নাম আছে, ভাই?

 প্রকাশ : ২১ নভেম্বর ২০১৮      

 অজয় দাশগুপ্ত

কোরবানীর কয়েকদিন আগে ঢাকা শহরে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত শব্দ থাকে ‘কত’? গরু কিনে বাড়ি ফেরাদের কাছে দাম জানতে চায় অচেনা সব লোক। উত্তর দিতে দিতে তারা পেরেশান। এখন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে শহর-বন্দর-গ্রাম-গঞ্জ, সর্বত্র একটিই প্রশ্ন— নাম আছে, ভাই? জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনে প্রার্থী ১২ হাজারের বেশি। তাদের সবাই মনে করছেন, তিনিই সবচেয়ে যোগ্য, সেরাদের সেরা। তার আসনে অন্য যাকেই দল থেকে বা জোট থেকে দেওয়া হোক না কেন আসনটি প্রতিপক্ষের কাছে হারানো নিশ্চিত। 

সবাই এমপি হতে চায়! এখানে কী যে মধু! কত যে মধু!

কয়েক দিন আগে এক টিভি আলোচনায় সঙ্গী ছিলাম এক ধনবান ব্যক্তির। তিনি নিশ্চিত যে মনোনয়ন মিলবে। তবে শঙ্কাও আছে, অপর এক ধনবান ব্যক্তির সঙ্গে তার বিবাদ রিয়েল এস্টেট ব্যবসা নিয়ে। বলা যায়, জমির লড়াইয়ের এই প্রতিপক্ষ তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মদদ দিচ্ছেন। এ প্রতিপক্ষ আবার একই দলের। দলে ফয়সালা হলে তার পর না নির্বাচনে নামার প্রশ্ন, জনগণের সমর্থনের প্রশ্ন। 

তিনশ’ আসনেই কিন্তু এ ধরনের সমস্যা আছে, কোথাও কম কোথাও বেশি। সমস্যা একেবারেই নেই, এমন কিছু আসনও কিন্তু আছে। সেখানে প্রবল প্রতাপশালী এমন কেউ আছেন তার বিরুদ্ধে দলের কেউ এমনকি মনোনয়ন চাইতেও সাহস করবেন না। শুধু নিজ আসনে নয়, সমর্থকরা তাকে দেখতে চান একাধিক আসনে। ১৯৮৬ সালে একটি জেলার ৫টি আসনের সব ক’টিতে মনোনয়ন প্রদানের জন্য এক ব্যক্তির নাম পাঠানো হয়েছিল একটি বড় রাজনৈতিক দল থেকে। জেলা ও উপজেলা কমিটিগুলোর নেতারা বৈঠক করে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল। এটা আসলে সমর্থকদের কাণ্ড নয়, তাবেদারি। তৃণমূল থেকে কেন্দ্রে কয়েকটি নাম পাঠানোর নিয়ম আছে। কিন্তু নেতা যদি প্রবল পরাক্রমশালী হয়ে থাকেন, সেখানে অন্য কোনো নাম পাঠানোর সাহস দেখাবে না ‘তৃণমূল’। এই তৃণমূল কমিটি গঠনের সময় নেতা খুব মনোযোগী থাকেন, যাতে দল ও অঙ্গ সংগঠনের সব কমিটি তার অনুগতদের নিয়ে গঠিত হয়। যেখানে একাধিক নেতা বলবান, এমপি হওয়ার বাসনা পোষণ করেন সেখানে বাধে কমিটি গঠন নিয়ে সংঘাত। কিংবা দলাদলির কারণে বছরের পর বছর গঠিত হয় না কমিটি।

আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ব্যস্ত প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করতে। জোট সঙ্গীরাও ব্যস্ত— যদি শিকা ছেড়ে। সংবাদপত্রে যুক্তদের এখন খুব কদর সম্ভাব্য প্রার্থীদের কাছে। তাদের ধারণা, সাংবাদিকদের কাছে প্রধান দুই দল ও জোট থেকে কে কোন আসনে মনোনয়ন পাচ্ছেন, তার তালিকা আছে। কোনো কোনো পত্রিকায় মনগড়া তালিকাও প্রকাশ করা হচ্ছে। এ তালিকায় নাম দেখে কেউ কেউ মিষ্টি বিতরণ করছেন। তাতে লাভবান হচ্ছে মিষ্টির ব্যবসায়ীরা। ফুলের ব্যবসাও জমজমাট। কল্পিত তালিকায় কল্পিত নাম দেখেই ফটোতে পরানো হচ্ছে ফুলের মালা! প্রকৃত তালিকা প্রকাশ হওয়ার পর যদি তাতে নাম থাকে তাহলে কী যে ঘটবে, কে জানে। আর নাম যদি না থাকে? দল যদি তাকে মনোনয়ন না দেয়? দলের তালিকায় নাম থাকার পরও জোটের স্বার্থে যদি তাকে বিসর্জন দেওয়া হয়? কী করবেন তখন দলের জন্য, নেত্রীর জন্য ‘জীবন দিতে সদা প্রস্তুত’ নেতারা?

আমরা অপেক্ষায় প্রধান দুই দলের প্রার্থী তালিকার জন্য। বিএনপির জোটের নাম জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। সম্ভবত ড. কামাল হোসেনের ধারণা ছিল, তার নেতৃত্বেই জোটের পার্লামেন্টারি বোর্ড জোটের প্রার্থীদের মনোনয়ন চূড়ান্ত করার দায়িত্ব পালন করবে। কিন্তু সকলিগরল ভেল। এখন দেখা যাচ্ছে, সব কিছু চূড়ান্ত হচ্ছে লন্ডন থেকে। ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন বলেছিলেন, তারেক রহমানকে মাইনাস করার জন্যই ড. কামাল হোসেনকে সামনে আনা হয়েছে। কিন্তু এখন তো দেখা যাচ্ছে, তারেক রহমানকে ইন-করোনার জন্যই ডা. কামাল হোসেনকে সামনে আনা হয়েছিল। দ্রুতই তিনি ব্যাক সিটে চলে গেছেন। এখন নির্বাচন কমিশনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রতিনিধি দল যায় না, বিএনপি নেতারাই সেখানে গিয়ে অভিযোগ পেশ করেন।

দেখা যাক, সামনের দিনগুলোতে এমন আরও কী চমক থাকে।

লেখক: সাংবাদিক