চতুরঙ্গ

আনোয়ারা: ঊনসত্তরের প্রথম নারী শহীদ

 প্রকাশ : ২৪ জানুয়ারি ২০১৯      

 ফয়েজ রেজা

শহীদ আনোয়ারা বেগম

শহীদ আসাদ, শহীদ মতিউর, শহীদ রুস্তমের মতো শহীদ আনোয়ারা রাজপথে নামেননি। শহীদ আনোয়ারার কণ্ঠে ছিল না বিদ্রোহের সুর। বাড়ির ছাদে উঠে স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের মিছিলে উত্তাপ বাড়ানোর চেষ্টাও করেননি, তারপরেও তাকে জীবন দিতে হয়েছে পুলিশের গুলিতে। তার শান্ত জীবন, শান্ত সংসার, অশান্ত করে দিয়েছিল স্বৈরতন্ত্রের আক্রোশ।

’৬৯ এর ২৫ জানুয়ারি, গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় দিন। বিক্ষুব্ধ ঢাকা নগরীর নাখালপাড়ার ৪৮৪ নম্বর বাসায় ৪ মাসের শিশু সন্তান নার্গিসকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছিলেন মা আনোয়ারা বেগম। এমন সময় টিনের বেড়া ভেদ করে স্বৈরাচারী সরকারের পুলিশ বাহিনীর রাইফেলের একটি বুলেট বিদ্ধ হয় ঢাকার মোহাম্মদ ইসহাকের স্ত্রী আনোয়ারা বেগমের পিঠে। ২৪ বছর বয়সী আনোয়ারা বেগমের পিঠ ছিদ্র হয়ে একই বুলেটের আঘাতে আহত হয় তার কোলের সন্তান নার্গিস। মুহূর্তেই রক্তে লাল হয় আনোয়ারা বেগমের সাজানো গোছানো ঘর, সংসার। যে ঘরে প্রতিবাদের কোনো হুঙ্কার ছিল না, যে ঘরে ছিল না স্লোগানে ভেসে যাওয়া শব্দের ঝংকার, সেই ঘরে পিশাচের ভয়াল থাবা ঢুকে রক্তাক্ত করে দেয় আনোয়ারা বেগমকে।

মায়ের শরীরের কাঁচা রক্তের গন্ধ তো লেগেছিল নার্গিসের কচি নাকেও। কী ভয়ংকর! কী বিভৎস! ধীরে ধীরে আনোয়ারা বেগমের শরীর হয়তো বরফের মতো ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছিল, চারদিকে জ্বলে উঠেছিল প্রতিবাদী চোখ। আনোয়ারা বেগমের নিথর লাশ দেখে আরেকবার প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছিল ঢাকার জনতা, শিশু নার্গিসকে তখন ভর্তি করা হয়েছিল হাসপাতালে। পরদিন খবরের কাগজে ছাপা হয়েছিল ছোট করে একটি খবর— ‘হঠাৎ সেনাবাহিনী কর্তৃক গুলি বর্ষিত হইলে সন্তানকে স্তনদানরত উক্ত মহিলা ঘটনাস্থলে মর্মান্তিকভাবে মৃত্যুবরণ করেন এবং শিশুটি আহত হয়। মাতৃহারা শিশুটি বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি রহিয়াছে বলিয়া জানা যায়।’   

একটি সুখী পরিবারের সকল সুখ, স্বপ্ন, কামনা-বাসনা মাত্র একটি বুলেটে চিরদিনের মতো থেমে যায়। স্বৈরাচারী সরকারের আসাদ, মতিউর, রুস্তমের তাজা রক্ত ধারার সঙ্গে শহীদ আনোয়ারার রক্ত ধারা মিশে এক দুর্বার আন্দোলনের পরিবেশ তৈরি করে। সান্ধ্য আইনের বেড়াজাল ভেঙে পাল্টা প্রতিরোধ তৈরি করে বিক্ষুব্ধ জনতা। জনস্রোত আর গণবিদ্রোহে কেঁপে ওঠে গোটা শহর। ঢাকার রাজপথে মিছিলের পর মিছিলে উচ্চারিত হয় প্রতিবাদী হুঙ্কার। নাখালপাড়ার ৪৮৪ নম্বর বাড়ির ঘটনাটি কোনো প্রচারযন্ত্র ছাড়াই ঢাকার অলিতে গলিতে ছড়িয়ে পড়ে বিদ্রোহের সুরে। এরপর যে বিদ্রোহ শুরু হয় চারদিকে…।

শহীদ আসাদ, শহীদ মতিউর, শহীদ রুস্তম, শহীদ আনোয়ারা বেগমের রক্তরেখায় ঊনসত্তরের ফুটন্ত কড়াই থেকে একাত্তরের জ্বলন্ত আগুনে ঝাপিয়ে পড়েছিল বহু নারী, পুরুষ, বহু কিশোরী, বহু কিশোর, বহু তরুণী, বহু তরুণ। যার ফসল একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বরের বিজয়, আমাদের স্বাধীনতা ও বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাহাত্তর, তিয়াত্তর ও চুয়াত্তরের সংবাদপত্রে ছোট করে হলেও ছাপা হতো শহীদ আনোয়ারার খবর। শিরোনামেও লেখা হতো ‘শহীদ আনোয়ারা দিবস আজ’। আনোয়ারার নাখালপাড়ার বাসায় স্মৃতিচারণ ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজনও করা হতো। সেসব খবর একটু একটু করে আসতো খবরের কাগজে। ১৯৭৬ সালের ২৫ জানুয়ারি ঢাকার একটি খবরের কাগজে ‘আজ শহীদ আনোয়ারা দিবস’ শিরোনামে একটি খবর প্রকাশ হয়। এতে বলা হয়, ‘ঊনসত্তরের গণবিস্ফোরণের দ্বিতীয় দিবসে টহলদার বাহিনীর গুলিতে নাখালপাড়া নিবাসী মোহাম্মদ ইসহাকের স্ত্রী আনোয়ারা বেগম শহীদ হন। শীতের সকালে নিজ গৃহপ্রাঙ্গণে বসিয়া আনোয়ারা স্তনদান করিতেছিলেন ৪ মাসের কন্যা নার্গিসকে। সেদিনের নার্গিস এখন ছয় বৎসরের শিশু।’

এরপর শহীদ আনোয়ার দিবসের খবর আর পাওয়া যায় না। প্রতিবছর ছোট ছোট প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে যা ছাপা হয় তার শিরোনাম— ‘শহীদ আনোয়ারা স্মরণে আজ মিলাদ মাহফিল’, ‘আজ শহীদ আনোয়ারা বেগমের …তম মৃত্যুবার্ষিকী’, ‘শহীদ আনোয়ারা বেগমের মৃত্যুবার্ষিকী আজ’। এ রকম শিরোনামে নাখালপাড়ার বাসভবনে মিলাদ মাহফিলে ক্রমশ আমাদের চেতনা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে শহীদ আনোয়ারা বেগম। আসাদ যে কারণে গণআন্দোলনে প্রথম শহীদ, আনোয়ারা বেগমও তো সে কারণে প্রথম নারী শহীদ। আন্দোলনের পথিকৃৎ হয়তো না, মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন— এটি তো সত্য। আনোয়ারা বেগমকে নিয়ে হয়তো কিছু কাজ হয়েছে, ফার্মগেটে যেমন আছে শহীদ আনোয়ারা পার্ক। তবে খুব বেশি কিছু আমরা জানি, যেমনটা জানি না উইপোকায় খাওয়া পুরনো বইয়ের স্তূপ থেকে বারবার উঠে আসা শহীদ আনোয়ারা বেগমের নাম।