অধ্যাপক মোজাফ্ফর: রাজনীতির অহংকার, প্রজন্মের শেষ প্রদীপ

 প্রকাশ : ২৬ আগস্ট ২০১৯      

 সৈয়দ আনাস পাশা

অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ

চলে গেলেন অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ। পরিণত বয়সে হলেও তার এই চলে যাওয়া একটি শোকের আবহ তৈরি করেছে।

আজকের যুগের রাজনীতিতে অধ্যাপক মোজাফ্ফর বিশাল কোনো দলের নেতা ছিলেন না। এই প্রজন্ম তাকে কতটুকু চেনে এনিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। এরপরও তার মৃত্যুতে জাতীয়ভাবে একটি শোকের আবহ তৈরি হয়; এখানেই অধ্যাপক মোজাফ্ফর বিশ্লেষণযোগ্য একটি চরিত্র। মুজিবনগর সরকারের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের শীর্ষ নেতৃত্বের সর্বশেষ জীবিত সদস্য ছিলেন ২৩ আগস্ট সকাল পর্যন্ত। তার মৃত্যুর মধ্যদিয়ে সমাপ্ত হলো ইতিহাসের এক অধ্যায়। বাংলাদেশ হারালো তার জন্মকালীন আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী শীর্ষ এক রাজনীতিককে। কথাটি যদি আরেকটু পরিষ্কার করে বলি, তাহলে বলতে হয়, ৪৭ পরবর্তী সময়ে বাংলা নামক ভূখণ্ডের রাজনীতিতে ‘অহঙ্কার প্রজন্ম’ হিসেবে ইতিহাস যাদের ঠাঁই দিয়েছে, তাদের একজন অধ্যাপক মোজাফ্ফর। 

অধ্যাপক মোজাফ্ফরকে বিশ্লেষণ করার স্পর্ধা আমার নেই। কিন্তু নতুন প্রজন্মের কাছে ‘রাজনীতির অহংকার’ এই নক্ষত্রের পরিচয় তুলে ধরার চেষ্টা না করাও অন্যায়।

আমি শুধু অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদের রাজনীতির শেষকাল দেখেছি। সুতরাং তাকে পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ করা আমার জন্য কঠিন। তবে ইতিহাসের অন্দরে ঢুঁ মারলেই এই ক্ষণজন্মা রাজনীতিককে অনেকটাই চেনা যায়।

মোজাফ্ফর আহমদ আমার দুই প্রজন্মের নেতা। মুক্তিযুদ্ধ পূর্ববর্তী সময়ে আমার বাবা সৈয়দ আহবাব আলী ছিলেন সুনামগঞ্জের ন্যাপ নেতা। মোজাফ্ফর আহমদের নির্দেশেই একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ সংঘটনে স্থানীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন তিনি। ভারতে শরণার্থী শিবিরে হাজারো বাঙালির মনোবল টিকিয়ে রাখতে কাজ করেছেন বিরামহীন। আমাদের বৃহত্তর পরিবারের প্রায় সবাই ছিলেন বাম রাজনীতির সমর্থক। কেউ কেউ সক্রিয় কর্মী। পারিবারিক এই রাজনৈতিক আবহে আমার বেড়ে ওঠা। রাজনীতি বোঝার বয়স হওয়ার পর থেকেই মোজাফ্ফর আহমদ আমাদেরও নেতা। মনে আছে, ১৯৮১ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে নিজ গ্রামের ভোট কেন্দ্রে মোজাফ্ফর আহমদ যখন গুটি কয়েক ভোট পান, তখন মন খারাপ করে বাড়িতে এলে আব্বা বলেছিলেন, হতাশ হয়ো না, সময়ের প্রয়োজনেই এই সমাজ বদলাবে। ১৯৮১ সালে কলেজে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই ন্যাপের ছাত্র সংগঠন ছাত্র সমিতি’র সঙ্গে যুক্ত হই। বন্ধু রুহুল কুদ্দুস বাবুলের নেতৃত্বে আমরা হাতে গোনা ক’জন সিলেটে ছাত্র সমিতি সংগঠনে মাঠে নামি। ৮২ সালে এমসি কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে সংগঠনের পক্ষ থেকে আমরা ক’জন অংশও নেই। যদিও ২৪ মার্চ হুসাইন মুহম্মদ এরশাদ ক্ষমতা দখল করায় ওই নির্বাচন আর হয়নি।

আশির দশকের শুরু থেকেই মোজাফ্ফর আহমদ আমাদের সেই কাঙ্খিত নেতা, যার নেতৃত্বে বাংলাদেশে একটি শোষণহীন সমাজের স্বপ্ন দেখা শুরু করি আমরা। ওই সময় তিনি সমাজতান্ত্রিক রাজনীতিতে নতুন কনসেপ্ট ‘ধর্মকর্ম সমাজতন্ত্র’ স্লোগান নিয়ে হাজির হন। তার এই কনসেপ্ট নিয়ে সতীর্থদের অনেকেই হয়ে উঠেন সমালোচনামুখর। তাদের মতে সমাজতন্ত্র আন্দোলনে ধর্মকে টেনে আনা অপরিণামদর্শী। মোজাফ্ফর আহমদের এই কনসেপ্ট নিয়ে বিরোধী ধর্মান্ধ ধর্মব্যবসায়ী শক্তির মধ্যেও সৃষ্টি হয় এই শঙ্কা যে, তাদের ধর্ম ব্যবসা মনে হয় হুমকির মুখে পড়লো। দেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্মকর্ম সমাজতন্ত্রের প্রচারণা করতে গিয়ে ধর্ম ব্যবসায়ী শক্তির বাধার মুখে পড়তে হয় মোজাফ্ফর আহমদকে। ১৯৮৪ বা ৮৫ সালে সিলেটেও ধর্মব্যবসায়ীদের হাতে আক্রান্ত হন মোজাফ্ফর আহমদ। যুদ্ধাপরাধের দায়ে বর্তমানে কারাগারে অন্তরীণ দেলোয়ার হোসেন সাঈদী ওই ঘটনার দুইদিন আগে সিলেট আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে তাফসিরের নামে মোজাফ্ফর আহমদের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিষোদগার করলে পরে রেজিষ্টারি মাঠে ন্যাপের জনসভায় ‘কমিউনিষ্টরা মসজিদ আক্রমণ করেছে’ গুজব ছড়িয়ে দিয়ে হামলা চালায় সাম্প্রদায়িক ধর্মব্যবসায়ী গোষ্ঠী। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তখন আওয়ামী লীগ, কমিউনিষ্ট পার্টি, ন্যাপ, জাসদসহ অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দলগুলোর অফিস জ্বালিয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা।

তরুণ বয়সে আমরা যখন রাজনীতির মাঠে, অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ তখন আমাদের স্বপ্ন সৃষ্টির কারিগর। শোষণহীন সমাজের স্বপ্নদ্রষ্টা এই কালজয়ী রাজনীতিক ছিলেন আমাদের অনুপ্রেরণা, আমাদের রাজনৈতিক শিক্ষক।

তীব্র রসবোধ সম্পন্ন এই রাজনীতিক সভা-সমাবেশে যখন কথা বলতেন, তখন তার প্রতিটি রসাত্মক কথাই প্রচণ্ডভাবে আঘাত করতো সমাজের অসঙ্গতিগুলোকে। নিজের স্বগোত্রীয়দের কটাক্ষ করে তিনি বলতেন, ‘কে বলেছে আমরা রাজনীতিকরা ত্যাগ করতে জানি না? অন্তত আর কিছু না হোক দল ও মল ত্যাগতো আমরা অহরহই করছি’।

দলের কর্মীদের প্রতি নিয়মিত পড়াশোনার ব্যাপক তাগিদ ছিল তার। পার্টির পত্রিকা ‘নতুন বাংলা’ পকেটের পয়সা দিয়ে কিনে নিয়মিত পড়ার নির্দেশ ছিল তার কর্মীদের প্রতি। নিজেও ‘খেদির মা’ নামে একটি কলাম লিখতেন ওই পত্রিকায় নিয়মিত। ওই কলামে দেশের শোষিত মানুষের কথা বলতেন, চিহ্নিত করে দেখিয়ে দিতেন সমাজের সব অসংগতি।

১৯৮৪ সালে ঢাকায় বাংলাদেশ ছাত্র সমিতির কেন্দ্রীয় সম্মেলন শেষে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের সঙ্গে লেখক ও সিলেট ছাত্র সমিতির নেতারা

নারায়ণগঞ্জের মদনপুর এলাকায় ‘সামাজিক বিজ্ঞান পরিষদ’ নামে গড়ে তুলেছিলেন পার্টির প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। আমরাও এই কেন্দ্রে প্রশিক্ষণ নিয়েছি, পেয়েছি দেশপ্রেমের শিক্ষা। কোন একটি স্থান উঁচু করতে হলে, অন্য স্থান থেকে মাটি তুলে এনে এই স্থানে যেমন ফেলতে হয়, ঠিক তেমনি সম্পদের পাহাড় গড়তে হলে গরিবদের শোষণ করে এই পাহাড় গড়তে হয়-এমন অনেক কিছুই শেখানো হতো আমাদের। সিলেটের সন্তান অধ্যক্ষ ইমদাদুর রহমান ছিলেন ‘সামাজিক বিজ্ঞান পরিষদ’ পরিচালক। ছাত্র সমিতির অনেক প্রতিনিধি সভাও অনুষ্ঠিত হতো ওই কেন্দ্রে।

আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ ছিলেন এক কিংবদন্তিতূল্য নাম। ‘অধ্যাপক মোজাফফর, মার্কা তার কুঁড়েঘর’। ‘কুঁড়েঘরের মোজাফফর’ নামে সারা দেশে ছিল তার ব্যতিক্রমী এক পরিচিতি। শোষণহীন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে তিনি লড়ে গেছেন আজীবন। ষাটের দশক থেকে শুরু করে স্বাধীনতা-পরবর্তী বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মূলধারার রাজনীতিতে তিন শীর্ষনেতার একজন ছিলেন অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, কমরেড মণি সিংহ ও অধ্যাপক মোজাফফর আহমদকে কেন্দ্র করেই তখন আবর্তিত হতো রাজনীতি।

আমার ছেলে মাহাথির পাশা যখন লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সের (এলএসই) ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়, তখন খুব মনে পড়েছে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের কথা। কারণ এলএসইর নাম শুনেছি তার কাছ থেকে।

৮৪ সালে ছাত্র সমিতির কেন্দ্রীয় সম্মেলনের ফাঁকে বন্ধু রুহুল কুদ্দুস বাবুলের নেতৃত্বে আমরা সিলেটের ক’জন তার সাথে দেখা করতে গেলে বলেছিলেন, ‘তুমরাইতো একেক জন ভবিষ্যতের নেতা। জ্ঞান আহরণ করতে থাকো, বিশ্ব রাজনীতি জানার চেষ্টা করো।’

ওই সময় তিনি বলেছিলেন, রাজনীতিতে তার নেতা লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্স-এর পলিটিক্যাল ইকোনমির প্রখ্যাত অধ্যাপক, ব্রিটিশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান, মার্কসবাদ ও সমাজতন্ত্রের সমর্থক  হ্যারল্ড লাস্কি। বলেছিলেন, এই মানুষটির জীবন থেকে তিনি এখনও শেখার চেষ্টা করেন।

খুব ইচ্ছে ছিল এলএসই ছাত্র সংসদ সাধারণ সম্পাদক আমার ছেলেকে আমার নেতা মোজাফফর আহমদের কাছে একবার নিয়ে যাবো। কিন্তু সেটি আর সম্ভব হয়নি।

মোজাফফর আহমদ আমাদের নেতা ছিলেন, কিন্তু রাজনৈতিক বিভিন্ন পরিবর্তনে দলে ভাঙন এলে তার সাথে আমরা অনেকেই থাকতে পারিনি। ‘ন্যাপের মূলমন্ত্র, ধর্মকর্ম সমাজতন্ত্র’- স্লোগানের মাঝে বন্ধুদের কেউ কেউ যখন বলতেন 'মোজাফফরের মূলমন্ত্র, ধর্মকর্ম সমাজতন্ত্র’ তখন কনফিউজ হতাম। আদর্শ রেখে ব্যক্তিকে সামনে আনা কি ঠিক। এমন কনফিউশনে পড়লেও মোজাফফর আহমদ যে শুধু ব্যক্তি নন, ভারতীয় উপমহাদেশে সমাজতান্ত্রিক প্রগতিশীল রাজনীতির একটি প্রতিষ্ঠান, এটি স্বীকার করতে কোন দ্বিধা কখনও ছিল না। প্রয়াত জননেতা পীর হবিবুর রহমানের মৃত্যুর পর লন্ডনে আয়োজিত শোকসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা ছিল মোজাফফর আহমদের। অবশ্য ভিসা সংগ্রহ করার পরও অসুস্থতাজনিত কারণে শেষ পর্যন্ত আসতে পারেননি। ওই সময় বেশ কয়েকবার ফোনে তার সাথে কথা হয়েছে। গাফ্ফার ভাইকে (প্রবীণ সাংবাদিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী) অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানোর কথা বলতে গিয়ে আমাকে বলেছিলেন, ‘লন্ডনে আছে আমার একজন ছাত্র, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, তাকে তোমরা আমন্ত্রণ জানিও।’

গাফ্ফার ভাই এখনও গভীর শ্রদ্ধা পোষণ করেন তার এই শিক্ষকের প্রতি।

বিলেত প্রবাসী হওয়ার পর নেতা অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের সাথে আর দেখা হয়নি। দেশে গেলেও সময়ের স্বল্পতায় দেখতে যেতে পারিনি প্রগতিশীল রাজনীতির মহিরুহ এই নেতাকে। আসছে ডিসেম্বরে দেশে গেলে একবার তাকে দেখে আসবো, এমন একটি ইচ্ছে ছিলো মনে। সে সুযোগ আর হলোনা।

স্যালুট ও বিনম্র শ্রদ্ধা মেহনতি মানুষের মুক্তি আন্দোলনের কিংবদন্তি এই নেতার প্রতি। 

যেখানেই থাকুন, ভালো থাকুন হে প্রিয় নেতা। ইতিহাসই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে নিয়ে যাবে আপনাকে।

লেখক: সাংবাদিক