আজীবন সংগ্রামী এম এ রকীবের নিরব প্রস্থান

প্রকাশ: ০২ জুলাই ২০২০     আপডেট: ০২ জুলাই ২০২০   

এম এম রাসেল

এ দেশের মাটি ও মানুষের রাজনীতিকের নাম এম এ রকীব। ভাষা সংগ্রামী ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক এই নেতা আজীবন পেয়েছেন মানুষে নিবিড় ভালোবাসা। তাঁর জন্মই যেন হয়েছিলো দেশমাতৃকা আর নিগৃহীত মানুষের কল্যাণে, সাম্য আর মৈত্রীর জন্য। জীবন সায়াহ্নে এসে তিনি গত ২৬ জুন দিবাগত রাতে ৯২ বছর বয়সে নওগাঁ শহরের বাসভবনে মৃত্যুবরণ করেন।

এম এ রকীবের সাথে আমার পরিচায়টা করে দিয়েছিলেন কবি আতাউর রহমান। আমি তাঁর দৌহিত্র। ১৯৮৫ সাল হবে। তিনি এম এ রকীবের বাড়িতে যাবেন। আমাকে সঙ্গে নিলেন। গেলাম। পরিচয় করে দিলেন। তারপর তাঁরা দু'জনে গল্প শুরু করলেন। এটাই ছিলো এম এ রকীবের প্রথম দর্শন ও পরিচয়। আকর্ষণীয় চেহারর অধিকারী ছিলেন তিনি। এরপর নানাভাবে তাঁর সাথে আরও যোগাযোগ বৃদ্ধি পেতে থাকে।

লড়াই সংগ্রামে এম এ রকীবের উদীপ্ত ভূমিকা মানুষকে প্রেরণা যুগিয়েছে। এই প্রবীণ মানুষটির নানা অজনা কথা শুনতে বিগত কয়েক বছর ধরে তাঁর জন্মদিনের আয়োজন করি। তিনি অবশ্য তাঁর জন্মদিনটা ঘটা করে উদ্‌যাপন না করতে বলেন। আমরা শুনিনি। কারণ একটি কথাও নতুন প্রজন্ম যদি জানতে পারে, কর্ণপাত করে, তাতেই সার্থকতা। অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে নওগাঁর একটি স্থানীয় সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন একুশে পরিষদ। তার পাশে সময়ে অসময়ে পাশে দাঁড়িয়েছে একুশে পরিষদ।

এম.এ. রকীব ১৯২৯ জন্মগ্রহণ করেন। বাবা তাহের উদ্দিন ছিলেন পেশায় ম্যাজিষ্ট্রেট। তিনি ১৯৪৭ সালে নওগাঁ কেডি স্কুল থেকে ম্যাট্রিক ও পরে কলকাতা থেকে পি.ইউ কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন। 

কলকাতা থাকাকালে রংপুরের মনিকৃষ্ণ সেন তাঁদের বাড়িতে আসতেন। তিনি কমিউনিস্ট আদর্শের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং ১৯৪৮ সালের দিকে রাজনীতির সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৫২ সালের নওগাঁ মহকুমায় ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। ১৯৫৩ সালের ১১ জানুয়ারি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সান্তাহারের জনসভার পর মফিজ উদ্দীন উকিল সাহেবের বাড়িতে এক বৈঠকে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হয়। তিনি এই সাংগঠনিক কমিটির সক্রিয় সদস্য ছিলেন।

১৯৫৩ সালে নওগাঁতে ২১ ফেব্রুয়ারি প্রথম বার্ষিকী তাদের নেতৃত্বে পালিত হয়। ১৯৫৪ সালে ৯২(ক) ধারা জারি হলে তার বিরুদ্ধে হুলিয়া হয় এবং তিনি আত্মগোপন করেন। তৎকালীন সরকার সম্পত্তি ক্রোক পরোয়ানা জারি করলে তিনি আত্মসর্ম্পণ করেন। ১৯৫৮ সালে তাঁদের বাড়ি আরেকবার সিল করা হয়। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ভগ্নি ফাতেমা জিন্নাহর নেতৃত্বে সম্মিলিত বিরোধী দল 'কপ' গঠিত হলে তিনিসহ বেশ ক'জন আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। 

তখন যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না থাকায় পায়ে হেঁটে নওগাঁ মহকুমার বিভিন্ন থানার প্রত্যন্ত্ম অঞ্চলে নির্বাচনী প্রচার চালিয়ে জনগণকে সংঘটিত করেন। ১৯৫৭ সালে ন্যাপ গঠিত হলে তিনি তার নেতৃত্বে চলে আসেন। তিনি ৬২'র শিক্ষা কমিশন বিরোধী আন্দোলনে ছাত্রদের পাশে ছিলেন, ৬৬-র ৬ দফা আন্দোলন এবং ৬৯ এর গণঅভুত্থানে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

মুক্তিযুদ্ধে চলাকালে এম এ রকীব ছিলেন তৎকালীন রাজশাহী জেলাভিত্তিক প্রশিক্ষণার্থী মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করার জন্য পশ্চিমবঙ্গে স্থাপিত ন্যাপ, ছাত্র ইউনিয়ন, কমিউনিস্ট পার্টির বালুরঘাট-বোয়ালদাড়, মালদা ও বহরমপুর ক্যাম্পের পরিচালক। বালুরঘাটে সিপিআই-এর সহযোগিতায় ক্যাম্প গড়ে তোলেন এবং প্রশিক্ষণ দেন।

এম এ রকীব নওগাঁ পৌরসভার প্রথম নির্বাচিত চেয়ারম্যান। ১৯৭৫ সালে নওগাঁ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে ১৯৭৬ সালে গ্রেপ্তার হন এবং এক বৎসর কারা ভোগ করেন। তিনি নওগাঁ জেলা ন্যাপের (মোজাফ্‌ফর) সভাপতি এবং কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি ছিলেন। ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব হিসেবে তাঁর সুনাম আছে। তিনি মহকুমা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। নওগাঁ ডায়াবেটিক সিমিতি, আস্তা মোল্লা কলেজ, ব্ল্যাড ব্যাংক তার প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠে। তিনি প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকে নওগাঁর ঐতিহ্যবাহী সংগঠন একুশে পরিষদের সাথে জড়িত। নওগাঁয় ভাষা আন্দোলনে অবদানের জন্য তাঁকে ১৯৯৮ সালে স্থানীয়ভাবে সম্মাননা প্রদান করা হয়।

এম এ রকীবের শেষ জীবনটাতে পাশে থাকতে পেরে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি। তিনি নিজে সারাটা জীবন মানুষের পাশে ছিলেন। তার শূন্যতা পুরণ হবার নয়।

লেখক : সাধারণ সম্পাদক, একুশে পরিষদ নওগাঁ।

বিষয় : এম এ রকীব