প্রফেসর আনিসুজ্জামানের তিরোধানজনিত বেদনার নীল আভা মুছে যাবার আগেই আর একজন শীর্ষ মুক্তিযোদ্ধা আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। তিনি হলেন অধ্যাপক মমতাজ বেগম, তার অন্য পরিচয়টি ছিল আইনজীবী। মুক্তিযুদ্ধকালে তিনি পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য ছিলেন আর মৃত্যুর সময়ে ছিলেন জাতীয় মহিলা সংস্থার প্রধান। ক'দিন আগে খবর পেয়েছিলাম তিনি সামান্য জ্বরে ভুগছেন। অন্য কোন উপসর্গ ছিল না যাকে করোনা বলা যেতে পারে। ১৭ মে প্রথম প্রহরে তিনি আমাদের থেকে চির বিদায় নিলেন।

তার মৃত্যু খবর শুনলাম প্রায় শেষরাতে, সেহেরী খাবার সময়। থমকে গেলাম, ভালো করে খেতে পারলাম না, ঘুমাতে পারলাম না, তার স্মৃতি আমাকে তাড়িয়ে মারছে। সেই ষাটের দশকে তার সাথে পরিচয়। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ও উনি কুমিলতা মহিলা কলেজে ডিগ্রি ক্লাশে পড়তেন। বয়সে ও ক্লাশের বিবেচনায় তিনি আমাদের সিনিয়র ছিলেন বলে আমরা তাকে আপা বলেই সম্বোধন করতাম। তিনি বড্ড শান্তশিষ্ট, বিনম্র ও ধর্মানুরাগী ছিলেন। হিজাব ছিল তার ভুষনের অংশ ও চিরজীবনের সঙ্গী। তিনি কুমিলতা মহিলা কলেজে নির্বাচিত ভিপি ছিলেন। এটাও একটা অবিশাস্য ব্যাপার ছিল। কেননা, মহিলা কলেজ বরাবরই ছাত্র ইউনিয়নের করতলে বা নিয়ন্ত্রণে ছিল।

৬ দফার দাপটে যেমনটি সেকালের সরকারি ইন্টারমিডিয়েট কলেজে বিশাল সংখ্যক ভোটের ব্যবধানে শেখ হাসিনা ভিপি হয়েছিলেন, তেমনি মমতাজ বেগমও কুমিলতা মহিলা কলেজে ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। শেখ হাসিনা একই সালে রোকেয়া হলের ছাত্রী হয়ে এলেন। সে সময়ে অর্থাৎ ১৯৬৭ সালেই মমতাজ আপা, শেখ হাসিনা ও আরও কয়েকজনের উদ্যোগে ছাত্রলীগের প্রথম কমিটি রোকেয়া হলে গঠিত হয়। তখন রাজনীতি তো দূরের কথা, সামাজিক সংযোগও একটা কঠিন ব্যাপার ছিল। বঙ্গবন্ধু আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় নীত হলে সব নিশ্চুপ ও শুনশান হয়ে পড়েছিল। শুনশান হয়ে গেছিল ৩২ নম্বর শেখ মুজিবের বাড়ি। সে সময়ে মধ্যবিত্ত পর্দানশীল পরিবারের বোরকা পরা গ্রামীণ নারী মমতাজ বেগম কুমিলতায় ছাত্র রাজনীতি তথা ৬ দফা তথা স্বাধীনতার সংগ্রামে ওৎপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেলেন।

বিএ পাশ করে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে এমএ ক্লাশে ভর্তি হলেন। দু'বছর মেয়াদী কোর্সে ভর্তি হওয়ার পর আমরা তার সাথে যোগাযোগটা গতিশীল করতে পারলাম। আমাদের সবাই মানে কুমিলতা থেকে ঢাকায় আগত যারা ছাত্রলীগ রাজনীতিতে বড্ড সক্রিয় ছিলাম তাদের সবার সাথে মমতাজ আপার সখ্যতা গড়ে উঠলো। রেজা ভাই আমাদের সিনিয়র ছিলেন। জিলা স্কুলে সিনিয়র ছিলেন বলে জিলা স্কুল পড়ুয়াদের মধ্যে তার মান্যগন্যতা একটু বেশি ছিল। আমরা তখন স্বপ্নে বিভোর- শেখ মুজিবকে মুক্ত করতে হবে, ৬ দফা তথা এক দফাকে কায়েম করতে হবে। ১৯৬৬ সালের ৭ মে দীর্ঘ মেয়াদী জেলে যাবার আগেই শেখ মুজিব আমাদেরকে এই মন্ত্র দিয়ে গেলেন। শেখ মুজিবকে আমি মামা ও ফজিলাতুন্নেছা মুজিবকে মামী বলে সম্বোধন করতাম। শেখ ফজলুল হক মনি ও শেখ ফজলুল কবির সেলিমের সাথে সখ্যতার কারণে। ঢাকা এসে মমতাজ বেগমও এমনি আত্মীয়তা সুলভ সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। তিনিও মনি ভাইকে মনি ভাই বলতেন এবং শেখ মুজিব ও ফজিলাতুন্নেছাকে যথাক্রমে মামা ও মামী বলেই ডাকতেন।

বিবাহিত ছিলেন বলে তিনি রোকেয়া হলে থাকার আসন পাননি। থাকতেন প্রথমে সোসাল ওয়েল ফেয়ার হোস্টেলে, পরে গ্রীণ রোডে তার স্বামীর সাথেই দু'সন্তান নিয়ে বসবাস করতেন। ক্লাশও করতেন বাসা থেকে গিয়ে। আমরা রাজনীতির কারণেই তার বাসায় আসা যাওয়া করতাম। তার স্বামী হয়তো তার রাজনীতি অপছন্দ করতেন। এ কারণে মুক্তিযুদ্ধে মমতাজ আপা যোগ দিলেও তার স্বামী বাঙালি সেনা ব্যক্তিত্ব হয়েও শত্রু কবলিত বাংলাদেশেই রয়ে গেলেন। রাজনীতি ও মুক্তিযুদ্ধের কারণে তাদের বিবাহবন্ধন ছিন্ন হয়েছিল। রোকেয়া হলে থাকলেও মমতাজ আপা হল সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন এবং আমাদের শিল্প ও সাহিত্য সংঘের ব্যাপারে যথেষ্ট সাহায্য করেছিলেন।

মমতাজ আপা আমাদের মতই স্বাধীনতা আন্দোলনে তথাকথিত নরমপন্থীদের দলে ভিড়ে গিয়েছিলেন। মনে পড়ছে ৭০ সালের ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সম্মেলনের কথা, সেদিন আমাদের বিরুদ্ধবাদী তথাকথিত চরমপন্থীরা মমতাজ আপাকে হেনস্তা করতে এলে আমি চেয়ার তুলে তা প্রতিহত করেছিলাম। মায়ের মতো একজন মহিলার প্রতি তাদের দুর্ব্যবহারের প্রতিবাদে আমি হাতে চেয়ার নিয়ে মারামারিতে উদ্ধত হয়েছিলাম। আমাদের বিরুদ্ধে নরমপন্থীর নামাবলী সেটে দেয়া হলো। আসলে এই নরমপন্থী বা চরমপন্থী সৃষ্টিটা ছিল বঙ্গবন্ধুরই চিন্তার ফসল এবং সুদূর প্রবাসী লক্ষ্যার্জনের জন্যে। ছাত্রলীগে তথা প্রতিটি ছাত্র সংগঠনে সব সময় ব্যক্তি বা আদর্শভিত্তিক দুটো ধারা বহমান ছিল। ছাত্রলীগের এমনি দু'ধারার সৃষ্টি ও বিদ্যমানতা আমি ১৯৬২ সালেই দেখেছি। শাহ মোয়াজ্জেম ও শেখ ফজলুল হক মনি, দু'ধারায় বিভক্ত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধকালে দেখা গেল নরমপন্থী বা স্বায়ত্বশাসনপন্থীরাই আবির্ভূত হলেন অতি চরমপন্থী ও নিবেদিত হিসেবে। তথাকথিত নরমপন্থীদের নেতা ছিলেন শেখ মনি এবং মমতাজ আপাসহ আমরা ছিলাম তার অনুসারী। বঙ্গবন্ধু ছাত্রলীগের এই পরিকল্পিত বিভক্তি দিয়ে পাকিস্তান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বিভ্রান্তি করতে সক্ষম ছিলেন যে তিনি বিচ্ছিন্নতাবাদী বা সমাজতন্ত্রী ছিলেন না। আর সুযোগে তিনি নিয়মতান্ত্রিক ও সমস্ত কার্যক্রম অন্তিম লক্ষ্য স্বাধীনতা অর্জন।

স্বাভাবিকভাবে মমতাজ আপা আমাদের বলয়ে থাকা হেতু আমাদের মতই আচরণে অভ্যস্ত ছিলেন। সে কারণে বিরুদ্ধবাদী কতিপয় ছাত্র সম্মেলনের দিন অশোভন আচরণ করেছিল। আমি চেয়ার উঁচিয়ে ও আস্তিন গুটিয়ে তার জবাব দিয়েছিলাম। সেদিন থেকেই আমাদের সম্পর্কে গভীরতা বাড়তে শুরু করলো। তার বাসাটা আমাদের একটা আখড়া হিসেবে গড়ে উঠতে লাগলো। সত্তরের নির্বাচনে মমতাজ আপা ৭টি সংরক্ষিত নারী আসনের একটি থেকে এমএনএ হলেন।

২৫ মার্চের প্রথম ধাক্কাটা সামলিয়ে প্রতিরোধ যুদ্ধের যৌক্তিক সমাপ্তি টেনে আমরা সীমান্ত অতিক্রম করলাম। সীমান্ত অতিক্রমের পর মমতাজ আপা, মনি ভাই, প্রাণ গোপাল ও রেজা ভাই মিলে বিশাল গড়ে একটা কুড়েঘর রূপী বাড়ি ভাড়া নিলেন, যুদ্ধের শুরুতে তিনি বা তারা কিভাবে জনরোষ থেকে কর্ণেল ওসমানীকে উদ্ধার করেছিলেন সে ঘটনা জানার পর আমি একদিন বিশালগড়ে তাদের বাসায় গেলাম। সৌভাগ্যক্রমে একদিন রাতের বেলা ওসমানি সাহেবের সাথে তার বাড়িতেই আমার দেখা হয়েছিল এবং তার সাথে মুজিব বাহিনী নিয়ে কথাবার্তায় উক্ত বাহিনী সম্পর্কে তার কোন উষ্মা বা বিরক্তির ভাব দেখিনি।

আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার, সামান্য কিছু কাপড়-চোপড় ও অল্প কিছু টাকা হাতে নিয়ে আমি সীমান্ত অতিক্রম করেছিলাম। আমার থাকার ব্যাপারটা ছিল যেখানে রাত সেখানে কাত। খাবার যোগাতে পারতাম সামান্য। মমতাজ আপার বাসায় যেয়ে দেখলাম তারা তাদের কুয়ারূপি পুকুরটাতে জাল ফেলে মাছ ধরছে। আমিও লেগে গেলাম। রান্নাবান্না হলো, পেট ভরে তৃপ্তি নিয়ে খেলাম। আমি বড় ঘর কাতুরে ছিলাম, বিশেষতঃ বিধবা মায়ের জন্য প্রাণটা আনছান করতো। মমতাজ আপার মাতৃসুলভ আচরণে বিমুগ্ধ ছিলাম। তখন থেকে সম্পর্কের নতুন মাত্রা ও তার গভীরতা আমৃত্যু ছিল।

আগেই বলেছি, বিশালগড়ের এই বাড়িতে মমতাজ আপা ছাড়া আরো থাকতেন তার দুই পুত্র সন্তান, দুই ভাই আজিজ ও ফজলু এবং উদ্বাস্তু মা-বাবা। মনি ভাই এখান থেকে যেয়ে গতাস ফ্যাক্টরির মুজিব বাহিনীর বেইজ ক্যাম্পে অফিস করতেন। অফিসে মনি ভাইয়ের সাথে আমিসহ অন্যান্য সহকারী থাকলেও বিশাল গড়ে তাকে সহায়তা করতেন প্রাণ গোপাল দত্ত, মমতাজ বেগম ও সৈয়দ রেজাউর রহমান। শেষোক্ত জনের পদবী ছিল স্টুডেন্ট লিয়াঁজো অফিসার। প্রধান কাজ ছিল যুদ্ধ প্রশিক্ষাণার্থীর সরবরাহ। আমার প্রথম দিকের কাজ সংজ্ঞায়িত ছিল না। আমি প্রথমে তাই বাংলাদেশ পত্রিকার সম্পাদক, প্রকাশক ও কলাম লেখকের দায়িত্ব নিলাম। পত্রিকা প্রকাশের ধারনাটা রেজা ভাই, মমতাজ আপা ও সম্ভবতঃ মাইনুল, রম্নস্ত্মম ও পাখীর ছিল। অর্থায়ন ছিল অনেকের তবে অলিখিত প্রকাশক ছিলেন মমতাজ আপা। তিনি সরকারি কিছু দায়িত্বও পালন করতেন; শরণার্থী ক্যাম্পের দেখভাল করতেন।

স্বাধীন দেশে মমতাজ আপাকে ঘিরে অনেক কথা আছে। একসাথে বহু কাজ, যার মাঝে আছে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বিরোধী আন্দোলন এবং ঘাতক দালাল যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবাদ বিরোধী আন্দোলন। আমি যখন বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব পরিষদ গঠন করি, তখন থেকেই তিনি তার উপদেষ্টার দায়িত্বে ছিলেন। বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব স্মারক গ্রন্থ প্রণয়নে আমাকে সাহায্য করেন।

শেখ হাসিনার আমলে এলে তিনি দীর্ঘকাল জাতীয় মহিলা পরিষদের চেয়ারপারসনের দায়িত্ব পালন করেন। আমি সে সময় তাকে বঙ্গমাতার ওপর স্মারক গ্রন্থ প্রকাশে সহায়তা করেছি। তিনি আমাদের ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটির সফলতার ব্যাপারেও আগ্রহী ছিলেন। এক সময়ে তাদের একমাত্র কন্যা পিউলী আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় অবৈতনিক দায়িত্ব পালন করেছেন।

একে একে নিভেছে দেউটি। আল্লাহ মমতাজ আপাকে বেহেশতে নছিব করুক, এ আমার কামনা।

লেখক: শিক্ষাবিদ, মুক্তিযোদ্ধা; উপাচার্য, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ