বহুল প্রচলিত প্রবাদ- সময় ও নদীর স্রোত কারও জন্য অপেক্ষা করে না। সত্যি তাই। প্রতিদিনের সূর্য নিয়ম করেই ওঠে, আবার অস্ত যায়। পৃথিবীর যাবতীয় সমস্যা উপেক্ষা করে প্রকৃতি তার আপন খেয়ালে মত্ত। সারাবিশ্ব যখন করোনাভাইরাসে আতঙ্কিত। তখনও সূর্য তার আপন গতিতে নিয়ম করেই চলছে। ইন্টারনেটের বদৌলতে খবর নিচ্ছিলাম দূর প্রবাসের বাল্যবন্ধু, আত্মীয়স্বজনদের- কে কেমন আছে। বিকাশ বালা ছোটবেলার বন্ধু, আমেরিকা প্রবাসী। থাকে নিউইর্য়ক শহরের ক্যুইন্স জ্যামাইকাতে। এ পর্যন্ত খবরে যা চাউর; আমেরিকার সবচেয়ে বিপর্যস্ত এলাকার মধ্যে রয়েছে ক্যুইন্স জ্যামাইকা ও জ্যাকসন হাইট। যেখানে বাঙালিদের বসবাস বেশি। বাঙালি মানেই অবাধ গতি। মনে-প্রাণে রবিঠাকুরের আর কোনো কথা মনে না রাখলেও মেনে নিয়েছে- 'আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে' গানটি। বাঙালি বরাবরই খোলামেলা। ফলে করোনার ভালোবাসা পেতে কষ্ট হয়নি। দুটি এলাকাতেই মৃত্যুহার বেশি। প্রতিদিন মানুষ মরছে। এ পর্যন্ত সংখ্যায় মৃত ৪৬ থেকে ৪৭ জন এবং এরা বাঙালি

রোগীর তুলনায় চিকিৎসা ব্যবস্থা অপ্রতুল। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য সরবরাহ প্রয়োজনের তুলনায় কম। মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার বাজারে নেই। দিন দিন কর্মবিমুখ মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। খাদ্য সংকট তীব্র। অপরদিকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। সরকার যা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে তা মিলছে না। আমার দিদি শুকা গাঙ্গুলী, গত কয়েক দিন গৃহবন্দি। মজুদ খাদ্য প্রায় শেষ। খাদ্য সংকটের জন্য একবেলা ভাত খাচ্ছে। যা-ও বা আছে তা ফুরিয়ে গেলে কী হবে- এ আশঙ্কায় প্রহর গুনছে। আমার প্রাণপ্রিয় ছোট ভাই স্বাধীন এই সবেমাত্র আমেরিকা পৌঁছাল। গিয়েই গৃহবন্দি। বোবা কান্নায় ওর ভেতর-বাহির দুই-ই একাকার। বন্ধুহীন নিঃসঙ্গতা, সঙ্গে সদ্য পিতৃবিয়োগ। সব দুঃখ-বেদনা যেন ওকে গ্রাস করছে। বন্ধু জয়ন্ত আমেরিকা পুলিশের চাকরি করে। প্রতিদিনই ওর সঙ্গে কথা হয়। মাঝেমধ্যে শহরের বর্তমান চালচিত্রের ছবি দেখায়। জনমানবহীন শহরে সারি সারি গাড়ি। গাছগুলো কেমন দৃষ্টিহীন। সমস্ত আকাশ গোমড়ামুখো। যেন এক অদ্ভুত পৃথিবীতে বাস করছি। সুকান্তের প্রতিশ্রুতি আজ ম্রিয়মাণ। তোমার রেখে যাওয়া পৃথিবী আর শিশুর বাসযোগ্য নেই, সুকান্ত।

একেবারে অলস সময় পার করছি, তা নয়। পেশাগত কারণে প্রতিদিন দু'একবার বাইরে যেতে হয়। সঙ্গে সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে কিছু সেবামূলক কাজ। বাড়িতে নিরাপত্তার চাদর বেশ কঠিন। বাইরে থেকে ঘরে ঢুকলেই হাত-মুখ ভালো করে পরিষ্কার করে নিতে হয়। সন্ধ্যায় পুলিশের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা কিটস্‌ দেওয়া হলো। সাবধানতার যেন কোনো কমতি নেই। তবুও বাঙালি যেন বাংগাল থেকেই যাচ্ছে। যতক্ষণ না পুলিশের লাঠি পিঠে উঠবে, ততক্ষণ ঘরমুখো হবে না। এই অলস সময়টা পুরোনো কাগজপত্র নেড়েচেড়ে বারবার দেখি। এই দেখার মাঝে ২০০৭ সালের কিছু পুরোনো কাগজ পাই। ২০০৭ সালের ডিসেম্বরে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় ঔষধি গাছের গুরুত্ব শিরোনামে দুই দিনের জাতীয় সম্মেলনের অয়োজন করি। আমার বন্ধু সরদার আরফি অগ্রভাগে, অ্যাকশনএইডের আর্থিক সহায়তায় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ওই সময় বেশকিছু সাংবাদিককে এ কাজের জন্য ফেলোশিপ দেওয়া হয়। ভারত-বাংলাদেশ মিলে প্রায় ৩শ' কবিরাজ, হোমিও চিকিৎসক ও উন্নয়নকর্মী অংশগ্রহণ করেন। বেশ কিছু বিশিষ্টজন তাদের লেখা উপস্থাপন করেন। শিরোনামেই বিষয়টি পরিষ্কার। এর পর বেশ কিছু কাজ হলো। বরাবরই চেষ্টা করেছি বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবনের জন্য। আমার শ্রদ্ধেয় গুরুজন ডা. রশিদ-ই মাহবুবসহ অনেকের সঙ্গে এ নিয়ে বহুবার কথা হয়েছে। আমার শ্রদ্ধাভাজন ড. এবিএম ফারুক স্যার এ নিয়ে বেশ কাজ করেছেন। কিন্তু কেন যেন আমাদের হাজার বছরের চিকিৎসা ব্যবস্থায় আস্থা রাখতে পারিনি। খাদ্য যে মানুষের জন্য সবচেয়ে বেশি নিরাপদ হওয়া প্রয়োজন- এই বোধোদয় হয়নি বাঙালির কোনোকালে। আজও নেই। খাদ্য জীবনের নিয়ন্ত্রক। গাড়ির তেল না হলে যেমন গাড়ি চলে না- এটি সবাই বুঝি-জানি। আবার এও জানি, খারাপ তেলে গাড়ি নষ্ট। কিন্তু খারাপ খাবারে দেহ নষ্ট- এটি কখনোই আমরা বুঝতে চেষ্টা করিনি। আমাদের চারপাশে হাজার হাজার রকম গাছ ছড়িয়ে আছে, যার ঔষধি গুণ আমরা জানি না। ২০০৬ সালে দৃক গ্যালারিতে ঔষধি গাছের একক চিত্রপ্রদর্শনী করা হয়। এটি সম্ভবত বাংলাদেশে প্রথম। দর্শকদের মন্তব্য- গাছের এত ঔষধি গুণ, সত্যি আমরা জানি না। আমদের হাতের কাছে, রাস্তার দু'পাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে হরেক রকম ঔষধি গাছ, যা আমরা চিনি না। প্রকৃতি তার অসীমতায় সব কিছু রেখেছে সৃষ্টির উল্লাসে। আজকের বিপন্নতা আমাদের নিজেদের তৈরি। যদিও এর উৎপত্তি নিয়ে বিভিন্ন খবর বাজারে চাউর।

প্রকৃতি তার নিজস্ব চলনে ভারসাম্যতা নিয়ে চলার গতি যখন হারিয়ে ফেলে, তখন বিপর্যয় অনিবার্য। আমরা প্রকৃতির সঙ্গে প্রতারণা করেছি। আমাদের নদীগুলো শুকিয়ে কাঠ। প্রতিদিন জলের বিশুদ্ধতা নষ্ট করে ফেলছি। শুষ্ক মরুভূমিতে রূপান্তরিত নদীগুলো। বিলুপ্ত সব প্রজাতির পশু-পাখি। ষড়ঋতুর দেশ কখন যে কোথা দিয়ে পালিয়ে যায়, খুঁজে পাওয়া ভার। ঋতুবৈচিত্র্যের সঙ্গে আমাদের জীবন যে নিয়ন্ত্রিত- সেটি ভুলে যেতে বসেছি। জোয়ার-ভাটা, অমাবস্যা-পূর্ণিমাতে শরীরের ওপর যে প্রভাব পড়ে, তাকে অস্বীকার করি কীভাবে? নদীশূন্যতায় জোয়ার-ভাটা নেই। প্রকৃতির ওপর প্রতিদিনের অত্যাচার আমাদের প্রতিরোধে ক্ষমতা বিলুপ্ত। তাই সামান্য সর্দি-জ্বর হলেই আমরা বিধ্বস্ত। যেমন হারিয়ে ফেলেছি প্রতিবাদের ভাষা, তেমনি ক্ষয় করেছি প্রতিরোধের সক্ষমতা। শরীরের যেন সেই কাঠামো নেই। খেলার মাঠ, সাঁতার কাটার পুকুর কোথায় হারিয়ে ফেলেছি! নগর সভ্যতা আমাদের অনেক দিয়েছে; আবার অনেক নিয়েছেও।

ফিরে আসি প্রসঙ্গে। করোনা বিষয়ে এ পর্যন্ত বিজ্ঞান সঠিক কোনো পথের দিশা আমাদের দেয়নি। নানা জনের নানান কথায় কান ভারি। নিশ্চয় আমরা এই পথ পাড়ি দিয়ে লক্ষ্যে পৌঁছুব। কিন্তু যেন ভুলে না যাই প্রকৃতির দান, অবহেলা আর অত্যাচারের বিরূপ ফলের কথা। ইতোমধ্যে আমেরিকার গাছে গাছে নতুন কুঁড়ি, নতুন ফুল আসছে। নিশ্চয় নতুন করে আবার সূর্য উঠবে। প্রতিদিনের খাবারে খুঁজে বেড়াব সেই অমিত শক্তি, যা আমাদের প্রতিরোধ ও প্রতিকারের শক্তি জোগাবে। নীরোগ, ক্লান্তহীন একটি শরীর আমাদের প্রকৃতির সঙ্গে আলিঙ্গনে নিবিড়তা বাড়াবে। শেষ করব রবিঠাকুরের কয়েকটি পঙ্‌ক্তি দিয়ে- 'দুঃখের তিমিরে যদি জ্বলে তব মঙ্গল-আলোক, যদি জ্বলে, তবে তাই হোক। তবে তাই হোক। দুঃখের তিমিরে যদি জ্বলে, মৃত্যু যদি কাছে আনে তোমার, অমৃতময় লোক, তবে তাই হোক।'

সাংবাদিক ও কলামিস্ট

বিষয় : নরেশ মধু মাটির টান

মন্তব্য করুন