জাতিসংঘের উদ্যোগে প্রতিবছর ২৬ জুন সারা বিশ্বে 'মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস’ পালিত হয়। এই বছরে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক এই দিবসটি পালনের গুরুত্ব অনেক বেশি, কারণ করোনাভাইরাস কভিড-১৯-এর এই মহামারির সঙ্গে ধূমপান ও মাদকের ঝুঁকিপূর্ণ সম্পর্কের কথা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছে। বাংলাদেশ মাদক উৎপাদনকারী দেশ না হয়েও মাদকদ্রব্যের অবৈধ প্রবেশের ফলে আমাদের তরুণ ও যুবসমাজ মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। বাংলাদেশে জনসংখ্যার ৪৯ শতাংশ মানুষ বয়সে তরুণ। অর্থাৎ দেশে কর্মক্ষম জনসংখ্যা ১০ কোটি ৫৬ লাখ। মাদকের ব্যবসায়ীরা এই কর্মক্ষম তরুণ জনগোষ্ঠীকে মাদকের ভোক্তা হিসেবে পেতে চায়। সরকার ইতোমধ্যে মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করছে এবং প্রধানমন্ত্রী মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছেন।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) আইন-২০১৮-এর খসড়া/প্রস্তাবিত আইন সংশোধন; সময়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ইতোমধ্যে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৮ প্রণীত হয়েছে এবং আইনটি এরই মধ্যে কার্যকর হয়েছে। নতুন এ আইন মাদক ব্যবসার নেপথ্যে ভূমিকা পালনকারীদের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। এ আইনে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সঙ্গে পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবিসহ অন্য বাহিনীগুলোও এখন মাদক নির্মূলে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়, যে কারণে কমে এসেছে মাদকের চোরাচালান ও ব্যবহার।

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে এইচআইভি বা এইডস আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রায় ১৩ হাজার। এসব রোগীর মধ্যে এ পর্যন্ত শনাক্ত হয়ে চিকিৎসার আওতায় এসেছেন মাত্র পাঁচ হাজার ৫৮৬ জন। এখনও শনাক্তের বাইরে রয়ে গেছেন সাত হাজার ৪১৪ জন। সরকারের রোগতত্ত্ব রোগ নিয়ন্ত্রণ গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় শিরায় মাদক গ্রহণকারীদের মধ্যে সংক্রমণের হার ২২ শতাংশ।

আমাদের দেশে নারীদের মধ্যেও মাদকাসক্তের সংখ্যা বাড়ছে। এটা উদ্বেগের কারণ। নারী আসক্তদের ৯০ ভাগের বয়স ১৫-৩৫ বছরের মধ্যে। বাদবাকি ৩৫-৪৫ বছরের মধ্যে। মাদকাসক্তদের মধ্যে শতকরা পাঁচজন নারী। তাদের মধ্যে ছাত্রী, গৃহিণী, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী রয়েছেন।

শুধু ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশ মাদক উৎপাদনকারী দেশ না হওয়া সত্ত্বেও পার্শ্ববর্তী দেশগুলো থেকে চোরাচালানের মাধ্যমে এদেশে মাদক প্রবেশ করে। ভৌগোলিকভাবে গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। রূপকল্প ২০২১-এর লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ও ২০৪০ সালে বাংলাদেশকে উন্নত দেশে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। ভবিষ্যৎ যুবসমাজকে সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে মাদকমুক্ত পরিবেশে বেড়ে ওঠার সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে হবে। দেশকে মাদকমুক্ত করার জন্য প্রয়োজন ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি, বিশেষ করে ছাত্রসমাজকে টার্গেট করে মাদকবিরোধী প্রচারের কাজ করতে হবে ঐক্যবদ্ধভাবে।  আমাদের সংগঠন ‘মানস’ দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে এদেশে যুবসমাজের মধ্যে মাদকবিরোধী সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

মাদকাসক্তির পেছনে বিজ্ঞানী ও গবেষকরা বিভিন্ন কারণ চিহ্নিত করেছেন। কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো-

১. সমবয়সীদের চাপ, ২. হাতের কাছে মাদকদ্রব্য পাওয়া অর্থাৎ মাদকের সহজলভ্যতা, ৩. বেকাত্ব ও কর্মক্ষেত্রে ব্যর্থতা, ৪. আর্থসামাজিক অস্থি’রতা, ৫. মাদকের কুফল সম্পর্কে অজ্ঞতা, ৬. সমাজে ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, ৭. পারিবারিক কলহ, ৮. চিকিৎসাসৃষ্ট মাদকাসক্তি, ৯. কৌতূহল, ১০. ধূমপান ইত্যাদি।

ধূমপান করোনায় আক্রান্তের ঝুঁকি ১৪ গুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে তোলে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বারবার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন যে, ধূমপায়ী বা তামাক এবং মাদকসেবীরা নানা রকম স্বাস্থ্য সমস্যাসহ জটিল ও কঠিন রোগাক্রান্ত হয়ে থাকে বিধায় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত এবং প্রাণহানির ঝুঁকিতে শীর্ষে অবস্থান করছে। কারণ হিসেবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, সিগারেট বা গাঁজা সেবনে হাতের আঙুলগুলো ঠোঁটের সংস্পর্শে আসে এবং ফলে হাতে (বা সিগারেটের ফিল্টারে) লেগে থাকা ভাইরাস মুখে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেকাংশে বেড়ে যায়। এ ছাড়া ধূমপায়ীদের ফুসফুসের কার্যক্ষমতা কমে যায় ও ফুসফুসের দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও বেশি, যা কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। করোনাভাইরাস যেমন আমাদের ফুসফুসকে সংক্রমণ করে তেমনি ধূমপান বা ই-সিগারেট কিংবা সিসা সমানভাবে আমাদের ফুসফুসকে সংক্রমণ করে। ফলে করোনাভাইরাস সংক্রমণ ও ধূমপান বা ই-সিগারেট, গাঁজা, হেরোইন, কোকেন ও সিসার মাধ্যমে ফুসফুস সংক্রমিত হয়। সেই কারণে তাদের রোগাক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভেন্টিলেটরে থাকার ঝুঁকি অন্যান্য অধূমপায়ীর তুলনায় অনেকগুণ বেশি। করোনা সংক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে আমরা যেমন মাস্ক ব্যবহার করি, হাত সাবান দিয়ে ২০ সেকেন্ড ধুই এবং সেইসঙ্গে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখি তেমনি অন্যান্য ঝুঁকি থেকেও আমাদের দূরে থাকতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, জীবন ব্যবস্থার পরিবর্তন করা এখন জরুরি।

সুতরাং, করোনাভাইরাসের আত্রক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে ধূমপায়ী ও মাদকাসক্তদের নেশা ত্যাগ করার জন্য চিকিৎসার মাধ্যমে (কাউন্সিলিং/রিহ্যাব) সুস্থ করা এখন সময়ের দাবি। আজকের দিনে এই আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক: প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, মানস