সাবমেরিন কেবল

কোম্পানি লাইসেন্স উন্মুক্ত হোক

 প্রকাশ : ০৮ অক্টোবর ২০১৯      

রাশেদ মেহেদী

বাংলাদেশে দিন দিন ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথের চাহিদা বাড়ছে। আগামী দিনে অতিরিক্ত ব্যান্ডউইথের চাহিদা মোকাবেলার প্রস্তুতি এখন থেকেই নেওয়া জরুরি। সেই প্রক্রিয়া শুরুও হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল কোম্পানি লিমিটেডকে (বিএসসিসিএল) তৃতীয় আরেকটি সাবমেরিন কেবল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে। কিন্তু সাবমেরিন কেবল নেটওয়ার্কে একটা মাত্র কোম্পানি কতটা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সক্ষম হবে, সে প্রশ্নটাও জরুরি। কারণ ভবিষ্যতে শুধু ব্যান্ডউইথ সরবরাহ বৃদ্ধি নিশ্চিত করলেই চলবে না; কোয়ালিটি অব সার্ভিস, স্মার্ট নেটওয়ার্কিং সুবিধার মতো বিষয়গুলোও সামনে চলে আসবে।

প্রতিবেশী ভারত, শ্রীলংকায় একাধিক বেসরকারি কোম্পানি সাবমেরিন কেবল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ব্যান্ডউইথ সেবা দিচ্ছে এবং সে কারণে তাদের সেবার গুণগত মান অনেক কম সময়ে উন্নততর হয়েছে। বাংলাদেশেও বেসরকারি খাতে সাবমেরিন কেবল নেটওয়ার্ক ব্যবসার লাইসেন্স দেওয়া হলে সেটা নিঃসন্দেহে নিকট ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সুচিন্তিত পদক্ষেপ হবে।

বর্তমানে বাংলাদেশে কমবেশি এক হাজার ৩০০ জিবিপিএস থেকে এক হাজার ৪০০ জিবিপিএস ইন্টারনেট ব্যবহার হচ্ছে ডাটার জন্য। এর বাইরে ভয়েস ট্রাফিকের জন্য পৃথকভাবে ইন্টারনেটের ব্যবহার রয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত সাবমেরিন কেবল কোম্পানি প্রায় ৯০০ জিবিপিএস ব্যান্ডউইথ সরবরাহ করছে। বাকিটা আসছে ছয়টি ইন্টারন্যাশনাল টেরেস্ট্রিয়াল কেবল (আইটিসি) থেকে। এই কোম্পানিগুলো ভারত থেকে ভূগর্ভস্থ কেবলের মাধ্যমে ব্যন্ডউইথ পরিবহন করছে। এটা সবাই জানেন, সাবমেরিন কেবল নেটওয়ার্ক থেকে পাওয়া ব্যান্ডউইথ এবং ভূগর্ভস্থ কেবল থেকে পাওয়া ব্যান্ডউইথের গুণগত মানের পার্থক্য অনেক। ফলে ভবিষ্যতের অনেক বেশি চাহিদা মোকাবেলার জন্য ভারত থেকে আমদানি করা 'আইটিসি'গুলোর সেবার ওপর নির্ভর করা মোটেও যুক্তিসঙ্গত নয়।

বাংলাদেশে বর্তমানে ডাটা ব্যবহার বৃদ্ধির গতি-প্রকৃতির দিকে খেয়াল রেখেই ভবিষ্যতের জন্য সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ২০১৭ সালেও বাংলাদেশে সার্বিকভাবে ব্যান্ডউইথ ব্যবহারের পরিমাণ ছিল ৪০০ জিবিপিএস। মাত্র দু'বছরের ব্যবধানে এই ব্যবহারের পরিমাণ এক হাজার ৩০০ থেকে এক হাজার ৪০০ জিবিপিএস ছুঁই ছুঁই করছে। এর কারণ ফোরজি সেবা চালু, জেলা-উপজেলা পর্যায়ে ব্রডব্যান্ড নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং ইন্টারনেটভিত্তিক বিভিন্ন সেবা চালু। সময়ের চাহিদায় বাংলাদেশে ফাইভজি, ওয়াইফাই-৬ প্রযুক্তির মতো আরও উন্নততর প্রযুক্তির ব্যবহার অবশ্যই শুরু হবে। সে ক্ষেত্রে ব্যান্ডউইথের চাহিদা আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে তিন হাজার জিবিপিএস অতিক্রম করলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

ব্যান্ডউইথের এই ক্রমবর্ধমান চাহিদার দিকে লক্ষ্য রেখেই বিএসসিসিএলকে তৃতীয় সাবমেরিন কেবলে যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর আগে রাষ্ট্রায়ত্ত এই কোম্পনি সি-মিই-উই-৪ ও সি-মিই-উই-৫ সাবমেরিন কেবল নেটওয়ার্কে যুক্ত হয়েছিল। এ দুটি নেটওয়ার্ক ব্যবহার করেই এখন পর্যন্ত বিএসসিসিএল ব্যান্ডউইথ সরবরাহ করে যাচ্ছে। দ্বিতীয় সাবমেরিন কেবল চালু হওয়ার পর গত দুই বছর পেরিয়ে এখন মোট চাহিদার অর্ধেকেরই বেশি বিএসসিসিএল সরবরাহ করছে। কিন্তু সেটাও বিএসসিসিএলের মোট সক্ষমতার চেয়ে অনেক কম। বিএসসিসিএলের দুটি সাবমেরিন কেবল কোম্পানির সক্ষমতা বর্তমানে দুই হাজার জিবিপিএর বেশি। কিন্তু এখন পর্যন্ত সরবরাহ করতে পারছে মাত্র ৯০০ জিবিপিএস। এটা সত্য, চাহিদা বাড়লে বিএসসিসিএল হয়তো সরবরাহের পরিমাণ বাড়াবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত আইটিসি কোম্পানিগুলো ৫০০ থেকে ৬০০ জিবিপিএস ব্যান্ডউইথের বাজার দখল করে রেখেছে। এখানেই প্রশ্ন ওঠে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে, ক্রমবর্ধমান চাহিদা ও গুণগত মান নির্ভরের ক্ষেত্রে এককভাবে বিএসসিসিএল কতটা নির্ভরযোগ্য? একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টা পরিস্কার হয়। ২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসে ভারতে ঝড়ের কারণে সাবমেরিন কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ফলে ভারত থেকে আমদানিনির্ভর ছয়টি আইটিসি কোম্পানির ব্যান্ডউইথ সরবরাহে বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়। সে সময় বিএসসিসিএল থেকে অতিরিক্ত ব্যান্ডউইথ নিয়ে দেশের আইএসপিগুলো সেবা চালু রাখার চেষ্টা করেও সফল হয়নি। গত দুই বছরে বিএসসিসিএলের ব্যান্ডউইথ সরবরাহের পরিমাণ বাড়লেও সেবার মানের উন্নতি কতটা হয়েছে, সে প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যায়।

আরও একটা বিষয় হচ্ছে, এখন ব্যান্ডউইথের যে মূল্য তা বিএসসিসিএল নিজেদের পছন্দ ও সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই নির্ধারণ করছে। যেহেতু আর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই, তাই প্রতিযোগিতামূলক মূল্য নির্ধারণেরও প্রয়োজন পড়ছে না। একই সঙ্গে প্রতিযোগিতা না থাকার কারণে সেবার গুণগত মান নিশ্চিত করার বিষয়টিও বিএসসিএলকে গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হচ্ছে না। আবার বিএসসিসিএল সি-মিই-উই-৪ এবং সি-মিই-উই-৫ কনসোর্টিয়ামের মাধ্যমে যে নেটওয়ার্কে যুক্ত হয়েছে, সে দুটি নেটওয়ার্কই শুধু সিঙ্গাপুর হয়ে মধ্যপ্রাচ্য দিয়ে ফ্রান্স পর্যন্ত বিস্তৃত। প্রায় ৭৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ করে যে সি-মিই-উই-৬ কনসোর্টিয়ামে যুক্ত হচ্ছে। এর গতিপথও সেই সিঙ্গাপুর, মধ্যপ্রাচ্য, ফ্রান্স। অতএব অনিবার্যভাবে আমাদের একটা নেটওয়ার্ক গতিপথের ওপরেই নির্ভর করতে হচ্ছে। কিন্তু হংকংয়ে তো আরও একটা বড় সাবমেরিন কেবল নেটওয়ার্ক হাব আছে। সেদিক দিয়ে কোনো নেটওয়ার্কে যুক্ত হওয়া গেলে এই 'কনটেন্ট' 'ক্লাউডিং'-এর ক্ষেত্রেও তুলনামূলক একটি মূল্য পাওয়া সম্ভব হতো। বিকল্প হাবের সঙ্গে যুক্ত না থাকার কারণে সিঙ্গাপুরের মূল্যটাই আমাদের বিনাবাক্যে মেনে নিতে হচ্ছে।

বেসরকারি খাতে সাবমেরিন কেবল নেটওয়ার্ক স্থাপনের লাইসেন্স দেওয়া হলে সেই নতুন দিগন্তটিই উন্মোচিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে। আন্তর্জাতিক বাজার এবং দেশের বাজারে ব্যান্ডউইথের প্রতিযোগিতামূলক মূল্য নিশ্চিত হবে। প্রতিযোগিতার কারণে সেবার গুণগত মানও বাড়বে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে এ খাতে নতুন বিদেশি বিনিয়োগ আসবে। বিএসসিসিএলের দ্বিতীয় সাবমেরিন কেবলে যুক্ত হওয়ার জন্য বিদেশি সংস্থা থেকে বড় অঙ্কের অর্থ ঋণ নিতে হয়েছিল। এখন বিএসসিসিএলকে তৃতীয় সাবমেরিন কেবলে যুক্ত করতেও সেই ঋণের প্রয়োজনই হয়তো আবার পড়বে। কিন্তু বেসরকারি খাতে লাইসেন্স দেওয়া হলে ঋণের বোঝা নয়, উল্টো বিদেশি বিনিয়োগ আসবে দেশে। এ বিষয়টি নীতিনির্ধারকদের গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনায় নেওয়া উচিত।

বেসরকারি লাইসেন্স দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও সেটা যেন ঢালাওভাবে না দেওয়া হয়। এর আগে ইন্টারন্যাশনাল গেটওয়ে, ইন্টার কানেকশন এক্সচেঞ্জ এবং ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ের লাইসেন্স যেভাবে গণ্ডা গণ্ডা প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছিল, তা যেন না হয়।

এর আগে বিএসসিসিএলের দ্বিতীয় সাবমেরিন কেবলের জন্য ঢাকা-কুয়াকাটা ট্রান্সমিশন লিংক স্থাপন নিয়ে অনিয়মের অভিযোগের বিষয়টি উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। আদালতের রায়েও অনিয়মের বিষয়টি প্রমাণিত। যদিও চূড়ান্ত রায়ে 'পাস্ট অ্যান্ড ক্লোজ' উল্লেখ করে লিংক স্থাপনের কাজ চালিয়ে যেতে বলা হয়েছে; কিন্তু অনিয়মের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যেখানে অনিয়ম হয়, সেখানেই গুণগত নিশ্চিত হয় না, এটাই সত্য। দুর্বল ট্রান্সমিশন লিংক ব্যান্ডউইথ সক্ষমতার কার্যকর ব্যবহারের ক্ষেত্রে বড় একটি বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সেবার গুণগত মানের পার্থক্যের কারণেই ঢাকা-কুয়াকাটা লিংকের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি বিটিসিএলের লিংকের বদলে দুটি বেসরকারি ট্রান্সমিশন সেবাদাতা কোম্পানির (এনটিটিএন) লিংক এরই মধ্যে বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে। এ কারণে ভবিষ্যতে সরকারি খাতে ট্রান্সমিশন লিংক স্থাপনের ক্ষেত্রে উচ্চ প্রযুক্তি এবং যথাযথ গুণগত মানসম্পন্ন যন্ত্রপাতির ব্যবহারও নিশ্চিত করতে হবে।

লেখক: সাংবাদিক
[email protected]