অতঃপর... আমি, আপনি অথবা অন্য কেউ

 প্রকাশ : ২৮ জুন ২০১৯      

সুমন্ত আসলাম

চমকে উঠলাম এবং থমকে গেলাম। কেউ একজন হেসে উঠল আশপাশে, আড়ালে কিংবা খুব কাছে।

কিন্তু চিনতে পারলাম না তাকে।

হেসে উঠল সে আবার।

এবারও না।

ঠিক তখনই মনে পড়ল- তেল, দুধ, মসলাসহ আট ধরনের ভোগ্যপণ্যের যে ৭১টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষাগারে, তার ৬৯টিই মানোত্তীর্ণ হতে পারেনি। পণ্যগুলোর বেশ কয়েকটিতে অ্যান্টিবায়োটিক ও ক্ষতিকর রাসায়নিক পাওয়া গেছে, যা দীর্ঘ মেয়াদে নানা ধরনের জটিল রোগের কারণ হতে পারে। সকালে তেলে ভাজা পরোটা খাওয়ার পর এক কাপ

দুধ চা খেয়েছি। একটু পর বাজার থেকে কেনা এক গ্লাস ফ্রুট ড্রিংকস। মাশাআল্লাহ, এগুলোর মধ্যেই ভেজাল সবচেয়ে বেশি। এবং আমাদের দেশের অধিকাংশ মোটামুটি সামর্থ্যবান মানুষ এভাবেই সকালের নাশতা সারেন।

এবং অলরেডি অনেকেই নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হয়েছি। না হলে এত সব ভুলে যাই কীভাবে! কীভাবে তারপরও মাছ দিয়ে ভাত খাই আর হিন্দি সিরিয়াল দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়ি!

এই ভুলে যাওয়া রোগ থেকে বাঁচার জন্য যে ওষুধ খাব, তাতেও নিস্কৃতি নেই। কারণ, ৯৩ শতাংশ ফার্মেসিতে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রি হয় দেশে! মারহাবা মারহাবা!

নরসিংদীর বড় বড় লটকন গাছ পেরিয়ে একটু এগোলেই বীরপুরের বর্মণপাড়া। ওখানে ফুলন রানী বর্মণ থাকতেন। তার বয়স ২২।

কেক কিনে বাড়ি ফিরছিলেন ফুলন। রাত। অন্ধকারে দুটো মানুষ গতিরোধ করে তার, মুখে রুমাল চেপে ধরে তারপর। মাথার পেছনে আর পিঠে কেরোসিন ঢেলে শরীরে দেয় আগুন। পুড়ে যায় ২১ শতাংশ। ১৩ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে মারা যান তিনি। তার আগে বাবা যোগেন্দ্র বর্মণকে বলে গেছেন, 'আমি মরে গেলে আমাকে পুড়িও না, মাটি দিও।' আগুনের নির্মম আঁচে দগ্ধ ফুলন চাননি, মৃত্যুর পরও তার দেহ আর কোনো আঁচ পাক। এ যে বড় কঠিন, বড় বেদনার, অসহনীয়।

নুসরাতকে আস্তে আস্তে ভুলে যাচ্ছি আমরা। ভুলে যাব ফুলনকেও। তারপর আরও একজন পাপিয়া, আরও একজন দিপাদ্রী কিংবা আরও একজন সালেহা পুড়ে পুড়ে পার করবে তার সাধের জীবন।

আর নদীতে ফেলে দিতে চেয়েছিল ময়মনসিংহের নান্দাইলের রূপাকেও (ছদ্মনাম)। তার আগে প্রেমিক শামীমসহ চার তরুণ ধর্ষণ করে তাকে। শেষে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে হাত-পা-মুখ বাঁধে তার। নদীতে ফেলে দেওয়ার আগে কোনোরকমে চিৎকার করে ওঠে সে। স্থানীয় কিছু মানুষ উদ্ধার করে তখন তাকে।

শাহিনুর আক্তার তানিয়াকেও যে ভুলে গেছি আমরা! বাসের ভেতর তার শ্নীলতাহানি করে ফেলে দিয়েছিল যাকে রাস্তায়। ভুলে যাব রূপাকেও। তারপর কোনো এক শেফালী, মারুফা কিংবা জয়িতাকেও।

ফেসবুকে স্ত্রীর নামে আপত্তিকর মন্তব্যের প্রতিবাদ করেন বরগুনার রিফাত। সেই স্ত্রীর সামনে প্রকাশ্যে ধারালো অস্ত্র দিয়ে উপর্যুপরি কোপাল দুই যুবক। রক্তে ভিজে মারা গেলেন তিনি অবলীলায়।

ঠিক তখনই মনে পড়ল বিশ্বজিতের কথা, মনে পড়ল একটু আগের সেই হাসির কথাও। যে বিশ্বজিৎকে কুপিয়ে মারা হয়েছিল পুরান ঢাকায়। খুনিরা সব ধরা পড়েনি। ভুলে গেছি আমরা নির্দি্বধায়। তারই ধারাবাহিক খণ্ড নাটক মঞ্চস্থ হলো গত পরশু- রিফাত, ডেড অন দ্য স্পট।

জার্মান ধর্মতত্ত্ববিদ মার্টিন নাইমোলার একটি লেখা লিখেছেন :

'প্রথমে সমাজতন্ত্রীদের ধরতে এসেছিল তারা,

আমি কোনো প্রতিবাদ করিনি-

কারণ আমি সমাজতন্ত্রী নই।

তারপর তারা ট্রেড ইউনিয়নিস্টদের ধরতে এলো, এবং

আমি প্রতিবাদ করিনি-

কারণ আমি ট্রেড ইউনিয়নিস্ট নই।

তারপর তারা ইহুদিদের ধরতে এলো, এবং

আমি প্রতিবাদ করিনি-

কারণ আমি ইহুদি নই।

তারপর তারা ধরতে এলো আমাকে, এবং

তখন আমার পক্ষে বলার মতো কেউ ছিল না।'

তারপর?

তারপর কে?

আমি, আপনি, না অন্য কেউ?

যেই হোক, তবে সুষ্ঠু ও সঠিক বিচারের অভাব কিংবা প্রতিবাদহীনতায় এই বেড়ে ওঠা আমাদের মৃতদেহ ছুঁয়ে দেখারও কেউ থাকবে না। আফসোস তো দূরের কথা। সম্ভবত খাবে না কোনো কুকুর-শিয়ালও। কারণ, যত্রতত্র মানুষের লাশের মাংস খেতে খেতে অরুচি ধরে যাবে এদের। সর্ববুভুক্ষু পিঁপড়ের দলই তখন ভরসা- তারা আমার-আপনার চোখ খাবে, কলিজা খাবে, হূৎপিণ্ড খাবে। বাকিটুকু পোকা হয়ে হেঁটে বেড়াবে এখানে ওখানে!