বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রিয় ছোট ভাই সদা হাস্যোজ্জ্বল সুমন চাকমা মারা গেলেন ডাক্তারদের অবহেলায়! তার করোনা হয়নি, যা ফেসবুক স্ট্যাটাসেও স্পষ্ট করেছিলেন; তিনি করোনা আতঙ্কের কারণে ডাক্তারদের অবহেলায় হয়তো মারা যাবেন। ডাক্তারদের অনেকে করোনা আতঙ্কে সাধারণ রোগীদেরও গ্রহণ করতে চাচ্ছেন না! সুমন তাদেরই অবহেলার শিকার। 

আমরা আশাবাদী, মহান পেশার মহৎ লোকেরা তাদের ভালো কাজের জন্য জাতির হৃদয়ে আজীবন থাকবেন। অসহায় মানুষটি যে আপনাকেই এই পার্থিব জীবনসংসারে ওই মুহূর্তের জন্য অত্যন্ত আপন ভাবেন; সে মানুষটি তার স্ত্রী-সন্তান, বাবা-মা, ভাই-বোন আর নিকটাত্মীয়ের চেয়ে যে আপনাকেই বেশি নির্ভরশীল ও ভালোবাসার মানুষ ভাবেন। তিনি হয়তো আপনার একটু ভালোবাসা পাওয়ার আশায় অত্যন্ত কাতর! আমরা অনেকেই জানি, রোগীদের সঙ্গে আপনার সুন্দর ব্যবহার তার অর্ধেক রোগ ভালো করে তোলে। আজকের এই যুদ্ধে আপনারা সামনে থেকে আমাদের নেতৃত্ব দেবেন জীবন নিয়ে সুস্থভাবে বাঁচার। সৃষ্টিকর্তার পর আপনাদের কাছেই আমরা ভরসা পাব, স্বপ্ন দেখব। যদি মারাও যাই, হাসতে হাসতে হয়তো মৃত্যুকে বরণ করে নেব এই ভেবে যে, পৃথিবীতে কেউ হয়তো আমাদের জন্য আছেন।

বিদেশে অনেক ডাক্তার পিপিই না থাকায় পলিথিন গায়ে দিয়ে রোগীর চিকিৎসা করতে যাচ্ছেন। আয়ারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী রোগীর সেবার জন্য তার পূর্ব পেশা ডাক্তারিতে চলে আসছেন। আরও কত মহৎ নজির আমরা গণমাধ্যমের কল্যাণে দেখছি। তাহলে আমরা কেন আমার দেশের প্রিয় মানুষদের জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে নানা শর্ত জুড়ে দিচ্ছি? তবে চলুন, আমরা যুদ্ধে শরিক হই। এ যুদ্ধ শত্রুর বুলেটের সামনে বুক পেতে দেওয়া নয়। এ যুদ্ধ মানবিকতা আর বুদ্ধিদীপ্ত ও ধৈর্যশীল মানসিকতার। এ যুদ্ধের সর্বাগ্রে থাকবেন সম্মানিত ডাক্তাররা; সঙ্গে থাকব আমরা সবাই। কিন্তু বিষণ্ণ কষ্ট পাই যখন শুনি, মানবপ্রেমিক সেই ডাক্তারদের কয়েকজন করোনার ভয়ে অন্যান্য অসুস্থ রোগীকেই গ্রহণ না করে নানা ধরনের হয়রানির মাধ্যমে স্বাভাবিক রোগীকে অস্বাভাবিক করে মৃত্যুর কোলে ঠেলে দেন। সংবাদমাধ্যমে হয়তো তার কয়েকটি মাত্র প্রকাশ পায়, অন্যান্য অগণিত অসহায় মানুষের স্বজন হারানোর খবর হয়তো অন্তরালেই থেকে যায়!

সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ, প্রশাসন, সশস্ত্র ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, কাস্টমস, ব্যাংকসহ অনেক ডিপার্টমেন্ট নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছে। প্রিয় ডাক্তারদের উদ্দেশে বলছি, সশস্ত্র ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সারাদিন রাস্তায় থাকছেন আমাদের ঘরে নিরাপদ রাখার জন্য; বাংলাদেশ কাস্টমস বিভিন্ন বন্দরে জরুরি আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের জন্য কাজ করে যাচ্ছে, যেখানে তাদের জীবন রয়েছে অনেক ঝুঁকির মধ্যে। এরা সবাই আপনার-আমার করোনামুক্ত সুন্দর সকাল উপহার দেওয়ার জন্য এত কষ্ট করছেন।

আমরা বিদেশফেরত রেমিট্যান্স আর্নারদের নানাভাবে কটাক্ষ করছি, তারা না এলে নাকি করোনা হতোই না। কিন্তু বিদেশ থেকে বিদেশিরাসহ অনেক পণ্যই দেশে আসে। এই দুই মাধ্যমেও তো ভাইরাসটি আসতে পারে- চিন্তা করেছি কখনও? আমাদের বেকার জনসংখ্যার একটা বড় অংশ বিদেশে শ্রমবাজার দখল করে আছেন, যারা দেশের অর্থনীতিতে অনেক বড় ভূমিকা রেখে আসছেন। বৈশ্বিক এই বিপদে মা-বাবা যেমন তার ছেলেমেয়েকে কাছে চান, তেমনি তারাও অনেকে চান দেশের মাটিতে এসে মা-বাবা ও আপনজনের কাছে থাকতে, দেশের মাটিতে প্রিয়জনদের কাছে মরেও শান্তি পাবে বলে। অনেকে বুদ্ধি করে আসেননি। তারা হয়তো আবেগ নিয়ন্ত্রণ করেছেন সামষ্টিক স্বার্থে। সবাইকেই ধন্যবাদ দেওয়া উচিত। তবে যারা চলে আসছেন তাদের সঙ্গে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখেও ভালোবাসা বিনিময় করা যায়। তাদেরও দায়িত্ব সরকারের দেওয়া আইনকানুন সম্মানের সঙ্গে মান্য করা।

কয়েকটা দিনের জন্য নিজের মনের সঙ্গে যুদ্ধ করে হলেও ঘরে থাকতে হবে। প্রত্যেকে নিজ নিজ দায়িত্ব থেকে যুদ্ধ ঘোষণা করি- নিজে বাঁচি আর প্রিয় দেশটাকে বাঁচাই।

লেখক: শুল্ক কর্মকর্তা, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড