চতুরঙ্গ

বলা না-বলা

সংকট কি কেবল বিএনপিরই

 প্রকাশ : ০৮ মে ২০১৯ | আপডেট : ০৮ মে ২০১৯      

 আবু সাঈদ খান

বিএনপি যে সংকটে পড়েছে, তা এখন সংগঠনটির নেতাদের অনেকেই স্বীকার করছেন। তবে এই বিপর্যয়ের দায় কেউ নিচ্ছেন না। এমন অবস্থা কেন হলো— তা নিয়ে মূল্যায়ন-বিশ্লেষণও করছেন না বা করতে পারছেন না। এটিও বিএনপির সাংগঠনিক সংকট।

জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর খালেদা জিয়াকে কেন্দ্র করে বিএনপি পরিচালিত হচ্ছিল। দলের ঊর্ধ্বতন নেতাদের পরামর্শ দেওয়ার ক্ষমতা ছিল এবং এখনও আছে; কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণের এখতিয়ার ছিল কেবল খালেদা জিয়ারই। ২০০১ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তারেক রহমানকে ঘিরে উপকেন্দ্রের জন্ম নেয়। অচিরেই উপকেন্দ্রটি শক্তিশালী হয়ে একটি সমান্তরাল কেন্দ্রে পরিণত হয়। তারেক লন্ডনে এবং খালেদা জিয়া জেলে যাওয়ার পর নয়াপল্টনে স্থায়ী কমিটির সদস্যরা ভিন্ন একটি কেন্দ্র গড়ার কসরত করেছেন। তখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছিল, আসল কেন্দ্র কোনটি নয়াপল্টন, নাজিমুদ্দিন রোড না লন্ডন? বিগত সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন দান ও সংসদ সদস্যদের শপথ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার পর আর প্রমাণের অপেক্ষা রাখে না যে, লন্ডনই নেতৃত্বের ভরকেন্দ্র। দলটির কর্তৃত্ব এখন তারেকের মুঠোয় তা অস্বীকারের সুযোগ নেই।

আমরা জিয়াউর রহমানের বিএনপি দেখেছি। সেনাছাউনি থেকে যাত্রা শুরু হলেও একটি জনপ্রিয় রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছিল। তবে দলটির মধ্যে ক্যান্টনমেন্টের ছায়া আছে বলে সমালোচনা ছিল। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দীর্ঘ স্বৈরাচারবিরোধী লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে বিএনপি সেই ছায়া অপসারণ করেছে, গণতন্ত্রের লড়াইয়ে আপসহীন শক্তি হিসেবে জনগণের ভালোবাসাও পেয়েছে। তাই বলা যায়, জিয়ার বিএনপির চেয়ে খালেদার বিএনপি গণতান্ত্রিক মর্যাদায় এগিয়ে। এখন 'তারেকের বিএনপি' সেই সম্মান ও শক্তি দুই হারিয়েছে।

বিএনপির এই ভগ্নদশার জন্য দায়ী ভুল রাজনীতি। বেশি দূরে যেতে চাই না। ২০১৪ সালের আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রতি ব্যাপক জনসমর্থন থাকার পর বিএনপি আন্দোলন গড়ে তুলতে পারল না। এমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রস্তাব অনুযায়ী নির্বাচনকালীন সরকারে যোগদান করে নির্বাচনে অংশগ্রহণই ছিল বিচক্ষণতার পরিচায়ক। বিএনপির বিবেচনায় আনা উচিত ছিল, আওয়ামী লীগের পক্ষে রাজপথের আন্দোলনে যে ভূমিকা রাখা সম্ভব, বিএনপির পক্ষে তা সম্ভব না। আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আদায়ের আন্দোলনে যে শক্তি সমাবেশ ঘটাতে পেরেছিল কিংবা ২০০৬-০৭ সালে সরকারকে যে বেকায়দায় ফেলতে পেরেছিল, ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচনের পর বিএনপি সে তুলনায় কোনো শক্তি সমাবেশ ঘটাতে পারল না কিংবা সে পথে হাঁটলও না। জামায়াতের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী যে সহিংস পথ নিল, তা বিএনপিকে জনবিচ্ছিন্ন করেছে। বিএনপি তখন বুঝতে পারেনি যে, জামায়াত অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ভণ্ডুল করতে চাইছে। এখনও বুঝতে চাইছে না, জামায়াতের সঙ্গে গাঁটছড়াই বিএনপির সর্বনাশের বড় কারণ। এ প্রসঙ্গে বলা যায়, ১৯৭৫ সালের বাস্তবতায় জিয়াউর রহমানের 'রাজাকার মুক্তিযোদ্ধা ভাই ভাই' তত্ত্ব দিয়ে জিয়া রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে পেরেছিলেন। কিন্তু ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৯১ সালে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আন্দোলন, ২০১৩ সালে শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চ গঠনের মধ্য দিয়ে রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন ঘটেছে। নতুন প্রজন্মের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার জাগরণ ঘটেছে। যে চেতনায় 'রাজাকার মুক্তিযোদ্ধা ভাই ভাই তত্ত্ব' ভেস্তে গেছে; এখন আর রাজাকারের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের এক ছাতার নিচে থাকার সুযোগ নেই। সব দলের জন্যই সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়, কে কোন পথে হাঁটবে। একই সঙ্গে পাকিস্তানের পথে ও একাত্তরের পথে চলার সুযোগ নেই। এই দুই ধারার সমন্বয় করতে গিয়ে বিএনপি একদিকে মুক্তিযোদ্ধা-জনগণের সমর্থন হারিয়েছে; অন্যদিকে জামায়াতকেও তুষ্ট রাখতে পারেনি। বলা বাহুল্য, যখন জামায়াতের একাংশ একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের দায় বইতে চাইছে না, এমন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিএনপি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রশ্নে স্পষ্ট অবস্থান নিতে পারল না। বিএনপির এই শ্যাম রাখি, না কুল রাখি অবস্থা ২০ দল ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নিয়েও। মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ গণফোরাম, জেএসডি, নাগরিক ঐক্য ও কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সঙ্গে ঐক্য করে বিএনপির গা-ঝাড়া দিয়ে দাঁড়ানোর সুবর্ণ সুযোগ ছিল। কিন্ত একই সঙ্গে ২০ দল ও ঐক্যফ্রন্ট টিকিয়ে রাখতে সংকটে পড়েছে। দুই জোটই নাখোশ হয়েছে।

বিএনপির জন্য বড় সমস্যা হচ্ছে, দলটি জনমুখী রাজনীতি করতে পারছে না। কেবল দলীয় ইস্যুতে আওয়াজ তুলছে। জনজীবনের সমস্যা বা জাতীয় ইস্যুতে আন্দোলন গড়ে তোলার কোনো পদক্ষেপ নেয়নি, এখনও নিচ্ছে না। আমরা যদি পেছনে তাকাই দেখব নবম সংসদে বিএনপির সামনে অধিক আসন পাওয়া, খালেদা জিয়ার ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি রক্ষা, নেতাকর্মীদের মামলা প্রত্যাহার ও মুক্তির দাবিতে যতখানি সোচ্চার থেকেছে, জনস্বার্থ বা জাতীয় ইস্যুতে তেমন সোচ্চার দেখা যায়নি। এর মানে এই নয় যে, তারা জাতীয় ইস্যুতে কথা বলেননি। আলবৎ বলেছেন। তবে জাতীয় ইস্যু বা জনস্বার্থে আন্দোলন গড়ার কোনো চেষ্টা ও আন্তরিকতা দেখিনি।

এ প্রসঙ্গে ১৯৬৭-৬৮ সালের কথা বলা যায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বন্দি। আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের প্রায় সবাইকে জেলে পুরা হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ কেবল আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার ও শেখ মুজিবসহ রাজবন্দিদের মুক্তির দাবিতে আন্দোলনের সিদ্ধান্ত নেয়নি। দলটি ডেমোক্রেটিক অ্যাকশন কমিটিতে (ডাক) শরিক হয়ে অন্যান্য গণতান্ত্রিক দাবি-দাওয়ার সঙ্গে আগরতলা মামলা প্রত্যাহার ও শেখ মুজিবের মুক্তির দাবিকে সামনে এনেছে। অপরদিকে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফায় আর্থ-রাজনৈতিক দাবির মধ্যে আগরতলা মামলা প্রত্যাহার ও শেখ মুজিবসহ রাজবন্দিদের মুক্তিও অন্তর্ভুক্ত করিয়েছে। যে কারণে আগরতলা মামলা ও শেখ মুজিবের মুক্তি আর আওয়ামী লীগ বা ছাত্রলীগের দাবি থাকেনি জনদাবিতে পরিণত হয়েছিল। বিএনপি অতীত ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিচ্ছে না। দলটি কেবল খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতেই স্লোগান দিচ্ছে। বিএনপির সাংসদরা শপথ নেওয়ার পর বলেছেন, তারা সংসদে যাচ্ছেন খালেদা জিয়ার মুক্তির কথা বলতে। এটি যেন সংসদীয় দলের একমাত্র দায়িত্ব।

এটি সত্য যে, ষাটের দশকের প্রেক্ষাপট ও আজকের প্রেক্ষাপট এক নয়। তবে সেদিনের কৌশল আজও কার্যকর হতে পারে তা নিয়ে বিতর্কের সুযোগ নেই।

বিএনপি সংকট উত্তরণে কী করবে, জানি না। এও বলতে পারি না বিএনপি আবার গা-ঝাড়া দিয়ে উঠবে কি-না। কিন্তু প্রশ্ন, সংকটটি কি কেবল বিএনপিরই? আমার মনে হয়, বিএনপির সংকট দেশের রাজনৈতিক সংকটকেই স্পর্শ করেছে।

আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুটি জনভিত্তিসম্পন্ন রাজনৈতিক দল। এই দুটি দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অবস্থানের মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে যে ভারসাম্য ছিল, বিএনপি বিধ্বস্ত হয়ে পড়লে রাজনীতির এ ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আমাদের মনে রাখতে হবে, সংসদের ভেতরে ও বাইরে শক্তিশালী বিরোধী পক্ষ না থাকলে জবাবদিহি থাকে না, সরকার ও প্রশাসনে কর্তৃত্বপরায়ণ প্রবণতা বেড়ে যায়।

তবে কোনো কিছুই শূন্য থাকে না। কোনো না কোনোভাবে পূরণ হয়। এবার তর্কের খাতিরে ধরে নিই বিএনপি নেই। তাহলে সেই শূন্যতা কীভাবে দূর হবে? দেশে আর কোনো শক্তিশালী বিরোধী দল নেই। বামরা হীনবল হয়ে পড়েছে। বামদের একাংশ ও জাতীয় পার্টি কার্যত সরকারের সঙ্গেই আছে। এর বাইরে ধর্মভিত্তিক দল জামায়াত ও হেফাজত। প্রতিকূলতার মাঝেও জামায়াত টিকে আছে। হেফাজত সরকারের ভেতরে ও বাইরে অবস্থান করছে। জামায়াত ও হেফাজতের মধ্যে দ্বন্দ্ব আছে। তা সত্ত্বেও তারা একই পথের পথিক। তাই মধ্যপন্থার দল বিএনপি অস্তিত্বের সংকটে পড়লে জামায়াত-হেফাজত বা উগ্রপন্থার রাজনীতির ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।

এ প্রসঙ্গে বলতে হয়, বিএনপি জামায়াতের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে; কিন্তু জামায়াত নয়। এ দলের নেতারা শহীদ মিনার ও জাতীয় স্মৃতিসৌধে যান, ফুল দেন, পহেলা বৈশাখ পালন করেন, রবীন্দ্রসঙ্গীতও শোনেন। চিন্তা-চেতনায় বিএনপি জামায়াত-হেফাজতের চেয়ে অগ্রসর। তাই উগ্রপন্থা ঠেকাতে, গণতন্ত্রকে এগিয়ে নিতে বিএনপিসহ বিরোধীদের জন্য রাজনীতি নির্বিঘ্ন করতে হবে, স্পেস দিতে হবে এর কোনো বিকল্প নেই।


লেখক: সাংবাদিক
ask_bangla71@yahoo.com