জামায়াতের নতুন পথচলা: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসীরা কি ভাবছেন?

 প্রকাশ : ১৯ নভেম্বর ২০১৯      

 শাহিদ মোবাশ্বের

শাহিদ মোবাশ্বের

বাংলাদেশের ধর্মভিত্তিক প্রধান রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর নতুন আমির নির্বাচিত হয়েছেন ডা. শফিকুর রহমান। গত ১৭ অক্টোবর থেকে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত নির্বাচনে দলটির ৪৫ হাজার রোকনের মধ্যে বেশির ভাগ শফিকুর রহমানকেই ভোট দেন। আমির প্যানেলে আরো যে দুইজনে নাম ছিল। তারা হলেন- দলের দুই নায়েবে আমির মজিবুর রহমান ও মিয়া গোলাম পারওয়ার।

গোলাম আযম, মতিউর রহমান নিযামী এবং মকবুল আহমদেও পর জামাতের চতুর্থ আমির হলেন শফিকুর। নতুন নামে দল গঠনে জামায়াত পাঁচ সদস্যের যে কমিটি করেছে তার নেতৃত্বেও রয়েছেন ১৯৮৫ সালে জামায়াতে ইসলামীতে যোগদানকারী এই শফিকুর রহমান। গত ফেব্রুয়ারিতে স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকার জন্য ক্ষমা চেয়ে দল সংস্কারের দাবি জানিয়ে সাড়া না পেয়ে দল ছাড়েন ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক। বহিষ্কার হন ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি মজিবুর রহমান মঞ্জু। এরপর ভাঙ্গনের
মুখে পরে স্বাধীনতাবিরোধী এই দলটি। এখন প্রশ্ন উঠছে নতুন নামে বা স্বাধীনতা পরবর্তীতে দলে যোগদানকারীদের নেতৃত্বে জামায়াতের ভবিষ্যৎ কি বা কতদূর যেতে পারবে দলটি?

বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা, নিউ জার্সির প্লেইনসবোরো টাউনশিপ থেকে নির্বাচিত কাউন্সিলম্যান, যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গবন্ধু পরিষদের প্রেসিডেন্ট এবং বুলেটস অব ৭১- এ ফ্রিডম ফাইটারর্স স্টোরি গ্রন্থের রচয়িতা ড. নুরুন নবী বলেন, জামায়াত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতা করেেছ- শুধু রাজনৈতিকভাবেই নয় সশস্ত্র সংগ্রামও করেছে। তারা যুদ্ধাপরাধ করেছে। যুদ্ধাপরাধী হিসেেব প্রমাণিত হওয়ায় তাদের বড় বড় নেতাদের ফাঁসি হয়েছে। কিন্তু এখনও যারা আছে তারা যে নামেই আসুকনা কেন সেটা কোন ক্রমেই বাংলাদেশের জন্য গ্রহনযোগ্য হবেনা। নতুন র্ফমে নেতৃত্বে পরির্বতন হলেও তাদের আর্দশ-উদ্দেশ্যতো আর পরির্বতন হচ্ছেনা। বাংলাদেশের রাজনীতিতে তারা আসতে পারবেনা। কেননা তারা প্রজাতন্ত্রে বিশ্বাস করেনা। তারা আল্লাহর শাসন- ইসলামী শাসন কায়েম করতে চায় যা মুক্তিযুেদ্ধর চেতেনা বিরোধী। তাদের অপরাধের জন্য তাদের প্রত্যেকটি র্কমীকে শাস্তি পেতে হবে। আর তাই বাংলাদেশের রাজনৈতিক সচেতন জনগণকে সচেতন থাকতে হবে যে এরা যে ছদ্মনামেই আসুক না কেন তাদের মূল আর্দশ বাংলাদেশ বিরোধী। তারা পরির্বতন হবেনা এবং তাদের রাজনীতিও গ্রহণযোগ্য হবেনা।

জর্জ মেসন বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশিয়া ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ের অধ্যাপক ড. আমিনুর রহমান বলেন, জামায়াত ক্ষমা চাইতে পারেনা। কেননা স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তাদের পাকিস্তানের পক্ষে ভূমিকা সবার জানা। কারণ তারা মনে করেছিল পশ্চিম পাকিস্তান ইসলাম ধর্মের পক্ষ নিয়ে কাজ করেছে। এবং এখন তারা যদি ৭১ এর জন্য ক্ষমা চায় তাহলে তাদের সমস্ত অবদানটা বিনষ্ট হবে। এ কারণে তারা ক্ষমা চাইতে পারেনা। আর তারা যদি রাজনীতি করতে চায় তাহলে জামায়াতে ইসলামী নয় অন্য কোনও নামে রাজনীতি করতে হবে। আর ব্যারস্টিার আব্দুর রাজ্জাক এবং মজবিুর রহমানরা যা চেষ্টা করছে সেটা যদি হয় এবং ইসলামকে তারা কিভাবে ব্যবহার করবে তার উপর নির্ভর করছে। আধুনিক বিশ্বে যে পরর্বিতন হচ্ছে– ধর্ম-ভিত্তিক ও জাতীয়তাভিত্তিক রাজনীতি- সেই পরিবর্তনের ভেতর থেকে তারা ইসলামকে কিভাবে ব্যবহার করছে তাই দেখার বিষয়। যদি তারা ইসলামকে আগের মতই ব্যবহার করে তবে তা হবে দ্বিতীয় জামাতে ইসলামী। কিন্তু যদি তারা সেটা না চায়, তারা একটা ধর্মনিরপেক্ষ নতুন রাজনৈতিক আদর্শ তৈরি করার চেষ্টা করে, যেখানে ধর্মও একটা অংশ যেটা ইউরোপের বিভিন্ন জায়গায় হচ্ছে যদি সেরকম হয় তাহলে আমার মনে হয় তারা একটা নতুন ধারা তৈরি করতে পারে। কিন্তু দেখার বিষয় তারা কোন দিকে যাচ্ছে। আর সফলতার ব্যাপারে মনে হয়না তারা আদৌ জামায়াতে ইসলামীর সাথে সম্পর্ক সম্পূর্ণ চ্ছেদ করে বাংলাদেেশ রাজনীতি করতে পারবে। আর সেটা তাদের উদ্দেশ্য নয় বলে তিনি মনে করেন। কারণ তারা আসলে জামায়াতকে গ্রহণযোগ্য করার জন্য একটা ছদ্ম আবরণ তৈরি করার চেষ্টা করছে। সেই আবরণের আড়ালে জামায়াতের সেকেন্ড ফেইজের একটি রাজনৈতিক দল দাঁড়
করার চেষ্টা বলে তিনি মনে করেন।

যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের প্রেসিডেন্ট ড. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, যারা দেশের সৃষ্টি চায় না তারা কিভাবে দেশের মানুষের ভাগ্য বদলাবে! তাদের চরিত্রেরও কোনও পরবির্তন হবে না। নতুন প্রজন্মের কেউ জামায়াতের নেতৃত্বে আসলে তা সফলতা পাবে কি না তা বাংলাদেশের জনগণের সিদ্ধান্ত। তবে সফলতা পেলে তা হবে
আমাদের প্রোগ্রেসিভের ব্যর্থতা! ধর্ম ধর্মের জায়গায় রাজনীতি রাজনীতির জায়গায়। আমরা কি অন্ধকার যুগে ফেরৎ যাব? পৃথিবীর কোন দেশেই দেশ বিরোধিরা রাজনীতির সুযোগ পায় না। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও নয়। ধর্মের ওপর ভিত্তি করে কোন দলই আমাদের দেশের জন্য কল্যাণ বয়ে আনেনি বা ভবিষ্যতেও আনবে না বলে
তিনি মনে করেন।

বিশিষ্ট সাংবাদকি ইব্রাহিম চৌধুরী বলেন, জামায়াতের যারা নতুন ফর্মেটে আসার চেষ্টা করছে তারা জামাতের রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করেনি, কৌশলকে করছে। তাই বিষয়টি থাকছে একই। জামায়াতের যে রাজনীতি, তারা যে আদর্শে বিশ্বাস করে- পশ্চাদপদ চিন্তা, মওদুদির রাজনীতি এবং বাংলাদেশ প্রশ্নে তাদের যে মনোভাব - সেখান থেকে রাজনৈতিক নামে তাদের কৌশলগত ফিরে আসাটা বড় বিষয় নয়। কিন্তু বাংলাদেশে তাদের সাথে আদর্শের যে সংঘাত চলমান তা থেকে ভিন্ন নাম দিয়েও তারা বেড়িয়ে আসতে পারবেনা। দেশের মানুষ তাদের আগের মতই দেখবে।

মেট্রো ওয়াশিংটন ডিসি এলাকার বিশিষ্ট আইনজীবী মোহাম্মদ আলমগীর মনে করেন, রাষ্ট্র ও ধর্ম দুটি পৃথক সত্ত্বা। তাই ধর্মভিত্তিক দল যাতে গড়ে উঠতে না পারে সে ব্যাপারে সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা থাকা দরকার। আর যারা স্বাধীনতা-বিরোধী তাদরে রাজনীতি করার অধিকার নাই। তবে তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের রাজনীতি করার অধিকার থাকা উচিৎ।

বিশিষ্ট ছড়াকার ও শরীয়া আইন বিশেষজ্ঞ হাসান মাহমুদ বলেন, একটি পাল্টা জামায়াতে ইসলামী গঠন করার ঘোষণা নতুন নেতৃত্ব দেয়নি। আর জামায়াতের আদর্শ শরীয়াভিত্তিক রাষ্ট্র কায়েম করার ব্যাপারেও তাদের অবস্থান স্পষ্ট নয়। তাই নতুন আদলে জামায়াতে ইসলামী গঠনের বিষয়টিই ঘোলাটে মনে হচ্ছে।

বাংলাদশে এসোসিয়শেন অব গ্রেটার ওয়াশিংটন ডিসি (বাগডিসি) নব-নির্বাচিত সভাপতি করিম সালাহউদ্দিন মনে করেন, জামায়াত যদি নতুন করে আসে বা আসতে চায় এবং দেশে ও জনগনের জন্য কাজ করে তাহলে তাদের স্বাগত জানাই। আর তারা যদি পুরানো ধ্যান-ধারণা আর রীতি-নীতিকইে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে তাহলে তারা বাংলাদেশে কেন পৃথিবীর কোন দেশেই তা করতে পারবেনা। কেননা সন্ত্রাস কোনও ধর্ম বা গোষ্ঠীকে স্বীকৃতি দেয়না। আর তারা যদি ভালো কিছু করে আর জনগণ যদি তা গ্রহণ করে তাহলে কারো কিছু বলার থাকবেনা। এসব বিষয় মাথায় নিয়েই তাদের এগুতে হবে।

মেট্রো ওয়াশিংটন ডিসি আওয়ামীলীগের প্রাক্তন সভাপতি আলাউদ্দিন আহমদে বলেন, ‘সেটা হবে নিউ ওয়াইন ইন দ্যা ওল্ড বোটল!’ মনে হয়না তারা খুব একটা সুবিধা করতে পারবে। তাদেরতো দেশ ও জাতির মুক্তির কোন লক্ষ্য নাই। মুক্তিযুদ্ধের ফসলই হচ্ছে বাংলাদেশের জন্ম। নতুন প্রজন্মকে তারা টানতে পারবেনা। সবাই জানে জামায়াত একটি র্ধমান্ধ সন্ত্রাসী দল। তাদের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করতে দেশের মানুষকে সচেতন থাকতে হবে। তারা সন্ত্রাসের মাধ্যমে তাদের ধ্যান-ধারণা বাস্তবায়ন করতে চাইবে।

বৃহত্তর ওয়াশিংটন ডিসির আমরা বাঙালী ফাউন্ডশেনের সভাপতি ফজলুর রহমান বলেন, সবাই জানে জামায়াত একটি ধর্মান্ধ সন্ত্রাসী দল। জায়ায়াতের নতুন
নেতৃত্ব বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব আর দেশীয় সাংস্কৃতির প্রতি হুমকি না হয়ে শ্রদ্ধাশীল হলে টিকে থাকবে। আর ৭১ এর কৃতকর্মের জন্য দুঃখ প্রকাশ করলে এবং বয়োজ্যেষ্ঠদের ভূমিকাকে সর্মথন না করলেও টিকে যাবে। তবে গোড়া ইসলামী হলে চলবেনা। প্রগতিশীল মনোভাব পোষণ করতে হবে। নতুন প্রজন্মকে তারা টানতে পারবে বলে মনে হয় না। কেননা তারা অনেক ট্যালন্টেড। অভিভাবকদের তথা দেশের মানুষকে সচেতন থাকতে হবে।

লেখক: সমকালের ওয়াশিংটন ডিসি প্রতিনিধি