চরের সাথে চাই বাজারের সংযোগ

 প্রকাশ : ৩০ জুলাই ২০১৯ | আপডেট : ৩০ জুলাই ২০১৯      

 আবু সিদ্দিক

চরের উৎপাদকরা প্রায়ই বঞ্চিত হচ্ছে উৎপাদিত পণ্যের সঠিক দাম থেকে। এমনকি তারা বাধ্য হচ্ছে কমদামে তাদের পণ্য বিক্রি করতে-সংগৃহীত ছবি

নদ-নদী বেষ্টিত বাংলাদেশের একটি বড় অংশ চরভূমি হিসেবে পরিচিত। মূলভূমির সাথে যুক্ত চর, দ্বীপচর, উপকূলীয় চর, অস্থায়ী চর-সব মিলিয়ে এসব চরে প্রায় ১ কোটি মানুষ বসবাস করেন। বাংলাদেশের মোট ভূমির প্রায় ১০ শতাংশ চরভূমি। দেশের প্রায় ৩২টি জেলার শতাধিক উপজেলার অংশবিশেষ জুড়ে বিস্তৃত এই চরাঞ্চল।

চরের মানুষের জীবকিা আর অন্যান্য সংকট নিরসনে দীর্ঘদিন থেকেই কাজ করে আসছে বিভিন্ন সরকারি আর বেসরকারি কার্যক্রম। এর মধ্যে যেমন রয়েছে চর লাইভলিহুডের মতো উন্নয়ন সহযোগীদের কার্যক্রম, তেমনি রয়েছে সরকারের বিশাল কর্মযজ্ঞ। তার মধ্যে একটি হলো চরের কুষি আর গবাদি পশুর উন্নয়নে সরকারি কার্যক্রম। আর গত কয়েক বছর ধরে জাতীয় বাজেটে চরের উন্নয়নের জন্য শত কোটি টাকার বরাদ্দও তার একটি অন্যমত একটি।

বিভিন্ন পর্যায়ের এসব কার্যক্রমের জন্য চরের কৃষি আর জীবিকা চেহারা পাল্টেছে অনকেটাই, তবে সেটা উন্নয়নের ধরনে। যেমন যেখানে একসময় বছরের বেশির ভাগ জমি পতিত পড়ে থাকতো, সেখানে এখন চলছে বর্ষার পুরো সময়টি ছাড়া বছরব্যাপী সবজির আবাদ। স্বাভাবিকভাবেই ফসলের উৎপাদনের দিক দিয়ে চরের মানুষের উন্নয়ন হয়েছে অনকেটাই। তবে যেটা হয়নি তা হলো এসব উৎপাদিত পণ্যের সাথে বাজারের সঠিক সংযোগ। এ কারণেই চরের উৎপাদকরা প্রায়ই বঞ্চিত হচ্ছে উৎপাদিত পণ্যের সঠিক দাম থেকে। এমনকি তারা বাধ্য হচ্ছে কমদামে তাদের পণ্য বিক্রি করতে।

তীব্র নদী ভাঙ্গন, বন্যা ও খরাসহ বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করে চরের মানুষকে বেঁচে থাকতে হয়। প্রতি বছর গড়ে ৫০ হাজার মানুষ নদী ভাঙ্গনের শিকার হয়ে গৃহহীন হয়ে পড়ে। ভৌগলিক অবস্থান বাংলাদেশকে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ ঝুঁকির দেশে পরিণত করেছে। নদী-বিধৌত এ দেশের চরাঞ্চলে বসবাসরত জনগোষ্ঠী এই দুর্যোগের প্রথম ও প্রধান শিকার। চরের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে একটি জাতীয় প্লাটফর্ম হলো ন্যাশনাল চর অ্যালায়েন্স। গত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে সমমনা উন্নয়ন সহযোগী, আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ের উন্নয়ন সংগঠন, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, গবেষক, সাংবাদিক, উদ্যোক্তা, নারী ও কৃষক সংগঠনের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত এই জোট চরাঞ্চলের মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে।

চরের মানুষের উন্নয়নে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহারে দেশের অধিকার বঞ্চিত চরবাসীর উন্নয়নে সঠিক দিক নির্দেশনা থাকা প্রয়োজন। তাই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ন্যাশনাল চর অ্যালায়েন্স নিচের বিষয়গুলো প্রতিটি রাজনৈতিক দলের ইশতেহারে সংযোজনের জন্য দাবি জানায়। তার মধ্যে অন্যতম একটি হলো-চরের মানুষের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে জাতীয় পর্যায়ে একটি চর ফাউন্ডেশন/বোর্ড গঠন করা যা চরের মানুষের উন্নয়ন ও চরের দুর্যোগ মোকাবিলায় বিশেষ কর্তৃপক্ষ হিসেবে কাজ করবে। এ রকম একটি কর্তৃপক্ষ না থাকায় প্রতি বছর চরের উন্নয়নের জন্য  জাতীয় বাজেটে যে বরাদ্দ থাকে তা ব্যয় হয় না।

চরের মানুষের দারিদ্র বিমোচন ও টেকসই উন্নয়ন ও শিক্ষা সেবা নিশ্চিত, খাদ্য ও পুষ্টি চাহিদা পূরণ, কর্মসংস্থান তৈরি, দক্ষ জনসম্পদ তৈরি, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, দুর্যোগ মোকাবিলা-এ সব লক্ষ্য পূরণে এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট প্রকল্প গ্রহণ করা হয়নি। এসডিজি লক্ষ্যসমূহ পূরণে এ সব খাতে সুনির্দিষ্ট প্রকল্প গ্রহণ ও বা বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।

চরের মানুষের উন্নয়নে কোন জাতীয় নীতিমালা না থাকায় চরাঞ্চলে দারিদ্র বিমোচন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি পরিচালনা, দুর্যোগ মোকাবিলা, শিক্ষা সেবা নিশ্চিতকরণ, নারী ও শিশু অধিকার রক্ষা, ভূমির ব্যবহার, কৃষি উন্নয়ন, ফসল বিপণন, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিসহ চর জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে রাষ্ট্রের সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গিও প্রতিফলন দেখা যায় না। তাই 'জাতীয় চর নীতিমালা' প্রণয়নের মাধ্যমে চরের মানুষের সামগ্রিক উন্নয়নকে এগিয়ে নিতে হবে।


লেখক: গবেষক