করোনাভাইরাসের বিস্তার কি রুখতে পারবে ২ সপ্তাহের ছুটি?

প্রকাশ: ০৪ এপ্রিল ২০২০     আপডেট: ০৪ এপ্রিল ২০২০   

ডা. পলাশ বসু

ডা. পলাশ বসু

ডা. পলাশ বসু

আচমকা করোনা এসে হাজির হয়েছে আমাদের পৃথিবীতে। আর তাতে মুখ থুবড়ে পড়েছ বিশ্বজীবন। গ্লোবাল ভিলেজ আজ দুঃখে জর্জরিত। ক্লান্ত, অবসন্ন। বিশ্বের শক্তিধর দেশসমূহও আজ অসহায়। সুপার পাওয়ার আমেরিকার স্বাস্থ্যব্যবস্থাও প্রায় ভেঙে পড়েছে। এক নিউইয়র্ক তাদের যে পরীক্ষায় ফেলেছে তাতেই একদম অসহায় হয়ে পড়েছে তারা। ইংলান্ডেরও একই অবস্থা। ইতালি তো একদম বিধ্বস্ত। ফ্রান্স, স্পেনেও করোনার ভয়াল থাবা বিরাজমান।

আচমকা এমন পরিস্থিতির জন্য আসলে কেউই তৈরি ছিলো না। ফলে স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর এটা একটা ব্যাপক চাপ তৈরি করেছে। অবশ্য শুধু স্বাস্থ্য নয়, সামগ্রিক আর্থ-সামাজিক অবস্থার ওপরেই এর একটা বিরূপ প্রভাব পড়েছে। এ কারণেই আমরা আক্রান্ত ব্যক্তিদের যথাযথ সুরক্ষা দিতে পারছি না। ফলে মানুষ মরছে।আর অসহায় হয়ে আমরা তা দেখে চলেছি।

যেহেতু করোনা একটি আগ্রাসী ছোঁয়াচে রোগ ফলে এ থেকে বের হয়ে আসার জন্য আমাদের প্রথমত এর প্রতিরোধেই মনোযোগী হতে হবে; যতদিন না এর ভ্যাকসিন আবিষ্কৃত হচ্ছে। চিকিৎসা দিয়ে তো এটাকে থামানো যাবে না। ফলে আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত একে প্রতিরোধ করে এর বিস্তার বন্ধ করা।

এ রোগের বিস্তার বন্ধ করার জন্য সিঙ্গাপুর শুরু থেকেই বিরামহীন চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ২৩ জানুয়ারি সেখানে প্রথম রোগী শনাক্ত হয়। তারপর থেকেই তারা আক্রান্ত ব্যক্তিদের সাথে সম্পর্কযুক্ত সন্দেহভাজন সকলকে টেস্ট, আইসোলেশন ও কোয়ারেন্টাইনের আওতায় এনেছে নিরবিচ্ছিন্নভাবে। এতে করোনার আগ্রাসী বিস্তার থমকে গেলেও কিন্তু বন্ধ হয়নি। বরং সেখানে এমন টাইট অবস্থার মধ্যেও দেখা যাচ্ছে প্রথম করোনা রোগী সনাক্ত হওয়ার পরে প্রায় আড়াই মাস অতিবাহিত হয়েছে। তাতে রোগীর সংখ্যা খুব ধীরে হলেও বেড়েই চলেছে।

এখন অবধি সেখানে ১ হাজার ১১৪ জন আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তবে, মৃত্যু হয়েছে সেখানে মাত্র ৬ জনের। জার্মানিতে ২৭ জানুয়ারি প্রথম রোগী শনাক্ত হওয়ার পরে তারাও খুব দ্রুত রোগী শনাক্তকরণ, আইসোলেশন ও কোয়ারেন্টাইনের কাজটি শুরু করে।  তবুও আজ  অবধি ২ মাস ৮ দিন পরে সেখানে আক্রান্ত হয়েছে ৯১ হাজার ১৫৯ জন। মৃত্যু হয়েছে ১ হাজার ২৭৫ জনের।

আর ইতালিতে দেখেন, ৩১ জানুয়ারি প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে। তারপর কেটে গেছে ২ মাস ৪ দিন।সেখানে আক্রান্ত হয়েছে ১ লাখ ১৯ হাজার ৮২৭ জন।বিস্ময়করভাবে সেখানে মারা গেছে ১৪ হাজার ৬৮১ জন। অন্যদিকে আমেরিকাতে প্রথম করোনা রোগী সনাক্ত হয়েছে ২০ জানুয়ারি।তারপর কেটে গেছে ২ মাস ২০ দিন।এখন সেখানে আক্রান্তের সংখ্যা পৌঁছেছে ২ লাখ ৭৩ হাজার ৮৮০ জনে। আর মারা গেছে ৭ হাজার ৭৭ জন।  

উপরের তথ্যউপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে- টাইট স্ক্রিনিং, আইসোলেশন এবং কোয়ারেন্টাইন করার পরেও সিঙ্গাপুর ও জার্মানিতে আক্রান্তের সংখ্যা কমেনি, বরং বেড়েছে। কিন্তু লক্ষণীয় ব্যাপার হচ্ছে, সেখানে মৃতের সংখ্যা কম। অন্যদিকে, ইতালি ও আমেরিকাতে রোগীর সংখ্যা বেড়েছে অসম্ভব দ্রুতগতিতে। তার চেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে, মৃতের সংখ্যা সেখানে দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। সাথে আছে স্পেন, ফ্রান্সও।

প্রশ্ন হচ্ছে, এর কারণ কী? কারণ খুবই সিম্পল। এ রোগটিকে সিঙ্গাপুর ও জার্মানি যতটা সিরিয়াসলি প্রথম থেকেই নিয়েছে (টেস্ট, আইসোলেশন ও কোয়ারেন্টাইন) সেভাবে ইতালি ও যুক্তরাষ্ট্র নেয়নি। এর ফলে করোনাভাইরাস সেখানে অধিক মানুষকে আক্রান্ত করার সহজ সুযোগ পেয়েছে। আর তাতে একসাথে অনেক রোগী হাসপাতালে ছুটেছে উন্নত চিকিৎসার জন্য। এর ফলে ইতালি ও যুক্তরাষ্ট্র (বিশেষত নিউইয়র্ক) হাসপাতালগুলোর চিকিৎসা দেয়ার যে সর্বোচ্চ সক্ষমতা সেটা ভেঙে পড়েছে। কিন্তু ধরুন, যদি এই রোগীগুলো ধীরে ধীরে আসতো তাহলে কিন্তু একসাথে হাসপাতালে চাপ পড়তো না। এতে প্রতিটা রোগীকেই স্বাস্থ্যকর্মীদের সর্বোচ্চ সেবা দেয়ার সুযোগ তৈরি হতো। ফলে মৃত্যু তাতে কম হতো। যেটা হয়েছে সিঙ্গাপুরে ও জার্মানিতে।   

এদিকে, এত কিছু করার পরেও পরিস্থিতির উন্নতি হয় জন্য শেষাবধি এই আড়াই মাস পরে এসে সিঙ্গাপুরে ১ মাসের জন্য লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে।সিঙ্গাপুর সরকার দেশটিতে স্কুল কলেজসহ বেশির ভাগ কর্মক্ষেত্র বন্ধ ঘোষণা করেছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী লি সিয়েন লুং বলেছেন, "করোনার সংক্রমণ প্রতিরোধে আমাদের এখনই দৃঢ় পদক্ষেপ নেয়া উচিত। একারণে ধীরে ধীরে বাড়ানোর পরিবর্তে আগামী কয়েক সপ্তাহ চূড়ান্ত নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমরা।" পাশের দেশ ভারতও একবারে ৩ সপ্তাহের লকডাউন ঘোষণা করেছে। শোনা যাচ্ছে, সেটা আরো বাড়তে পারে।

ঠিক কতদিন কঠোরভাবে লকডাউনে থাকলে একটা দেশ থেকে করোনা নির্মূল হতে পারে? এর আসলে সঠিক হিসাব এখনও পরিষ্কার নয়। তবে, অনেকে বলছেন, কোন দেশে প্রথম রোগী ধরা পড়ার দিন থেকে করোনার সুপ্ত অবস্থার সর্বোচ্চ দিন মানে ১৪ দিনকে ৪ দিয়ে গুণ করলে যে ৫৬ দিন হচ্ছে সেই সময় যদি কঠোরভাবে লকডাউন করা যায়, তাহলে একটি দেশ পুরোপুরি করোনা নির্মূলের দাবি করতে পারে।

এদিকে রণজয় অধিকারী ও রাজেশ সিং নামক  ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ জন ভারতীয় বংশোদ্ভূত গবেষক ভারতে টানা ৭ সপ্তাহ বা ৪৯ দিনের লকডাউনের পরামর্শ দিয়েছেন। সেটা না হলেও অন্তত ৪৫ দিন হতেই হবে বলে তারা অভিমত দিয়েছেন। (সূত্র: সংবাদ প্রতিদিন কলকাতা, ২ এপ্রিল,২০২০)

ফলে স্বাভাবিকভাবেই ২ সপ্তাহের ছুটি দিয়ে আমাদের দেশে আসলেই ভালো ফল মিলবে কি? এ ছুটির সময়ে ঢাকা ছেড়েছে ১ কোটির উপরে মানুষ। এর মধ্যে গার্মেন্টস খুলছে। পত্রিকা ও টিভিতে খবর দেখলাম, গার্মেন্টস খোলার কারণে গতকাল থেকেই হাজার হাজার মানুষ পায়ে হেঁটে এবং নানা বিকল্পভাবে ঢাকা ও তার আশেপাশে ঢুকতে শুরু করেছে। তাছাড়াও সারাদেশের খবর হচ্ছে গ্রাম-শহবেরর অধিকাংশ জায়গায় পাড়া-মহল্লা-অলিগলিতে মানুষ দলবেঁধে আড্ডা মেরছে আগের মতোই। ফলে এ ছুটিতে যে কোয়ারেন্টাইন হওয়ার কথা ছিলো সেটা আশানুরূপ হয়নি বলেই মনে হয়।

খেয়াল করুন, আমাদের দেশে প্রথম করোনারোগী ধরা পড়ার পর থেকে এখনও ১ মাস পার হয়নি। প্রতিনিয়তই রোগী ধরা পড়ছে। এ অবস্থায় গার্মেন্টস চালু হয়ে গেলো। তারা তো ১৪ দিনের ছুটিও দেয়নি! ফলে আমরা যদি এ ২ সপ্তাহের ঢিলেঢালা ছুটির পরে আবার অফিস-আদালত খুলে দিই, যানবাহন চলা শুরু করে, তাহলে “সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং” বা “সামাজিক দূরত্ব” বজায় রাখার যে বিষয়টা আছে সেটা আর থাকবে না। ফলে আমার আশঙ্কা হয় এতে কারোনার যে বিস্তার হবে তা হয়ত আমাদের কল্পনারও বাইরে।

ফলে যৌক্তিকতার নিরিখেই ছুটি বাড়ানোর কোন বিকল্প নেই। সেই সাথে টেস্ট, আইসোলেন ও কোয়ারেন্টাইনের কাজও চালিয়ে যেতে হবে। আর ছুটি মানে শুধু ছুটি  নয়; একদম কঠোরভাবে সেটা বাস্তবায়ন করতে হবে। আগামী ২৩ তারিখ থেকে হয়ত রোজা শুরু হতে যাচ্ছে। ফলে হিসাব করে দেখতে হবে, ছুটির পরে আবার অফিস-আদালত-কলকারখানা খুলে দিয়ে আমরা কতটুকু অর্জন করতে পারব। অন্যদিকে করোনা যদি ছড়িয়ে পড়ে মহামারি হয়ে তাহলে আমাদের ক্ষতি কী হবে।

আশা করি, সেই অনুপাত বিবেচনায় নিয়ে সাথে ইতালি, স্পেন, যুক্তরাষ্ট্রের পরিস্থিতি মাথায় রেখে আমাদের নীতি নির্ধারকেরা করোনার বিস্তার রোধকেই সবার আগে গুরুত্ব দিবেন। আর করোনার বিস্তার রোধে লকডাউন, টেস্ট, আইসোলেশন, কোয়ারেন্টাইন চালিয়ে যাওয়ার কাজ নিরবিচ্ছিন্নভাবে করে যাওয়ার ব্যাপারে যথাযথ ভূমিকা রাখবেন।  

ডা. পলাশ বসু, সহযোগী অধ্যাপক, ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ, এনাম মেডিকেল কলেজ