বিশেষ লেখা

ঘোড়ার ডিম বুঝেছেন...

 প্রকাশ : ১২ জুন ২০১৯      

সুমন্ত আসলাম

বিল গেটস আপাতত কী বলতেন, তা জানতে পারছি না আমরা। জানতে পারছি না গোপাল ভাঁড়ের কথাও। কারণ, তিনি প্রয়াত। তবে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র একদিন তাকে বলেছিলেন, 'গোপাল, তোমাকে তো আড়ালে-আবডালে সবাই ভাঁড় বলে ডাকে।'

প্রফুল্ল হাসিতে গোপাল বললেন, 'আমি জানি, মহারাজ। অনেকে আমার কাছে-পিঠে-সামনেও বলে।'

'এতে তোমার মতামত কী?'

'খুবই সরল, মহারাজ।' গোপাল একটু সোজা হয়ে বসলেন চেয়ারে, 'যারা আমাকে ভাঁড় বলে ডাকে, প্রথমে তাদের মুখের দিকে তাকাই আমি। বোঝার চেষ্টা করি- তারা নিজেরাই কথাটা বলছে, না অন্য কেউ পেছন থেকে তাদের দিয়ে বলাচ্ছে।'

'ব্যাপারটা একটু খুলে বলবে গোপাল?'

'সব কথা খুলে বলতে হয় না, মহারাজ। কিছু বুঝে নিতে হয়।' গোপাল মুচকি হাসলেন এবার, 'আর যারা এটা বুঝতে পারে, তারা হচ্ছে সত্যিকারের বুদ্ধিমান, আসল বুদ্ধিমান।'

সিংহাসনের চার দেয়াল কাঁপিয়ে হেসে উঠলেন রাজা কৃষ্ণচন্দ্র, 'হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি বুঝতে পেরেছি, গোপাল; আমি বুঝতে পেরেছি।' গোপাল মনে মনে বললেন, 'আপনি ঘোড়ার ডিম বুঝেছেন, মহারাজ।'

পুরনো গল্প-২

সাধুবাবা বসে আছেন চোখ বুঁজে। তিন সেক্টরের তিন প্রধান বসে আছেন তার সামনে। তিনজনের একই কথা- দেশের যারা খারাপ মানুষ, তাদের বাছাই করতে হবে অতিদ্রুত।

'তথাস্তু।' ডান হাতটা সামান্য উঁচু করলেন সাধুবাবা।

শৃঙ্খলা রক্ষাকারীর বড় অফিসার

বললেন, 'কিন্তু কীভাবে, বাবা?'

ঘরের কোনায় একটা টিয়া পাখির খাঁচা ঝোলানো আছে। সেখান থেকে পাখিটি চিৎকার করে উঠল- খিদা লাগছে, খাবার দে।

সাধুবাবার পাশে দাঁড়ানো সাগরেদটি জানালার পাশে গেলেন দ্রুত। একটা বাটিতে ভিজিয়ে রাখা ছোলা নিয়ে ওই খাঁচার ভেতরের ছোট পাত্রটাতে রাখলেন।

পাখিটি ওই ছোলা শেষ করে আবার ডেকে উঠল- খিদা লাগছে, খাবার দে।

সাধুবাবা এবার শৃঙ্খলা রক্ষাকারীর বড় অফিসারকে ইশারা করলেন। জানালার পাশে গেলেন অফিসার। ছোলা নিয়ে হাত উঁচু করে খাঁচার পাত্রে রাখলেন।

আরও দুবার এভাবে চিৎকার করে খাবার চাইল পাখিটি। সাধুবাবা শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বড় অফিসারের পাশে বসা নবনির্বাচিত জনপ্রতিনিধি এবং দুর্নীতিরোধ কমিটির পরিচালককে ইশারা করলেন এবার। তারা পর পর খাবার দিলেন পাখির খাঁচায়।

কিছুক্ষণ চুপচাপ।

স্থির হয়ে বসে আছেন সবাই। সাধুবাবাও স্থির। তিনজন কিছুটা ইতস্তত ভঙ্গিতে আবার একসঙ্গে বলে উঠলেন- বাবা, খারাপ মানুষ বাছাই করার উপায় বলে দিন এবার।

'এখনই?' সাধুবাবা জিজ্ঞেস করলেন।

'জি।' প্রচণ্ড আগ্রহ নিয়ে বললেন তিনজন।

সাধুবাবা চেহারা কঠিন করে বললেন, 'দেশের সব খারাপ মানুষ এখন থেকে খাটো হয়ে যাবে। তাদের যা উচ্চতা আছে, তা থেকে অন্তত দুই ফুট ছোট হয়ে যাবে তারা।'

'খুব ভালো, খুব ভালো।' তিনজনই প্রায় চিৎকার করে উঠলেন। সঙ্গে সঙ্গে পাখিটি আবার ডেকে উঠল- খিদা লাগছে, খাবার দে।

সাধুবাবা এবার তিনজনকেই ইশারা করলেন। শৃঙ্খলা রক্ষাকারী অফিসার, নবনির্বাচিত জনপ্রতিনিধি আর দুর্নীতি রোধ কমিটির পরিচালক জানালার পাশে গেলেন একসঙ্গে। ছোলা নিলেন। পাখির খাঁচায় দেওয়ার প্রস্তুতি নিলেন একজন একজন করে। শৃঙ্খলা রক্ষাকারী অফিসার পারলেন না। কারণ, খাটো হয়ে গেছেন তিনি। চেষ্টা করলেন বাকি দু'জনও। ছোট হয়ে গেছেন তারাও।

সাধুবাবা হাসলেন না। চোখ দুটো খুলে তিনজনকে দেখলেন একপলক। বুঁজে ফেললেন আবার।

একটা অনুরোধ

নারী নির্যাতনের অভিযোগে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার হয়েছেন পুলিশের উপমহাপরিচালক মিজানুর রহমান। তার অবৈধ সম্পদের তদন্ত শুরু করেছিল দুর্নীতি দমন কমিশন। এ সূত্রেই পরিচয় হয়েছিল দুদকের পরিচালক খন্দকার এনামুল বাসিরের সঙ্গে। বাসির নাকি ৪০ লাখ টাকা ঘুষ নিয়েছেন মিজানের কাছ থেকে, অভিযোগ করেছেন স্বয়ং মিজানুর রহমানই।

বাংলায় একটা প্রবাদ আছে- চোরে চোরে মাসতুতো ভাই। তবে ওপরের গল্প দুটো পড়ে এ উচ্চপদস্থ দু'জনের সঙ্গে কোনো কিছুই মিলিয়ে ফেলব না আমরা, কোনোভাবেই না।

কারণ?

কারণ, সব কথা খুলে বলতে হয় না। কিছু কথা বুঝে নিতে হয়। আর যারা বুঝতে পারেন সবকিছু, তারা হচ্ছেন সত্যিকারের বুদ্ধিমান, আসল বুদ্ধিমান। গোপাল ভাঁড় তো বলেই দিয়েছেন কথাটা। তবে আপনি কিন্তু রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের মতো হাসতে হাসতে ঘুণাক্ষরেও বলতে যাবেন না, 'হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি বুঝতে পেরেছি, আমি বুঝতে পেরেছি।' তাহলে আমি তখন মনে মনে নয়, স্পষ্ট করেই বলব, 'আপনি ঘোড়ার ডিম বুঝেছেন!'