চতুরঙ্গ

ডাক

 প্রকাশ : ০৪ জুন ২০১৯ | আপডেট : ০৪ জুন ২০১৯      

বুকের বাঁ পাশটা খালি হয়ে আছে এখনো। অথচ প্রায় সব করা হয়েছে এরই মধ্যে। স্রস্টার সৃষ্টি অথচ স্রস্টার করুণা থেকে বঞ্চিত, সামর্থ্যরাও ফাঁকি দেন প্রতিনিয়ত, মানুষ হয়েও যাদের নিত্য ফারাক মানুষে মানুষে, যথাসম্ভব তাদেরও কিছু দেওয়া হয়েছে। সংসারে যারা আছে, পূর্ণ করা হয়েছে তাদেরও। আত্মজার ৬টা জামা কিনে দেওয়ার পর আমি তাকে হেসে হেসে বলি, ‘তুমি কি জানো-মাত্র ২৫ টাকা দামের একটা জুতোর জন্য একটা কিশোর সারাদিন কেঁদেছিল।’

‘মাত্র ২৫ টাকার জুতো!’

‘ওই মাত্র মনে হওয়া টাকাটাই তখন অনেক ছিল, সেই তিন যুগ আগের কথা। জুতোটা না খয়েরি রঙের ছিল।’

আমার অতি বুদ্ধিমান আত্মজা সব বুঝে নেয় নিমিষে। আলতো জড়িয়ে ধরে আমাকে। মাথাটা আমার বুকে ঠেকিয়ে রাখে অনেকক্ষণ। আমি অনুচ্চারিত স্বরে বলি, ‘আমার মা, আমার মা...।’

ইচ্ছে করলেই বড় একটা গাড়ি নিয়ে যেতে পারি এখন। খেয়াল-খুশি মতো শরীর ছড়িয়ে বসতে পারি তাতে। আরো উচ্চ কিছু থাকলে, তাও। অথচ মহাখালীর বাসস্ট্যান্ডটা ছিল তখন তীর্থের মতো। থরে থরে ভীড়। মুড়ির টিনের মতো বাস। দীর্ঘ যাত্রা। বঙ্গবন্ধু ব্রিজ তখন হয় নাই। আট-নয় ঘণ্টা খোঁড়ার মতো দাপিয়ে ভুয়াপুরে এসে যখন বাসটা থামত, তখন নদী দেখতে পেতাম আমরা। পাড়ভাঙ্গা ঘোলাটে জলের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ। তাতে ফেনা তোলা স্রোত, ভেসে থাকা ছোট ছোট লঞ্চ, স্টিমার। তাতেও ভীড়। দু-তিনটা লঞ্চ ভরে ওপাশে চলে যাওয়ার পর চতুর্থ অথবা পঞ্চম লঞ্চে আমাদের পালা। এরই মধ্যে পেরিয়ে গেছে আরো এক ঘণ্টা। ছোট ছোট খুপরি হোটেলে তখন চিতই পিঠা আর কবুতরের মাংসের হাতছানি। কখনো দেশি মাছের সঙ্গে ধোঁয়া ওঠা নিটোল সাদা ভাত। চরের মাঝে জন্মানো অতীব মিষ্টির পেঁপে। খাঁটি হলুদ রঙের, কেটে প্লেটে সাজানো। কেবল মুখে তুলে দেওয়া। ব্যাস, আপনা আপনি পেটে যাত্রা।

বুকের বুদবুদ আনন্দে ওইটুকু সময় বেশ ছোট্ট মনে হতো আমাদের।

ভুয়াপুর থেকে সিরাজগঞ্জ, মাত্র এক ঘণ্টার লঞ্চ যাত্রা। কিন্তু মাঝে মাঝে চরের প্রবল আধিক্যে সাপের মতো বেঁকে গেছে নদী, এক সময়ের স্রোতস্বিনী যমুনা। তা বেয়ে অন্তত দু ঘণ্টা। লঞ্চে উঠলেই আকাশটাকে বিশাল ছাদ মনে হতো, আর নদীকে মনে হতো বিছানা। আহারে, ওই শীতল পানিতে যদি একবার গা ছোঁয়াতে পারতাম। ভুটভুট শব্দ, এবং তা ছাপিয়ে অন্ধ সিরাজের সুমিষ্ট কণ্ঠ-ও মন, রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ। আসন্ন ঈদ বলেই সিরাজের মুখে এই সুর। অন্য সময় হলে-বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না আমায় কথা দিয়েছে কিংবা এই বৃষ্টি ভেজা রাতে চলে যেও না, কখনো কখনো ডাক দিয়াছে দয়াল আমারে...।

খুচরো টাকায় হাত ভরে যেত সিরাজের। ঈদের আনন্দ, নদীর মাঝ থেকেই বাড়ির পেয়ারা গাছের সুবাস, চোখের মাঝে অপেক্ষায় থাকা কোনো মুখের ছায়া কিংবা অন্ধ সিরাজের অন্ধত্ব অথবা গান, ভরিয়ে দিত ওর হাত। একদিন ওর কাঁধে হাত রেখে বলি, ‘সিরাজ, বিয়ে করবি না।’ নিয়মিত যাতায়াত করা এই আমার হাতটা চেপে ধরে ও প্রফুল্ল হাসিতে। লাজুক চেহারায় বলে, ‘মা তো কয়। কিন্তু আমার মতো আন্ধারে বিয়া কইরব কেডা! শরম লাগে।’

সিরাজের সঙ্গে দেখা হয় না ব্রিজটা হয়ে যাওয়ার পর।

লঞ্চটা সিরাজগঞ্জ ঘাট ছোঁয়ার আগেই লঞ্চের কেউ একটা লম্বা মোটা দড়ি ছুড়ে দেয় সামনে। পল্টুনে থাকা আরেকজন সেটা বেধে ফেলে পল্টুনের সঙ্গে। তারপর কাঠের একটা পাটাতন। তাতে পা রেখে সাবধানে নিচে নামা। তার আগে কাঁধের ব্যাগটা শেষবারের মতো দেখে নেওয়া-সবকিছু ঠিক আছে তো!

রতনগঞ্জ কিংবা তেলকুপি গ্রামের মানুষদের অধিকাংশরা রিকশা চালান। ও দুটো আমাদের রহমতগঞ্জ গ্রামের পাশে। চিনে ফেলেন আমাকে কিংবা আমাদের। সেটা ব্যক্তিগত পরিচয় ছাড়িয়ে তালুকদার বাড়ির ছেলে বলে। এগিয়ে এসে যত্ন করে ব্যাগটা হাতে নেন। রিকশায় উঠি, টুকটাক কথা আর নানান প্রশ্ন করতে করতে এগিয়ে যাওয়া-এরশাদ ক্ষমতায় থাকব আর কয়দিন?

শহরের মাঝখানে এলেই একগাদা শৈশব এসে আছড়ে পড়ে চোখে, মনে, অস্তিত্বে। বাজারের টাকা চুরি করার পর একমাত্র যাত্রাস্থল মমতাজ কিংবা লক্ষ্মী সিনেমা হল। দেশের পিলারহীন একমাত্র ইলিয়ট ব্রিজ। দরগা রোডের দরগা পেরিয়ে ওই তো আমার স্কুল-জ্ঞানদায়িনী উচ্চ বিদ্যালয়। তার সামনে প্রথম যৌবনের বুকের স্পন্দন-হৈমবালা উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়। তা পেরিয়েই মহাপ্রভুর আখড়া। কতদিন দুপুরে ওখানকার বাতাসা আর নাড়–খেয়েছি। বাহিরগোলার ব্রিটিশ আমলের মসজিদটার দিকে তাকালেই লোভী হয়ে উঠত মন। সারা মসজিদে লাল-নীল মার্বেলের নকশা। স্কুলে যাওয়ার সময় কতদিন একটা হাতে পেতে চেয়েছি। তারপর চির শান্ত পানি বয়ে যাওয়া খাল। যে খালে আটাশির বন্যায় ডুবে মরে যেতে নিয়েছিলাম একবার।

অতঃপর রহমতগঞ্জ ১ নম্বর গলি। তালুকদার বাড়ি।

টিনের গেট পেরিয়ে বামে বড় ঘরটা। আরো একটু হেঁটে গিয়ে ডান পাশ। দু ঘর পেরিয়ে তৃতীয় ঘরের কাছে যেতেই মায়ের অক্লান্ত স্বর, ‘বাবা, আইছো?’ ব্যাগটা মেঝেতে রেখেই মায়ের পাশে বসি। দু হাঁটু নষ্ট হয়ে যাওয়া মা বহু কষ্টে উঠে বসে বিছানায়। হাত বাড়ায়। পাশে বসি তার। নীলচে রক্তনালীময় হাতটা বাম পাশের চোখে রাখে আমার। তারপর সেটা নামতে নামতে গাল চিবুক, ঠোঁট ছুঁইয়ে গলা। স্রষ্টার মতো সমস্ত ভালোবাসা দিয়ে স্থির হয় অবশেষে, ‘মুখটা এমন শুকনা লাগছে কেন বাপ!’

গত ছয় বছর ধরে এমন করে কেউ বলে না। ঈদের অনেক আগে থেকেই কেউ প্রতিদিন অন্তত তিনবার ফোন করে বলে না, ‘বাড়ি আসবা কবে বাবা?’

ওরকম একটা ডাক শোনার জন্য ঘুরে বেড়াই ফাঁকা ঢাকার রাস্তায়। জানি, কেউ কখনো-কোনোদিন এভাবে আর ডাকবে না।

তবুও।

তবুও ভাবি-কেউ যদি ডাকত! 

মাত্র একবার।

শুধু একবার।