করোনাকালে খাবারে সতর্কতা

প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২০     আপডেট: ০৮ জুলাই ২০২০   

ড. মো. শহিদুল কবির

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

২০১৯ সালের শেষের দিকে চীনের উহান শহরে কভিড-১৯ এর সংক্রমণ শুরু হয়, যা দ্রুতই গোটা বিশ্বে বিস্তার লাভ করে। পরবর্তিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই রোগটিকে মহামারি হিসাবে আখ্যায়িত করে। এই ভাইরাসটি বাদুর থেকে মানুষে সংক্রমিত হয়ে বিশ্বব্যাপী সংকটের সৃষ্টি করেছে। এমন সংকট আগে কখনো দেখা যায়নি।  বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী বিশ্বের বেশির ভাগ দেশেই সামাজিক দূরত্ব (সোশ্যাল ডিসটেন্স) মেনে চলা হচ্ছে। করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রে সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কিন্তু এই পদ্ধতির কারণে একদিকে যেমন সংক্রমণ ঝুঁকি কমেছে, অন্যদিকে অনেক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পর্যটন শিল্প এবং সামাজিক অনুষ্ঠানাদি ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। চাকুরিজীবীদের অনেকেই বাসায় বসে অফিস করছেন। কিন্তু খাদ্যদ্রব্যসহ অন্যান্য পণ্য উৎপাদন ও বিপণনের সঙ্গে জড়িত মানুষদের পক্ষে সামাজিক দূরত্ব পুরোপুরি মেনে চলা সম্ভব নয়। কভিড-১৯ মোকাবিলায় এই মানুষদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা খুবই জরুরি। 

খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সকল ফুড ইন্ডাস্ট্রিতে ‘ফুড সেফটি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ (এফএসএমএস) থাকবে যা ‘হ্যাজার্ড এ্যানালাইসিস এন্ড ক্রিটিক্যাল কন্ট্রোল পয়েন্ট’ (এইচএসিসিপি)-এর ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হবে। এই এফএসএমএস এর আওতায় যে বিষয়গুলো অত্যাবশ্যকীয় তার মধ্যে স্বাস্থ্যসম্মত আচরণ, পরিছন্নতা, প্রয়োজনে খাদ্য উৎপাদন অঞ্চল অনুযায়ী পৃথকীকরণ, খাদ্য প্রস্তুতকারকদের সুস্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলা, খাদ্য সংরক্ষণ, সরবরাহ এবং বিতরণ।  

যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব এগ্রিকালচারের (ইউএসডিএ) একটি প্রতিবেদন থেকে এটি প্রতিয়মান হয় যে সার্স-কোভ-২ খাদ্য এবং খাদ্য প্যাকেজিংয়ের মাধ্যমে সংক্রমিত হয় না। জার্মানির ফেডারাল ইনস্টিটিউট অব রিস্ক অ্যাসেসমেন্টও একই অভিমত ব্যক্ত করেন। তবে এই ভাইরাসটি যে কোন ধরনের সংক্রমিত পৃষ্ঠ থেকে ছড়াতে পারে, যেটা হতে পারে কোনো প্লেট, কাপ, চামচ, টেবিল ইত্যাদি। যেহেতু ভাইরাসটি সল্প সময়ের বেশি জীবিত বাহকের বাইরে বেঁচে থাকে না তাই এই ধরনের সংক্রমন হতে হবে এই অল্প সময়ের মধ্যেই, নতুবা ভাইরাসটির মৃত্যু ঘটবে। যদিও ভাইরাসটি প্রথমিকভাবে বাদুর থেকে মানুষে সংক্রমিত হয়েছিল কিন্তু তা মাংস জাতীয় খাবারের মাধ্যমে সংক্রমিত হতে পারে না। আমরা নিত্যদিন যে সকল  প্রাণীজ পণ্য খাই বা ব্যবহার করি তার মাধ্যমে এই ভাইরাসটি ছড়াতে পারেনা। যদি কোনোভাবে প্রাণীতে ভাইরাসের সংক্রমণ হয়, সেই প্রাণীর মাংস থেকে নিরাপদ খাদ্য প্রস্তুত করারও উপায় রয়েছে। আয়ারল্যান্ডের ফুড সেফটি অথরিটির মতে, খাবার ভাল ভাবে রান্না করে খেলে, ১৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ৬০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় ৩০ মিনিটের জন্য রান্না করলে খাবারটি করোনাভাইরাস মুক্ত হবে। 

কভিড-১৯ মহামারির সময় লকডাউনের কারণে মানুষের জীবন ধারা যেমন বদলে যায় সেই সঙ্গেও বদলে যায় মানুষের খাবারের ধরন। সবাই চেষ্টা করে বেশি করে বাজার করে রাখতে, যাতে বেশ কিছুদিন চলা যায়। তাই কিছুটা ভিড় বেড়ে যায় বাজার ঘাটেও। কিন্তু এতে ভুলে গেলে চলবে না যে নিজেদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি কমাতে কমপক্ষে এক থেকে দুই মিটার দূরত্ব মেনে চলতে হবে। বাজার বা দোকানের প্রবেশপথে বিভিন্ন স্যানিটাইজার ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে সাধারণ মানুষ নানারকম স্যানিটাইজারের ভিন্ন ভিন্ন ব্যবহার সম্পর্কে জানতে পারবে। যেমন-এ্যালকোহল বেসড স্যানিটাইজার বা যে কোনো ধরনের সাবান হাত ধোয়ার জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। অন্য সব স্যানিটাইজার যেমন ডেটল, ব্লিচিং পাউডার সলুউসন (০.১%) যে কোনো ধরনের পৃষ্ঠতলে ব্যবহার করা যেতে পারে। এখানে উল্লেখ্য যে স্যানিটাইজারগুলো সরাসরি খাদ্য দ্রব্যে এবং ত্বকে ব্যবহারের জন্য স্বাস্থ্যকর নয় বিধায় এড়িয়ে চলাই উত্তম হবে। 

রেস্তোরার ব্যবস্থাপনা এই সংক্রমণকালে কিছুটা জটিল হবে। খাবার আইটেমগুলো উচ্চ তাপমাত্রায় রান্না হলেও রেস্তোঁরার অসুস্থ কর্মচারী বা কর্মকর্তাদের থেকে এই রোগ সংক্রমণের আশঙ্কা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে অসুস্থ হওয়ার কারণে কর্মচারী বা কর্মকর্তারা নিরবে রোগ ছড়াতে পারে অথবা লোকবলের অভাবে অসুস্থ  হওয়া সত্তেও ছুটি না পাওয়ার কারণে এই ধরনের সংক্রমণ বাড়তে পারে। যদি রেস্তোঁরাটি অভিজাত এলাকায় অবস্থিত হয়, যেখানে রোগের বিস্তার হয়নি তাহলে সেটি অন্যান্য সংক্রমিত এলাকা থেকে নিরাপদ হবে। কিন্তু এটা মনে রাখা দরকার যে, যেসব ক্রেতা খাবার কিনতে আসছেন তারা বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা এবং তাদের স্বাস্থ্যের অবস্থাও ভিন্ন।  

সুতরাং নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার জন্য প্রতিটি খাদ্য ব্যবসায় এফএসএমএস/এইচএসিসিপি টিম তৈরি করে খাদ্য সামগ্রী নিরাপদ রাখার নিমিত্তে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। প্রয়োজনে তারা নিরাপদ খাদ্য অধিদপ্তরের সাথে যোগাযোগ করে সাহায্য চাইতে পারেন। দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে সকল খাদ্য ব্যবসায়ীর এই নীতিমালা মেনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া উচিত, যাতে করে খাদ্য উৎপাদনে পরিষেবা দানকারীদের সার্স-কোভ-২ থেকে সুরক্ষা দেওয়া য়ায় এবং এর মাধ্যমে এই মরণঘাতি ভাইরাসের বিস্তার রোধ করা সম্ভব হয়।  

লেখক: অধ্যাপক, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ, স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ