উৎসবের সর্বজনীনতা

 প্রকাশ : ০৫ অক্টোবর ২০১৯      

 মযহারুল ইসলাম বাবলা

মযহারুল ইসলাম বাবলা

ষড়ঋতুর আমাদের ভূখণ্ডে শরৎ ঋতুকে শান্ত-স্নিগ্ধতার ঋতু হিসেবে বিবেচনা করা হয়। স্নিগ্ধ-শান্ত এই ঋতুতে নেই প্রকৃতির নিষ্ঠুরতার দাবদাহ, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বর্ষা, বর্ষণ, তীব্র শীত ইত্যাদি। নাতিশীতোষ্ণ ঋতু হিসেবে এই ঋতু সমধিক পরিচিত। নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা ভেসে ভেসে যায়। কাশবনে কাশফুলের সমারোহ এই ঋতুতেই ঘটে। শরৎকালেই বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় পার্বণ শারদীয় উৎসব। উৎসব আমেজ ভর করে সর্বত্র।

আমাদের সাহিত্যে পূজার ছুটিতে ঘরমুখী মানুষের নানা বর্ণনা রয়েছে। তেমনি রয়েছে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাঙ্গনের দীর্ঘ ছুটির কথাও। জীবিকার প্রয়োজনে যত্রতত্র থাকলেও পূজার ছুটিতে প্রত্যেকে স্ব স্ব পরিবারের কাছে ছুটে আসার যে চিরায়ত সংস্কৃতি ছিল সেটা এখনও আছে। তবে কমেছে। তারপরও বাঙালি মানসে শরৎ আসে উৎসবের বারতা নিয়ে।

কয়েক বছর আগে দুর্গাপূজায় ঢাকেশ্বরী মন্দিরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মন্দিরের মূল ফটকের পাশে টাঙানো বিশাল কাপড়ের ব্যানারে লেখা ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’ ব্যানারের লেখাটি পড়ে অভিভূত হয়েছিলাম। ভালো লেগেছিল কথাগুলো। চলার পথে লেখাটি আমাকে বেশ আপ্লুত করেছিল। প্রতিটি সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উৎসব রয়েছে।

ধর্মীয় উৎসবসমূহে ধর্মীয় আচার-আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে উৎসবের অংশটি অধিক এবং বৃহৎ পরিসরে পালিত হয়ে থাকে। উৎসবকে যদি অসাম্প্রদায়িক রূপ দেয়া যায়, সর্বজনীন করা যায়। তাহলে উৎসবকেন্দ্রিক সম্প্রীতির সহাবস্থানের ক্ষেত্রটি উন্মুক্ত হয়, সম্প্রসারিত হয়।

আমাদের ভূখণ্ডে হিন্দু-মুসলিমদের নিজ নিজ উৎসবসমূহে একে অপরকে নিমন্ত্রণ করার রেওয়াজ ছিল। ঈদে-পার্বণে হিন্দু বন্ধু-প্রতিবেশীদের নিমন্ত্রণ করা এবং পূজায় মুসলিম সম্প্রদায়ের বন্ধু-প্রতিবেশীদের আমন্ত্রণের রীতি-রেওয়াজ ছিল। কুটিল রাজনীতির কূটচালে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার অনুপ্রবেশে দুই সম্প্রদায়ের সম্পর্কেরও অবনতি ঘটে। বিশেষ করে ঘৃণিত দেশভাগের মর্মান্তিক ঘটনা প্রবাহের মুখে।

দেশভাগের সাম্প্রদায়িকতার জের আজও দুই সম্প্রদায়ের হৃদয়ে ভর করে রয়েছে। ব্রিটিশরা বিদায় নিলেও, ব্রিটিশের শঠতার কূটচাল-কারসাজির পরিসমাপ্তি ঘটেনি। দুঃখজনক হলেও সত্য সাম্প্রদায়িক বিভাজন ভ্রাতৃপ্রতিম দুই সম্প্রদায়কে একে-অপরের শত্রুতে পরিণত করার হীন রাজনীতি সমাজ ও রাষ্ট্রে এখনও বিরাজিত। রাষ্ট্র ও শাসকগোষ্ঠীর আনুকূল্যে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বাড়-বাড়ন্ত অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে বারবার ক্ষুণ্ন করে চলেছে। অথচ আমাদের দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষ অনিবার্যরূপে অসাম্প্রদায়িক।

আমাদের কৈশোরে দেখেছি পুরান ঢাকার বিভিন্ন হিন্দু সম্প্রদায়ের অধ্যুষিত এলাকায় বারোয়ারি পূজা হতে। জমিদার প্রথা উচ্ছেদের পর জমিদারদের বা বিত্তশালীদের ব্যক্তিগত উদ্যোগে ও আর্থিক বিনিয়োগে পূজার আয়োজন আর থাকেনি। দেশভাগে বিত্তবান হিন্দুরা ভারতে চলে যাওয়ার কারণেই ব্যক্তিগত পূজার আয়োজনের পরিসমাপ্তি ঘটেছিল।

হালে নতুন ঢাকার বনেদী এলাকায় অধিক অর্থ ব্যয়ে পূজার আয়োজন দেখা যায়। ঢাকেশ্বরী, তাঁতীবাজার, রামকৃষ্ণ মিশনসহ পুরান ঢাকাভিত্তিক পূজার আয়োজন-আনুষ্ঠানিকতাকে অতিক্রম করেছে গুলশান, বনানী, বারিধারা, উত্তরা, ধানমণ্ডিসহ আশপাশের এলাকার পূজাণ্ডপগুলো। এখনও চাঁদা তুলে বারোয়ারী পূজার আধিক্য রয়েছে এবং থাকবেও। তবে নতুন ঢাকার বিত্তবানদের অর্থানুকূল্যের পূজাণ্ডপের সাজসজ্জা, খাবার-দাবার, খ্যাতিবান গায়ক-গায়িকাদের উপস্থিতিতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের তোপে পুরান ঢাকার পূজা এখন ক্রমেই ম্রিয়মান হয়ে পড়েছে। এসবই বিদ্যমান বৈষম্যপূর্ণ ব্যবস্থারই অবিচ্ছেদ্য অংশ। শ্রেণি বৈষম্যপূর্ণ সমাজে উৎসবও ওই বৈষম্যের বৃত্ত অতিক্রম করতে পারছে না। অথচ উৎসব হচ্ছে সর্বজনীন। একথা বহুল প্রচলিত হলেও একটি শ্রেণি অসমতার রাষ্ট্র ও সমাজে তার প্রভাব থাকবে না, সেটা তো অসম্ভব।

জাতি সমস্যার সমাধান একাত্তরের যুদ্ধে সম্পন্ন হলেও, শ্রেণি সমস্যার সমাধান কিন্তু হয়নি। যদিও ওই মুক্তিযুদ্ধের মর্মবাণী ছিল গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতা। আমদের জাতীয়তাবাদী শাসকেরা তাদের শ্রেণি স্বার্থে মুক্তিযুদ্ধের ওই মৌলিক চেতনার বাস্তবায়ন করেনি।

একই হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উৎসব জাতিভেদে ভিন্নতর।বাঙালি হিন্দুদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা। মাড়োয়ারিসহ অপরাপর কয়েকটি জাতিসত্তার হিন্দুদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব কালীপূজা। মারাঠা রাজ্যের মারাঠিদের গণেশ পূজা। জাতিভেদে উৎসব-পার্বণের পার্থক্য ভারতবর্ষ জুড়ে রয়েছে। মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর। খ্রিস্টীয়দের বড় দিন এবং বৌদ্ধদের বুদ্ধ-পূর্ণিমা।

মুসলিম সম্প্রদায় নিজ ভূখণ্ডে চাঁদ দেখার ওপর ভিত্তি করে ধর্মীয় আচার-আনুষ্ঠানিকতার দিন-ক্ষণ নির্ধারণ করে থাকে। অথচ আমাদের দেশে সংখ্যায় নগণ্য হলেও বেশ কিছু অঞ্চলে সৌদি-আরবের অন্ধ-অনুকরণে সুদূর সৌদি-আরবের চাঁদ দেখার ওপর ভিত্তি করে রোজা-ঈদ পালন করে থাকে কতিপয় মানুষ। ধর্মীয় বিধানে নিজ নিজ ভূখণ্ডে চাঁদ দেখার ওপর ভিত্তি করে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের দিন-ক্ষণ নির্ধারণের বিষয়টি উপেক্ষা করে সৌদি-আরবের অন্ধ-অনুকরণে। রোজা-ঈদ ইত্যাদি পালন ধর্মীয় নির্দেশ বর্জিত যেমন তেমনি সামাজিক বিচ্ছিন্নতাও। সেটা সমাজ, দেশ, জাতি, এমনকি নিজ সম্প্রদায়ের সঙ্গেই চরম বিচ্ছিন্নতা। এটি তো সমর্থনযোগ্য হতে পারে না।

বেশ ক'বছর আগে ভারতের গুজরাট রাজ্যে ভ্রমণে গিয়েছিলাম। গুজরাটের মুসলিম দাবিদার ‘দাউদি বড়া’ সম্প্রদায়ের সাক্ষাৎ পেয়েছিলাম। তাদের কাছে জেনেছিলাম তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের কথা এবং অবাক ও বিস্মিত হয়েছিলাম সেসব শুনে। মুসলিম দাউদি বড়া সম্প্রদায় চাঁদ দেখার ওপর ভিত্তি করে কোনো ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করে না। তাদের নির্দিষ্ট ক্যালেন্ডার রয়েছে। ওই ক্যালেন্ডারের তারিখ অনুযায়ী তারা সমস্ত ধর্মীয় উৎসব-আনুষ্ঠানিকতা পালন করে থাকে। এমনকি তারা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের স্থলে তিন ওয়াক্ত ফরজ নামাজ আদায় করে। তাদের মসজিদের আজান শোনারও সৌভাগ্য হয়েছিল। 'আসসাদুআল্লাহ মুহাম্মাদুর রসূল উল্লাহ'র পরপরই আজানে বলা হয় ‘আসসাদুআল্লাহ মুহাম্মাদুর আলী উল্লাহ্’। তারা নিজেদের নির্ভেজাল মুসলিম হিসেবে দাবি করে। নামাজ, চাঁদ দেখা, আজান ইত্যাদি ক্ষেত্রে অমিলের প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করলে- উত্তরে বলেছিল, শিয়া, সুন্নি, কাদিয়ানী, আহম্মদিয়া, ওহাবি, দেওবন্দ, বারেলভি ব্যতীত চার মাযাবের চার মতবাদসহ মুসলিম ধর্মের অনুসারীদের অসংখ্য বিভক্তির কথা। সবাই সবারটিকেই শ্রেষ্ঠজ্ঞান করে। আমরা দাউদি বড়া সম্প্রদায় অন্যদের তুলনায় নিজেদেরকেই নির্ভেজাল মুসলিম রূপে গণ্য করি। এরপর আর কথা না বাড়িয়ে বিদায় নিয়েছিলাম।

আমাদের দেশে ঈদের নামাজ আদায়ের আড়ম্বর আয়োজন-আনুষ্ঠানিকতা সর্বাধিক। অতিরিক্ত জনসংখ্যা এবং অধিক মানুষের ঈদের নামাজ আদায়ের কারণে একই মসজিদ-ঈদগাতে পর্যায়ক্রমে দুই-তিন দফায় ঈদের নামাজ সম্পন্ন হয়ে থাকে। দেশের সকল অঞ্চলসমূহের মসজিদ-ঈদগার প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় দফার নামাজের সময়সূচি টিভি মিডিয়াগুলো পর্যন্ত নিয়মিত সম্প্রচার করে থাকে। ঈদের নামাজকে কেন্দ্র করে প্রচার-প্রচারণা আড়ম্বর আয়োজন-মাতামাতি সর্বাধিক। ঈদে দুই রাকাত ওয়াজিব নামাজ ব্যতীত ঈদের দিন আর কোনো ধর্মীয় আচার-আনুষ্ঠানিকতা নেই।

১৯৮১ সালে বাগদাদে ঈদ উদযাপন করেছিলাম। ঈদের নামাজে অংশ নিতে ফজরের আজানের আগে বাগদাদ উপকণ্ঠে অবস্থিত বড়পীর আব্দুল কাদের জিলানী (রঃ) (ইরাকিরা জিলানী বলে না, বলে গিলানী) মাজার কমপ্লেক্সের মসজিদে যেতে হয়েছিল। মসজিদে স্থানীয়দের তুলনায় প্রবাসী বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানের নাগরিকেরাই ছিল সর্বাধিক। ঈদের নামাজকে কেন্দ্র করে অতিরিক্ত আনুষ্ঠানিকতা ছিল না। ফজরের নামাজের পরপর ঈদুল ফিতরের দুই ওয়াক্ত ওয়াজেব নামাজ আদায় করেছিলাম। সালাম ফিরিয়েই নামাজ শেষ। মোনাজাত পর্যন্ত ছিল না। মোনাজাত প্রসঙ্গে অন্যদের জিজ্ঞেস করলে তারা বলেছিল- ঈদের নামাজে এখানে মোনাজাতের প্রচলন নেই। এমনকি ঈদের নামাজকে কেন্দ্র করে তেমন তোড়জোড়ও নেই। ফরজের অতিরিক্ত কোনো বিষয়কে সেখানে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। নামাজ শেষে প্রবাসীরা পরস্পর কোলাকুলি-সৌজন্যতা বিনিময় করে দীর্ঘ সময় ধরে। বন্ধু-আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাতে প্রবাসীদের মোক্ষম সুযোগ ঈদের দিনে বড় পীরের মাজার কমপ্লেক্সের মসজিদটি। কেউ উত্তরে-কেউ দক্ষিণে, পূর্বে-পশ্চিমের দূর-দূরান্তে কর্মরত থাকলেও এদিনে পরস্পর পূর্ব যোগাযোগের ভিত্তিতে দেখা-সাক্ষাৎ করার সুযোগটি কেউ হাতছাড়া করত না।

সকল ধর্মীয় উৎসব-পার্বণ ধর্মভিত্তিক হলেও-সামাজিক সম্প্রীতির পরিধি-ভিত্তিটাই প্রধান। ঈদে ধর্মীয় আবেদনের চেয়ে সামাজিক আবেদনটি অধিক বিস্তৃত। একে-অপরের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ, আত্মীয়-পরিজন, প্রতিবেশীদের বাড়িতে-বাড়িতে যাওয়া-আসা সমস্তই ঈদের সামাজিকতা। এই সামাজিকতাকে সম্প্রদায়ে সীমাবদ্ধ না করে সকল সম্প্রদায়ের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধকে জাগিয়ে তুলতে এবং সম্প্রীতি স্থাপনের চমৎকার সুযোগ রয়েছে। অতীতে তো ছিলই। বর্তমানে যে নেই তা-ও নয়। তবে সকল সম্প্রদায়ের উৎসবগুলোকে অসাম্প্রদায়িক উৎসবে পরিণত করা কিন্তু অসম্ভব নয়।

শুরুতে বলেছিলাম দুর্গাপূজায় টাঙানো ব্যানারের কথা। সেটা সকল সম্প্রদায় ধারণ করলে কেবল সাম্প্রদায়িকতা নির্মূল হবে না; সকল সম্প্রদায়ের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ-সম্প্রীতির শক্তিশালী সংহতি গড়ে উঠবে। সেটা কেবল গুরুত্বপূর্ণ এবং জরুরিও বটে। সকল ধর্মমতই অপরের ধর্মকে ঘৃণা-অবজ্ঞা করতে বলেনি। বলেছে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং সম্প্রীতির কথাও।

সকল উৎসব-পার্বণে দুটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক, উৎসব-পার্বণকে অসাম্প্রদায়িক করে তোলা। দুই, সমাজের অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করা। এই দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের নিষ্পত্তি হলেই ধর্মীয় এবং জাতীয় সকল উৎসব-পার্বণ সর্বজনীন হবে এবং পরিপূর্ণরূপে সকলের জন্য উৎসবের আনন্দ নিশ্চিত করতে পারবে। নয়তো উৎসব আসবে-যাবে, কেউ কেউ ভোগবাদিতায় ভাসবে আর সংখ্যাগরিষ্ঠরা চেয়ে চেয়ে কেবল দেখবে। উপভোগ করতে পারবে না। সেক্ষেত্রে উৎসব-পার্বণের আবেদনও পূর্ণতা পাবে না।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত