কোভিড-১৯ এবং মানবজাতির জন্য নিরাপত্তা হুমকি

প্রকাশ: ০৫ মে ২০২০     আপডেট: ০৬ মে ২০২০   

এসএম মারুফ

স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে নব্বইয়ের দশকে' মানব নিরাপত্তা' বিষয়টি নিয়ে নীতিগত আলোচনা শুরু হয়। এই আলোচনার ধারাবাহিকতায় ১৯৯৪ সালে জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি)-এর' মানবউন্নয়ন প্রতিবেদন-১৯৯৪'-এ 'মানবনিরাপত্তা' ধারণাটিকে প্রথম কাঠামোবদ্ধ করা হয়।


এই প্রতিবেদনে মানব নিরাপত্তাকে মানুষের বিকাশ ও উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য শর্ত হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ইউএনডিপি প্রদত্ত রিপোর্টে মানবনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের জন্য সাতটি ক্ষেত্রে বা উপাদানের নিরাপত্তার কথা বলা হয়েছে, যেগুলোতে নীতিনির্ধারকদের আরো বেশি গুরুত্বারোপ ও বিনিয়োগক রতে হবে।


ক্ষেত্রগুলো হলো: অর্থনৈতিক নিরাপত্তা,খাদ্যনিরাপত্তা, স্বাস্থ্য নিরাপত্তা,পরিবেশগতনিরাপত্তা, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, গোষ্ঠী নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক নিরাপত্তা।মানব নিরাপত্তার জন্য উল্লেখিত সাতটি ক্ষেত্র অনেক বিস্তৃত মনে হতে পারে, কিন্তু বর্তমান বিশ্বসঙ্কট সবগুলোকেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করছে।


রাষ্ট্রকেন্দ্রিক বা সামরিক বা প্রথাগত নিরাপত্তাকে মানবনিরাপত্তা কখনো চ্যালেঞ্জ করেনা বা একটি অন্যটির প্রতিদ্বন্দ্বি নয়। তবে, রাষ্ট্রকেন্দ্রিক নিরাপত্তা থেকে মানব নিরাপত্তা একেবারেই আলাদা। রাষ্ট্রকেন্দ্রিক নিরাপত্তা বহিঃরাষ্ট্রের হুমকি ও আক্রমণ থেকে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করে, অন্যদিকে অপ্রথাগত নিরাপত্তা হিসেবে' মানবনিরাপত্তা' রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে মানুষের বিকাশ, উন্নয়ন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে থাকে।


শুধু জিডিপি'র সংখ্যাভিত্তিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও প্রথাগত নিরাপত্তার পেছনে বিলিয়ন-ট্রিলিয়ন ডলার খরচের মাধ্যমে রাষ্ট্রগুলোর মানবনিরাপত্তা নিশ্চিত করা যে সম্ভব নয়, তা অতীতে ঘটে যাওয়া অর্থনৈতিক মহামন্দা এবং মহামারি গুলোর মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে।


কোভিড-১৯-এর প্রকোপে বিপর্যস্ত বিশ্ব আরো একবার প্রত্যক্ষ করলো যে, অপ্রথাগত নিরাপত্তাকে উপেক্ষা করে মানুষ এবং সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করা কখনো সম্ভব নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলার জন্য বিশ্বব্যাপী রাষ্ট্রগুলো পরিবেশ খাতকে পূর্বের চেয়ে অগ্রাধিকার দিলেও স্বাস্থ্য খাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না করার পরিণতিতে করোনাভাইরাসের ভয়াবহ প্রভাব থেকে তাদের জনগণকে সুরক্ষিত রাখতে পারছেনা।


উপরন্তু, যে রাষ্ট্রসমূহ সামরিক নিরাপত্তাখাতে বিলিয়ন-ট্রিলিয়ন ডলার খরচের মাধ্যমে তাদের দেশ ও জনগণকে সুরক্ষিত রাখার চেষ্টা করে সেগুলোই আজ বেশি শোচনীয় অবস্থায় আছে।


করোনাভাইরাস প্রথম শনাক্ত হয় ২০১৯ সালের ডিসেম্বরমাসে চীনের হুবাই প্রদেশের উহানে।যদিও শুরুতে কোভিড-১৯ চীনকে কঠোরভাবে আঘাত করেছিল, তবে এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল ইউরোপ ও আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় এই ভাইরাস সংক্রমণের দমনে এগিয়ে আছে।এই ভাইরাস কোনো সীমানামা নছেনা, এ পর্যন্ত ২১৩টি দেশ ও অঞ্চলের মানুষকে আক্রান্ত করেছে। এর প্রভাব নির্দিষ্ট কোনো অঞ্চলে নয় বরং সর্বত্রই পড়ছে। বিশ্বব্যাপী এই ভাইরাসের প্রভাবগুলোকে মানবনিরাপত্তা সঙ্কটের উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।


মানবনিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য নিরাপত্তার পারস্পরিক নির্ভরশীলতা ব্যাখ্যা করার জন্য প্রাসঙ্গিক সবকিছুই আমরা করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের সময় খুঁজে পায়। কোভিড-১৯ স্বাস্থ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে যে হুমকি তৈরি করছে এর প্রভাব মারাত্মক ভাবে পড়ছে অন্য উপাদানগুলোর ওপর, বিশেষভাবে অর্থনৈতিক ও খাদ্য নিরাপত্তার ওপর।


করোনাভাইরাসের প্রকোপ শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত অধিকাংশ দেশেরই উৎপাদন প্রক্রিয়া ও বাণিজ্য প্রায় স্থবির, অফিস-আদালত বন্ধ বা অত্যন্ত সীমিত পর্যায়ে কার্যক্রম চালাচ্ছে। বন্ধ এবং লকডাউন পণ্য ও পরিষেবা উভয় শিল্পকেই নেতিবাচকভাবে প্রভাবিতকরছে। উন্নত কিংবা উন্নয়নশীল সবদেশেরই দৈনিক ও নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর এই অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও খাদ্য ঘাটতির প্রথম ধাক্কাটা এসে পড়ছে। করোনার সময়ে বিভিন্ন দেশে চুক্তিভিত্তিক এবং নিম্ন বেতনের অনেক চাকরিজীবীকে ছাঁটাই করা হচ্ছে।


ফলস্বরূপ, জ্যামিতিক হারে বেকারত্বের সংখ্যা বাড়ছে।মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক চিত্রের মাধ্যমেই এর প্রমাণ পাওয়া যায়। করোনা প্রাদুর্ভাবের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে বেকারের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২২ মিলিয়নে। তাদের সবাই বেকার ভাতার জন্য আবেদন করেছেন। এরমধ্যে এক সপ্তাহেই প্রায় ৫.২ মিলিয়ন লোক বেকারভাতার জন্য আবেদন করেছেন (ওয়াশিংটন পোস্ট, ১৬ এপ্রিল, ২০২০)।


আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) আশংকা করছে ২০২০ সালে বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশ হ্রাস পেতে পারে, যা ১৯৩০-এর দশকের অর্থনৈতিক মহামন্দার পর সবচেয়ে খারাপ অবস্থা হবে। আইএমএফ প্রধান ক্রিস্টালিনাজর্জিয়েভা গত ১৬ এপ্রিল আন্তর্জাতিকমুদ্রা ও অর্থনৈতিককমিটি (আইএমএফসি)-এর মিটিংয়ের উদ্বোধনী বক্তৃতায় বলেছেন, এবছর ১৭০টি দেশ তাদের মাথা পিছু আয় কমে যেতে দেখবে, যা আমরা মহামন্দার পর আর দেখেনি। অথচ মাত্র কয়েক মাস আগের পরিকল্পনায় ও ধারণায় ছিল যে, এ বছর ১৬০টি দেশের মাথা পিছু আয় বৃদ্ধি পাবে। ভবিষৎ নিয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকদের উৎকন্ঠা এবং বিভিন্ন পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে যে, কোভিড-১৯ মহামারি এখন আর শুধু স্বাস্থ্য সঙ্কটই নয়, মানব নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ও মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।


এই সঙ্কটের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব থেকে বের হওয়ার জন্য শুধু ভ্যাকসিন আবিষ্কার বা চিকিৎ সাসমাধানই যথেষ্ট নয়। স্বাস্থ্য, অর্থনীতি,খাদ্য, রাজনীতি ও পরিবেশসবগুলো ক্ষেত্রেই বিবেচনায় নিয়ে স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। সরকারগুলোর উচিত কেবল রাষ্ট্রের নয়, জনগণের প্রয়োজনকে ও প্রাধান্য দিয়ে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিকনীতি প্রণয়ন করা।


বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিএইচও) এবং জাতিসংঘকে দেশ-রাষ্ট্র সমূহের প্রচেষ্টার সমন্বয় সাধনের এবং প্রযুক্তিগত সমাধান গঠনের মাধ্যমে এই মহাসঙ্কটের প্রভাবগুলো থেকে দ্রুত বের হওয়ার জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে।


সহকারি অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞানবিভাগ, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।


smmaruf84@gmail.com