জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা সম্প্রতি সতর্ক করেছে করোনায় অনেক দেশ চরম খাদ্য সংকটে পড়বে। করোনাভাইরাস মহামারির প্রকোপে উদ্ভূত লকডাউন বৈশ্বিক খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা চরমভাবে বিঘ্নিত করছে। এ অবস্থায় বিশ্বব্যাপী খাদ্য নিরাপত্তা চরম ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছে সংস্থাটি। অন্যদিকে করোনাভাইরাসের প্রভাবে খাদ্য রপ্তানিকারক অনেক দেশ অভ্যন্তরীণ খাদ্য সরবরাহ অটুট রাখতে সম্প্রতি খাদ্যপণ্য রপ্তানি সাময়িক বন্ধ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে এবং কেউ কেউ করতে যাচ্ছে। এশিয়ার শীর্ষ চাল রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, মিয়ানমার এই পথে হাঁটছে। এ অবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে এ অঞ্চলে খাদ্য আমদানিকারক অনেক দেশ চরম খাদ্য সংকটে পড়বে বলে মনে করছে জাতিসংঘের এই সংস্থাটি।

করোনার প্রভাবে দেশব্যাপী কার্যত লকডাউন বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ইতোমধ্যে করোনার প্রভাব কৃষি ক্ষেত্রে অনুভূত হতে শুরু করেছে। একদিকে কৃষকরা ফসলের প্রত্যাশিত মূল্য পাচ্ছেন না, যাতায়াতে বিধিনিষেধের কারণে কৃষি উপকরণ শ্রম, বীজ এবং সারের সংকট দেখা দিচ্ছে। অন্যদিকে, মানুষ আতঙ্কিত হয়ে বেশি বেশি মজুদের কারণে সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ পড়ছে, যা কৃত্রিমভাবে খাবারের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। প্রয়োজনের চেয়ে বেশি খাদ্য সংগ্রহ করলে একদিকে যেমন খাবার নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা আছে, তেমনি বাড়তি দামে প্রান্তিক ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আরও বেশি বিপাকে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতসহ ইতালি ও অন্যান্য দেশের মতো এই সংকটকালে পরিবার বা জনপ্রতি খাদ্যসামগ্রীর সর্বোচ্চ ক্রয়ের পরিমাণ নির্ধারণ করে মজুদ নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। এ ছাড়া চলাচলে বিধিনিষেধের সময় খাদ্য সংকট যাতে গুরুতর হয়ে না দাঁড়ায় এবং সরবরাহ ও পরিবহন ব্যবস্থাটি যেন কার্যকরী এবং অনুকূল থাকে তা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে খাদ্য ও কৃষি শিল্পকে লকডাউনের বিধিনিষেধ থেকে স্বল্প মেয়াদে ছাড় দেওয়া এবং কৃষি শ্রমিকদের সুরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ করা প্রয়োজন যাতে তারা খাদ্য উৎপাদন এবং সরবরাহ ব্যবস্থা অটুট রাখতে জরুরি ও প্রয়োজনীয় কাজ করতে সক্ষম হন।

দেশের খাদ্য সরবরাহ অভ্যন্তরীণ উৎপাদন এবং আমদানি উভয়ের ওপর নির্ভরশীল। বিশ্বব্যাপী কৃষি উৎপাদন এবং সরবরাহ ব্যবস্থা বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। বাংলাদেশ গড়ে ২০ শতাংশের বেশি খাদ্য বিশ্ববাজার থেকে আমদানি করে থাকে। একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ মোট খাদ্যশস্য উৎপাদন ছিল মাত্র ৩৭.৩৮ মিলিয়ন টন এবং মোট খাদ্যশস্য আমদানি ছিল ৯ মিলিয়ন টন, যার মধ্যে চাল ছিল ৩.৯৯ মিলিয়ন টন এবং গম ৫.৮৮ মিলিয়ন টন। যদিও সম্প্রতি ভালো আবহাওয়ার কারণে এবং ফলন বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশের ধানের উৎপাদন পর পর কয়েক বছর বৃদ্ধি পেয়েছে, তবে সামগ্রিকভাবে গম এবং ভুট্টার ওপর দেশের আমদানিনির্ভরতা আগের চেয়ে বেড়েছে। বাংলাদেশ তার বার্ষিক প্রয়োজনীয় প্রায় ৭ মিলিয়ন টন গমের চাহিদার ছয় ভাগের এক ভাগ পূরণ করে অভ্যন্তরীণ চাহিদা থেকে। সুতরাং, বাংলাদেশের খাদ্য সরবরাহ অনেকাংশে আমদানিনির্ভর। বৈশ্বিক বাজারে যে কোনো সামষ্টিক পরিবর্তন যেমন উচ্চতর দাম, দামের অস্থিরতা স্থানীয় বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলতে পারে। রপ্তানিকারক দেশগুলোতে দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থা থেকে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাপী সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন ঘটলে তার প্রত্যক্ষ প্রভাব বাংলাদেশের ওপর পড়বে। এ ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত অভ্যন্তরীণ উৎপাদন নিশ্চিত করতে না পারলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা হতে পারে এক বিশাল সংকটের মুখোমুখি।

এই সংকটকালে সরকারের উচিত দেশের খাদ্য ও কৃষি ব্যবস্থার ওপর প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ অর্জন করা যাতে খাদ্য সরবরাহ কোনো রকম ঝুঁকিতে না পড়ে। দেশের কৃষি ব্যবস্থাপনা, খাদ্য উৎপাদন এবং সরবরাহ ব্যবস্থা সক্রিয় ও নিয়ন্ত্রণে রাখতে ক্ষেত থেকে খাবার টেবিল পর্যন্ত খাদ্য পৌঁছাতে যে ফাঁকগুলো আছে, সেগুলো খুঁজে বের করে বন্ধ করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। এটা স্পষ্ট যে, দেশে দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য সরবরাহ অনিশ্চিত হতে পারে এবং এটি কৃষকদের ওপর প্রভাব ফেলবে। এ ক্ষেত্রে এই সংকটকালে স্বাস্থ্যসহ জরুরি পরিষেবাগুলোর পাশাপাশি কৃষিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সরকারের সক্রিয় কর্মপন্থা গ্রহণ করা আশু প্রয়োজন।

যদিও করোনা মহামারি বিপর্যয় এড়াতে এরই মধ্যে সরকার বেশকিছু আর্থিক প্রণোদনা ঘোষণা করেছে, যা অনেক মহলে প্রশংসিত হলেও কৃষি সংক্রান্ত কোনো প্রণোদনা প্যাকেজ না থাকাতে কৃষিসংশ্লিষ্ট মহলে কিছুটা হতাশা এবং উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। সামনে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি যে হতে পারে সে বিষয়ে সরকারকে সতর্ক হওয়া এবং সেটাকে অগ্রাধিকার বিবেচনায় এনে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। বিশেষ করে, করোনাভাইরাসের প্রকোপ প্রশমিত করতে অবিলম্বে কৃষিতে বিভিন্ন ধরনের আর্থিক সহায়তা যেমন সব ধরনের ঋণের সুদ মওকুফ, কিস্তি পরিশোধ বন্ধ রাখা, বিনামূল্যে সেচ সরবরাহ কিংবা স্বল্পমূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং কৃষি উপকরণে বেশি পরিমাণে ভর্তুকি দেওয়া প্রয়োজন। এ ছাড়া কৃষকদের জন্য বড় বেলআউট প্যাকেজ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন যার আওতায় কৃষকদের এবং বিভিন্ন খামারিদের স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ প্রদান করার ব্যবস্থা থাকে। এ ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষি এবং মৎস্য ও হাঁস-মুরগির খামারিদের বিভিন্ন ধরনের সহায়তা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। এই সহায়তা কর্মসূচিতে সরাসরি নগদ অর্থ সহায়তা, দ্রুত ঋণ সুবিধা এবং সরাসরি পণ্য ক্রয় অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। মূলকথা হলো, যেসব উপাদান এই খাতকে চলমান রাখার মূল চাবিকাঠি, সেগুলো যেন কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত না হয় সেদিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। ব্যয় নির্বিশেষে কৃষকদের তাদের কৃষিকাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত সহায়তা প্রাপ্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা দরকার। এটি বাস্তবায়নে প্রয়োজনে পদ্মা সেতুসহ সরকারের চলমান মেগা প্রজেক্টগুলো যেমন মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক শক্তি কেন্দ্রসহ অন্যান্য অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর মতো জরুরি প্রয়োজন হয় না এমন প্রকল্পগুলোতে অর্থ বরাদ্দ সাময়িক স্থগিত করে স্বাস্থ্য ও কৃষিতে অগ্রাধিকার দিয়ে সরকারি ব্যয়ের একটি সমন্বয় করা যেতে পারে।

দেশের কৃষি বাজার ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং তার ভয়াবহতা সবার জানা। একজন কৃষক কী পরিস্থিতিতে আর কতটা হতাশায় তার রক্ত পানি করা কষ্টে উৎপাদিত ফসল ক্ষেতেই পুড়িয়ে ফেলতে পারে সেটা অনুমেয়। যে কৃষকরা বৃষ্টিতে ভিজে, রোদে পুড়ে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে শস্য ফলিয়ে মানুষের মুখে অন্ন তুলে দেন, আমাদের জীবনকে বাঁচিয়ে রাখেন, তাদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য দাম পেতে আন্দোলন করতে দেখাটা চরম হতাশাজনক। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কৃষি, বাণিজ্য ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের উচিত একসঙ্গে এই সংকট পরিস্থিতি সফলভাবে মোকাবিলার জন্য সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া যাতে কৃষক, কৃষি শ্রমিক, খামার মালিক, খাদ্য শিল্প এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী, আড়তদার সবার এই মানবিক বিপর্যয়ে নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখে। সবার সহযোগিতা নিয়ে একটি সক্রিয় ও সক্ষম উৎপাদন, সরবরাহ এবং বাজার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

পরিশেষে, নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন যথার্থই বলেছেন, সঠিক বণ্টন এবং বাজার ব্যবস্থাপনার অভাবে কীভাবে খাদ্য ঘাটতি প্রকট আকার ধারণ করতে পারে। ভারতের সবুজ বিপ্লবের জনক এমএস স্বামীনাথন সম্প্রতি এক টুইট বার্তায় বলেছেন, কৃষি যদি ঠিকঠাক না চলে, তবে অন্য কোনো কিছুই ঠিকমতো চলবে না। সুতরাং এখন সময় এসেছে সরকারকে স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে সঙ্গে কৃষিকে অগ্রাধিকার দেওয়া। কেননা কৃষি বাঁচলে দেশের মানুষ বেঁচে থাকবে। কৃষি পথ হারালে জাতি দিশেহারা হয়ে পড়বে, পকেটে টাকা থাকুক আর নাই থাকুক। তাই, করোনার প্রকোপ মোকাবিলায় কৃষিকে অবহেলা নয় বরং কৃষি ও কৃষকের পাশে দাঁড়ান।

সহযোগী অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
faridecoru@yahoo.co.uk