পদবঞ্চিতদের বিক্ষোভ: সমস্যার গভীরে যেতে হবে

 প্রকাশ : ১৬ মে ২০১৯      

 আবু সাঈদ খান

কমিটি নিয়ে সম্প্রতি মধুর ক্যান্টিনে মারামারি- সংগৃহীত

আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছাত্রলীগ। কেন্দ্রীয় কমিটিতে পদবঞ্চিতদের ওপর হামলা চালিয়েছে পদতুষ্ট অংশ। সম্মেলনের এক বছর পর গত ১৩ মে ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় সংসদের ৩০১ সদস্যবিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। এতে পদ না পাওয়া ও প্রত্যাশিত পদ না পাওয়া নেতাকর্মীরা ওই দিনই সংবাদ সম্মেলন ডেকেছিলেন মধুর ক্যান্টিনে। 'তাদের ব্যানারে লেখা ছিল- 'ছাত্রলীগের নবগঠিত পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে অছাত্র, ছাত্রদল, বিবাহিত ও বিতর্কিতদের স্থান দেওয়া ও রাজপথের কর্মীদের বঞ্চিত করার প্রতিবাদে' সংবাদ সম্মেলন।

আয়োজক ছাত্রলীগের রাজপথের কর্মীরা। তারা যে টেবিলে সংবাদ সম্মেলন করার প্রস্তুতি নেন, তার পাশে অবস্থান নেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রব্বানীর অনুসারী নেতাকর্মীরা। সেখানে সাধারণ সম্পাদকের অনুসারীরা বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন।... এক পর্যায়ে হাতাহাতি শুরু হয়। সংবাদ সম্মেলন করতে আসা পক্ষের ওপর অন্যপক্ষের নেতাকর্মীরা হামলা চালান। (প্রথম আলো, ১৪ মে ২০১৯) এতে বেশ কিছু নেতাকর্মী আহত হন।

পদ পাওয়াদেরও কেউ কেউ পদবঞ্চিতদের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়েছেন। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এসব অনিয়ম অগ্রাহ্য করতে পারছে না। এ প্রসঙ্গে ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধরী শোভন বলেছেন, 'কমিটিতে যাদের বিষয়ে বিতর্ক উঠেছে তাদের বিষয়ে তদন্ত করা হবে। প্রমাণিত হলে তাদের পদগুলো শূন্য ঘোষণা করে যোগ্যদের মূল্যায়ন করা হবে। (সমকাল, ১৬ মে ২০১৯)

ঘটনাটিকে আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ 'সামান্য ঘটনা' বলেছেন। অতীতে ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে, এমনকি একই সংগঠনের দুই অংশের মধ্যে বন্দুকযুদ্ধ হয়েছে। রক্ত ঝরেছে। নিভে গেছে অনেক তরুণের প্রাণপ্রদীপ। সংগঠনের মধ্যে আত্মঘাতী সংঘর্ষ একদা ছাত্রদলেও ঘটেছে। তবে রেকর্ড গড়েছে ছাত্রলীগ। ছাত্রলীগ কর্মীর হাতে ছাত্রলীগ কর্মীর মৃত্যুর ঘটনা অনেক। এসব নির্মম ঘটনার বিচারে ১ মের মধুর ক্যান্টিনের ঘটনাকে হানিফ সাহেব বা অন্য কারও কাছে সামান্য মনে হতেই পারে। তবে এ ঘটনার মধ্য দিয়ে ছাত্র রাজনীতির যে চিত্র পাওয়া যায়, তা ভয়াবহ।

অভিযোগ কতটুকু সত্য বা মিথ্যা, তা নিয়ে কথা বলতে চাই না। প্রশ্ন হচ্ছে কমিটি করার প্রক্রিয়া নিয়ে। গণতান্ত্রিক বিধান ও রেওয়াজ অনুযায়ী, সম্মেলনে কমিটি নির্বাচিত হওয়ার কথা আর নির্বাচন ব্যালটে হওয়াই সঙ্গত। তবে অনেক সময় দেখেছি, নির্বাচিত ও বিদায়ী সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক কিংবা নির্বাচিত কোনো প্যানেল খসড়া কমিটি কাউন্সিলারদের সামনে উপস্থাপন করেন। তাতে সংযোজন-বিয়োজন করার পর পাস করা হয়। এ প্রক্রিয়াকে গণতান্ত্রিক বলতে আপত্তি নেই। কিন্তু কাউন্সিলের এক বছর পর সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক কমিটি ঘোষণা করলেন, তা কতটুকু গণতান্ত্রিক? সেটি আবার ৩০১ সদস্যবিশিষ্ট ঢাউস কমিটি। যদিও ছাত্রদলের কমিটি আরও বড়। যদ্দুর মনে পড়ে, স্বাধীনতা-পূর্ব অবিভক্ত ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি ছিল ৪৫ জনের। সেই কমিটি কোন বিবেচনায় ৩০১-এ উন্নীত হলো, তা বোধগম্য নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে এখন ছাত্রলীগের একক আধিপত্য। সেখানে মতাদর্শিক বাহাস হয় না। চলে পেশির মহড়া, যা প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবহূত হয়। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর ছাত্রদলের ক্যাডাররা ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের ক্যাম্পাস-হল থেকে খেদিয়ে দিয়েছিল। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ছাত্রলীগ ক্যাডাররা ছাত্রদলকে ক্যাম্পাসছাড়া করেছে। তবে সদ্য অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচনের সময় ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ক্যাম্পাসে পদচারণা করতে পারছে। এটি শুভ লক্ষণ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়নি। ৩০ বছর পর ডাকসু নির্বাচন হয়েছে। চাকসু, রাকসু, জাকসু ও বাকসুতে এখনও নির্বাচনের খবর নেই। এটি নির্দি্বধায় বলা যায়, যদি নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচন হতো, সব ছাত্র সংগঠনের শান্তিপূর্ণ অবস্থান থাকত, তাহলে সংগঠনগুলোর মধ্যে ভালো হওয়ার প্রতিযোগিতা থাকত; অসহিংসতার এমন প্রকাশ ঘটত না।

অসহিংসতা এখন সংক্রমিত একই সংগঠনের মধ্যেও। একই সঙ্গে মিটিং-মিছিল করছে। পরক্ষণে এসে একে অন্যের ওপর হামলা করছে। সতীর্থকে তাক করে গুলি করতেও দ্বিধা করছে না। যে লাঠি প্রতিপক্ষের মাথা ভাঙত, সে লাঠি সতীর্থদের মাথায়ও পড়ছে।

যেখানে আমরা শিক্ষাঙ্গন, সমাজ, রাজনীতি সর্বত্রই শান্তিপূর্ণ সহঅবস্থান চাইছি, সেখানে একই সংগঠনের মধ্যেও সামান্যতম সহিংসতাবোধ নেই। এর বড় কারণ, সংগঠনগুলোর মধ্যে গণতন্ত্রের চর্চা নেই। শিক্ষাঙ্গন থেকে রাজনৈতিক অঙ্গন- সর্বত্রই আদর্শ ও মূল্যবোধের সংকট।

ছাত্রলীগে গ্রুপিং পাকিস্তান আমলেও ছিল। স্বাধীনতার আগে সিদ্দিকী ও রব গ্রুপের কর্মীরা বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। নূরে আলম সিদ্দিকী ছিলেন শেখ ফজলুল হক মনির অনুসারী। আর আ স ম আবদুর রব ছিলেন সিরাজুল আলম খানের অনুসারী। দুই গ্রুপের মধ্যে মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব ও বাকবিতণ্ডা চলত। কখনও কখনও পাল্টাপাল্টি স্লোগান হয়েছে। রব গ্রুপ ধ্বনি তুলত- '৬ দফার আসল কথা- স্বাধীনতা স্বাধীনতা, বীর বাঙালি অস্ত্র ধর- বাংলাদেশ স্বাধীন কর।' জবাবে সিদ্দিকী গ্রুপ বলত- '৬ দফা মানে না যারা- জনগণের শত্রু তারা, বাঁশের লাঠি তৈরি কর- প্রতিবিপ্লবী খতম কর'। কিন্তু দুই গ্রুপের মধ্যে লাঠালাঠি হতো না। তারা পাল্টাপাল্টি স্লোগান দিয়ে একসঙ্গে হলে ফিরতেন, মধুর ক্যান্টিনে এসে একই সঙ্গে চা খেতেন।

অনেকে সৃষ্ট অবস্থার জন্য ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেছেন। আওয়ামী ঘরানার বুদ্ধিজীবীরাও বলেছেন, ছাত্রলীগের রয়েছে এক গৌরবদীপ্ত ইতিহাস। যে সংগঠন ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে, আইয়ুবের সামরিক শাসনবিরোধী সংগ্রাম করেছে, স্বাধীনতার পতাকা উড়িয়েছে। সেই ছাত্রলীগের এ অধঃপতন মেনে নেওয়া যায় না। মেনে নেওয়া কষ্টকর। তবে আমি কেবল ছাত্রলীগ বা অন্য ছাত্র সংগঠনকে দায়ী করতে চাই না। এ জন্য সামগ্রিক রাজনৈতিক অবস্থার দিকে তাকাতে হবে।

ব্রিটিশ-পাকিস্তান আমলে আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাস ত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল। বামদের তো বটেই, মধ্যবাম বা জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকদের জীবন ছিল কষ্টসহিষুষ্ণ। শেরেবাংলা ও সোহরাওয়ার্দী ওকালতি করে দেদার কামিয়েছেন। আবার দু'হাতে বিলিয়েছেন। মওলানা ভাসানী সন্তোষে পর্ণকুটিরে থাকতেন। বঙ্গবন্ধু, তাজউদ্দীন আহমদের জীবনে কোনো আড়ম্বর ছিল না; অত্যন্ত সাদাসিধে জীবন।

ষাটের দশকেই বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগও সমাজতন্ত্রকে ধারণ করেছিল। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বলেছিলেন, 'পৃথিবী দুই ভাগে বিভক্ত- শোষক আর শোষিত। আমি শোষিতের পক্ষে।'

সমাজতন্ত্র এখন শুধু সংবিধানবন্দি। এখন আর প্রচলিত ধারার রাজনৈতিক দলগুলো শোষণ-বৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলে না। সব দলই এখন মুক্তবাজার অর্থনীতির ধারক। মুক্তবাজারের ছোঁয়া লেগেছে রাজনীতিতেও। টাকা এখন রাজনীতিতে বড় ফ্যাক্টর। মনোনয়ন পেতে, ভোটে জিততে, দলের পদ বাগাতে চাই টাকা। এ সুযোগে ব্যবসায়ীরা রাজনীতিতে নেমেছেন। টাকার দাপটে ক্রমেই ওপরে উঠছেন। এ দৃশ্য দেখে পেশাদার রাজনীতিকদের একাংশ ছুটছেন টাকার পেছনে। ক্ষমতার বদৌলতে তারাও গাড়ি-বাড়ি, কাঁড়ি কাঁড়ি টাকার মালিক হয়েছেন। রাজনীতি থেকে যখন ত্যাগ-তিতিক্ষার বিষয়টি উধাও। টাকাই এখন যোগ্যতার মানদণ্ড। তারপর আওয়ামী লীগ-বিএনপিসহ রাজনীতিতে এখনও ত্যাগী ও আদর্শবাদী নেতারা আছেন; তারা নমস্য। তবে যাদের টাকা নেই, তারা ছিটকে পড়েছেন বা কোণঠাসা হয়ে আছেন। এ ভোগবাদী রাজনীতির প্রভাব থেকে ছাত্র সমাজ কি মুক্ত থাকতে পারে?

ছাত্রনেতারাও মনে করছেন, টাকা ছাড়া রাজনীতি করা যাবে না। তাই তারাও অর্থের পেছনে ছুটছেন। কেউ ঠিকাদারি বা ব্যবসা করছেন। কেউ করছেন চাঁদাবাজি বা তদবির বাণিজ্য। পদবাণিজ্য রাজনীতিতে নতুন সংযোজন। এসব থেকে উত্তরণের জন্য আদর্শবাদী রাজনীতি ও গণতন্ত্র চর্চা দুই-ই প্রয়োজন। কারও ভুললে চলবে না-নেতা হওয়ার যোগ্যতা যখন পেশি, তখন সৎ, মেধাবী আদর্শবাদীরা নেতৃত্বে আসবে না, আসতে পারে না। পেশির চর্চা থাকলে মেধার চর্চা হবে না, পেশি ও মেধার চর্চা একসঙ্গে চলতে পারে না। দলের ভেতরে ও বাইরে গণতন্ত্র চর্চার মধ্য দিয়েই যোগ্য, মেধাবী ও আদর্শবাদী নেতৃত্ব গড়ে উঠতে পারে; অন্য পথে তা সম্ভব নয়।

সংশ্নিষ্ট নেতারা কি বিষয়টি ভেবে দেখবেন?

সাংবাদিক ও লেখক
[email protected]