যোগাযোগ সমস্যা ও চরের অর্থনীতি

 প্রকাশ : ১৭ জুলাই ২০১৯      

 আবু সিদ্দিক

বর্ষাকালের অতিরিক্ত ভাঙন প্রবণতা আর বালুর আধিক্যের পদ্মার চরগুলো কৃষিকাজের জন্য মোটেই উপযোগী নয়

দুধের কারবারী ফারুক হোসেনের কাছে বর্ষাকালটাই পরম আকাঙ্ক্ষার। কারণ বছরের এই সময়েই তার সুদিন। আয় রোজগার ভালো হয়। না, তবে দুধে পানি মিশিয়ে নয়। কারণ শুধুমাত্র বর্ষাতেই সে পারে বেশি কাজ করতে।

আপনি ধনীই হোন আর গরিবই হোন, বাড়ি থেকে বের হয়ে নিকটবর্তী শহরে যেতে হলে আপনাকে হাঁটতেই হবে প্রায় ১৫ কিলোমিটার। আর সময় খরচ করতে হবে কমপক্ষে তিন ঘণ্টা। কারণ আপনি থাকেন চর আশারিয়া দহতে। এর অবস্থান রাজশাহীর গোদাগারী উপজেলায়। আর সেই দীর্ঘ পথটিও আপনাকে পাড়ি দিতে হবে দুই দফায়। মাঝখানে পদ্মা নদীর দুটি প্রবাহ পেরিয়ে।

ফারুক সেই কাজটিই করেন প্রতিদিন, পুরো শুকনো মৌসুমে। আবার বর্ষা এলে সেই পথটিই হয়ে যায় তার আধাঘণ্টার নৌকা ভ্রমণ। যেহেতু শুকনো মৌসুমে দিনে ২০ লিটার দুধের পাত্রটি তাকে মাথায় বহন করতে হয়, আর বর্ষার দিনে তিনি অনায়াসে বহন করতে পারেন দুই থেকে তিনটি একই পরিমাণের দুধের চালান। স্বাভাবিকভাবেই বর্ষা এলেই বেড়ে যায় তার আয়।

২০ লিটার দুধের পাত্র নিয়ে ১৫ কিলোমিটার রাস্তা পেরোনার এই শ্রমসাধ্য কাজটি করতে ফারুক আসলেই বাধ্য। কারণ চর আশারিয়া দহর মানুষের জীবিকার একটি অন্যতম মাধ্যমই হলো পশু পালন আর দুধ বিক্রি।

'এটা আসলেই খুব কষ্টের, কিন্তু এ ছাড়া আমার আর কোনো উপায়ই নেই। খরার দিনগুলোতে প্রতি লিটার দুধ ২০ টাকা দরে কিনে আমি বিক্রি করি ৩০ টা দরে। এই দিয়েই আমার ৫ সদস্যের পরিবারের খরচ যোগান হয়। তবে বর্ষার দিনে যাতায়াতের সুবিধা হলেও লিটারে লাভ থাকে একটু কম। কারণ সে সময় অনেক সময় চাষীরা নিজেই শহরের দুধের আড়তে (চিলিং পয়েন্ট) গিয়ে বিক্রি করে। তবে বেশি পরিমাণে বিক্রি করে সেটা পুষিয়ে যায়, ভালোভাবেই', বলছিলেন ফারুক।

একইভাবে দুধের উৎপাদকরা শুকনো মৌসুমে থাকেন বিপাকে। যেহেতু অনেক কষ্ট করে ঘোষালরা (দুধের ব্যবসায়ী) দুধ বহন করে নিয়ে য়ায়, এ সময় দুধের দামও থাকে অনকে কম। উৎপাদক শাহিনুর আলম বলছিলেন, 'মাথায় করে দুধ বহন করে শহরে নিয়ে যাওয়া আসলেই অনেক কষ্টের। এ কারণে আমার মতো উৎপাদকদেরও কম দামে দুধ বিক্রি করতে হয়। যদিও যোগাযোগের ব্যবস্থাটা ভালো হতো, তাহলে আমাদের এই ক্ষতিটা হতো না।'

গত শতকের সত্তরের দশকে রাজশাহীর উজানে ভারত সরকার গড়ে তোলে ফারাক্কা ব্যারেজ, কলকাতা পোর্টের প্রয়োজনে। আর তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে ভাটির বাংলাদেশে। আর একটি প্রভাব হলো পদ্মার প্রবাহ ভেঙে চর আশারিয়া দহের জন্ম। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা বলছিলেন, 'গড়ে প্রতিদিন এই ইউনিয়ন থেকে দুধের উৎপাদন হয় কমবেশি ৩ হাজার লিটার। কিন্তু শুকনো মৌসুমের এই হাঁটা পথ আর বেড়ে যাওয়া দূরত্ব নায্য দাম প্রাপ্তিতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।'

সমস্যার শেষ এখানেই নয়। ৪৪ বছর বয়সী এই জনপ্রতিনিধি জানান, বর্ষা মৌসুমের প্রবল নদী ভাঙন ফি বছর আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে চরের বিস্তৃতি, আর একই সঙ্গে খরার দিনের যোগাযোগের সময়সীমা।

প্রশ্ন আসতেই পারে, তাহলে এই চরের মানুষেরা গবাদিপশু পালন না করে কৃষি কাজে মনোনিবেশ করছে না কেন? এ প্রসঙ্গে পানি বিশেষজ্ঞ প্রফেসর আইনুন নিশাত বলেন, পদ্মার এই চরগুলো কৃষিকাজের জন্য মোটেই উপযোগী নয়, কারণ বর্ষাকালের অতিরিক্ত ভাঙন প্রবণতা আর বালুর আধিক্যের জন্য। স্বাভাবিক কারণেই এখানকার চরগুলোতে গড়ে উঠেছে দুধ উৎপাদনের মতো বিকল্প জীবিকা।

স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, শুকনো মৌসুমের এই সংকটের কারণে অনেকই এখন চেষ্টা করছেন জীবিকার বিকল্প উপায় খুঁজতে। এমনকি অনেকই শহুরমুখী হচ্ছেন দিনমজুর হিসেবে কাজ করে জীবনকে টেনে নিতে।


লেখক: গবেষক