটির বেসামরিক প্রশাসন ও সামরিক বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত উচ্চপদস্থ আমলাদের কখনো নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ দেয়নি। দু-একটি ব্যতিক্রমের কথা বলতে গিয়ে তিনি হয়তো বিজেপিকেই ইঙ্গিত করে থাকেন। কারণ বিজেপি ভারতের সাবেক সেনাপ্রধান ভি কে সিংকে মনোনয়ন দিয়েছিল। প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের মাধ্যমে বিজেপি ভারতকে ও ভারতের গণতন্ত্রকে যে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, তা নিয়ে অনেক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরই উদ্বেগ রয়েছে।

প্রণব মুখার্জীর এই কথাগুলোকে সূচক ধরে যদি বাংলাদেশকে বিবেচনায় নিই, তা হলে কী দেখতে পাই? দেখা যায়, ১৯৭৫ সালের শুরুর দিকেই দেশটি প্রথমে একদলীয় শাসনব্যবস্থার দিকে যাত্রা করে, আর এর মাত্র কয়েক মাস পরেই রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ভয়ঙ্কর হত্যাকাণ্ডের মধ্যে দিয়ে রাষ্ট্রের স্থপতিকে সপরিবারে হত্যা করে সামরিক শাসনের সূচনা করে। এই সামরিক শাসন বৈধতা পেতে সেনানিবাস থেকে দু-দুটি রাজনৈতিক দলের জন্ম দেয়, অবসরপ্রাপ্ত ও দলছুটদের একত্রিত করে বারোয়ারী দল গঠনের পরিবেশ  তৈরি করে এবং মুক্তিযুদ্ধবিরোধী দলগুলোকে রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ করে দেয়। অন্যদিকে নির্যাতন-নিপীড়নের পথে ঠেলে দেয় নিয়মতান্ত্রিকভাবে গড়ে ওঠা দলগুলোকে, তাদের জন্যে ভাঙনের ও অনৈক্যের ফাঁদ পাতা হয়, রাজনীতিকে সত্যিই বিপজ্জনক করে তোলা হয়। এই বিপজ্জনক পরিস্থিতির মধ্যে দিয়েই এখনও এগোতে হচ্ছে এ দেশের রাজনীতিকে।

এই বিপজ্জনকতার উদ্বেগ শুধু আমাদের মধ্যেই আটকে নেই; মহামান্য রাষ্ট্রপতিকেও এখন বলতে শুনছি, ‌‘জনগণ এখন ছাত্রনেতাদের ভয় পায়’ (সমকাল, ৯ অক্টোবর ২০১৮)। যে ছাত্রসমাজ তাদের আন্দোলন-সংগ্রাম ত্যাগ তিতিক্ষার মধ্যে দিয়ে এই জাতিকে মুক্তিযুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত করেছিল, জনগণ যদি এখন তাদেরই ভয় পায়, তা হলে সেই জনগণ ও ছাত্রসমাজের ভবিষ্যৎ বলে কি কিছু থাকে? রাষ্ট্রপতি আহ্বান রেখেছেন, যারা তরুণ বয়স থেকে রাজনীতি করবেন, রাজনীতিতে তাদেরই অগ্রাধিকার থাকা উচিত। কিন্তু সেই তরুণদের নিয়েও যে তিনি কত শঙ্কিত তার আঁচ পাওয়া যায় এই অভিযোগ থেকে, ‌‌‘ছাত্রলীগের সভাপতি যদি হেলিকপ্টারে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় যায়, এটা কি মেনে নেয়া যায়? তারই বা আয়ের উৎস কী? কেউ কি তাকে ব্যবহার করছে?’ তিনি উদ্বিগ্ন বোধ করছেন, কেননা ছাত্রনেতারা এখন মূল দলের আজ্ঞাবহ। তাকে বলতে শুনি, ‘এখন ছাত্ররা মূল দলের পেটে ঢুকে পড়ে। সত্যিকার ছাত্র রাজনীতি করতে হলে এসব থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।’

সামনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। যা নিয়ে সরকারি দলের মতে, উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনও কারণ নেই; কিন্তু বিরোধী বেশ কিছু দলের মতে, উদ্বেগ-আশঙ্কা রয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে রাজনীতি কাদের হাতে আছে, ভবিষ্যতে কাদের হাতে থাকবে— এ সব প্রশ্নের নিরসন হওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুজেঁ নেয়া এখন খুবই জরুরি— যারা অগণতান্ত্রিকতার চর্চা করেন, তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার বলতে কী বুঝব? অগণতান্ত্রিক, মৌলবাদী শক্তিকে গণতান্ত্রিক উপায়ে রুখে দেয়ার পন্থা আসলে কী? রক্তপাতের আশঙ্কাকে আমরা দূর করব কী করে— নির্বাচনে যে কোনও উপায়ে বিজয় নিশ্চিত করে, না কি ইতিবাচক রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রসার ঘটিয়ে? সরকারি দল থেকে বিরোধী দল— কে কাকে মনোনয়ন দেয়ার চিন্তাভাবনা করছেন, সেসব থেকেই অবশ্য আমরা খানিকটা আঁচ করতে পারছি যে, আমাদের সামনে আপাতত কোনো আশার আলো নেই। আশার আলো জ্বালানোই এখন আমাদের বড় সংগ্রাম।

গত কয়েক দশকে রাজনীতিকে কুক্ষীগত করে রাখার নানা প্রচেষ্টাই দেখা গেছে। তার গড় ফল হলো কি রাজনীতিক কি জনগণ— উভয়েই নিরাপত্তাহীন ও অধিকারহীন হয়ে পড়েছেন। কেবলমাত্র রাজনৈতিক স্বচ্ছতার মধ্যে দিয়েই রাজনীতিকরা পারেন এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে। পারেন রাজনীতিকে নিজেদেরই হাতে রাখতে। পারেন আশার আলো জ্বালাতে।


  • নারীকর্মী না ‘রেমিটেন্স মেশিন’

    নারীকর্মী না ‘রেমিটেন্স মেশিন’


খালেদা জিয়ার জন্য পথে না নামলেও ...

 অজয় দাশগুপ্ত

কে বেশি জনপ্রিয়- খালেদা জিয়া, নাকি এইচএম এরশাদ? অনেকেই এ ...

৯ ঘণ্টা আগে

আমাদের হারিয়ে যাওয়া মূল্যবোধ

  আবরার সাদী

ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজের আন্দোলন প্রসঙ্গে কিছু কথা বলব। ...

০৮ ডিসেম্বর ২০১৮

আমার নিছক আনন্দ যখন অন্যের না বলা কান্না

  ড. চৌধুরী সায়মা ফেরদৌস

একটি ক্লাসে বাবুল নামে দু'জন ছেলে আছে। বন্ধুরা কীভাবে তাদের ...

০২ ডিসেম্বর ২০১৮

নিঃশ্বাসে কষ্ট, বিশ্বাসে প্রত্যয়

 উমর ফারুক

বিজয় মাসের প্রথম দিনই না ফেরার দেশে চলে গেলেন বীর ...

০১ ডিসেম্বর ২০১৮