সিরাজ-ক্লাইভ দ্বৈরথ এখন পশ্চিমে?

প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২০     আপডেট: ০৮ জুলাই ২০২০   

নাহিদ হাসান

নাহিদ হাসান

নাহিদ হাসান

চীন, ভারত ও পারস্য বিশ্বের মোট জিডিপির ৮১-৮২ ভাগের অধিকারি। তারই মধ্যে বাংলা আবার শীর্ষে, সবচেয়ে সম্পদশালী। পৃথিবীর কেন্দ্র। যার কৃষিব্যবস্থা ছিল সর্বোৎকৃষ্ট। কারিগরী জ্ঞান-দক্ষতাও ছিল পৃথিবীর সেরা। আর বৃটিশ-ওলন্দাজদের দেশ শীত প্রধান। উৎপাদনহীন। ১৭৭০ সালে আলেক্সাণ্ডার ডো এর কারণ হিসেবে বলছেন, 'বাংলার নবাবরা দেশের নাড়ি-নক্ষত্র ভালভাবে জানতেন। ফলে তারা শাসনযন্ত্রের মাধ্যমে অত্যাচারী হয়ে ওঠেননি। জানতেন তাদের নিজেদের ক্ষমতার ও শক্তির উৎস হল প্রজারা।' 

বিশ্বের সবচেয়ে সম্পদশালী দেশটি কিভাবে পলাশীর চক্রান্তের ১৫-২০ বছরের মাথায় মন্বন্তরের মুখে পড়ল?

১৭৭৩ সালে ইংলণ্ডের কমিটি অব দ্য হাউস অব কমন্স এর রিপোর্টের তৃতীয় খণ্ডের ৩৬৭-৩৭০ পৃষ্ঠাব্যাপী কোম্পানির কর্মচারীদের লুঠের তালিকা জেমস মিল তাঁর বইতে প্রকাশ করেন। বাৎসরিক ৫-৪০ পাউণ্ড বেতনের কর্মচারিরা যে লক্ষ লক্ষ পাউণ্ড পাচার করেছেন। ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় প্রাইভেট মিউজিয়ামটি রবার্ট ক্লাইভের। যেখানে নবাব সিরাজের পালকি পর্যন্ত আছে। এই লুঠকারীদের নিয়ে ১৯২৫ সনে জেমস হোলজম্যান 'নবোবস ইন ইংলণ্ড' লিখেছেন। এই চোর-ডাকাতদের শানশওকত দেখে ইংলণ্ডে এদের বিকৃত করে নবাব উপাধী দেয়া হয়। ব্যবসা বাণিজ্যে স্বাভাবিক নিয়মের বদলে জুলুম নিয়ামক হল। ভূমির মালিকানা কৃষকের হাত থেকে জমিদারের হাতে চলে গেল। কারিগর ও তাঁতির হাত থেকে কাঁচামাল ও বাজার গেল। তাঁতির মুনাফা ৩৩ শতাংশ থেকে ৬এ নামল। ২ লক্ষ কারিগরের ঢাকা জনশূন্য হল। এইভাবে সংগঠিত-অসংগঠিত পথে বাংলা শ্মশান হল। স্রেফ নাই হল মন্বন্তরে এক-তৃতীয়াংশ মানুষ। আর ১৭৮০ সালে প্রথম কাপড়ের কল বসল ইংলণ্ডে। বাংলা লুঠের অর্থ দিয়ে ভারত-চীন দখলের দিকে এগিয়ে গেল। অথচ পলাশী চক্রান্তের আগে বৃটিশ কোম্পানি ১শ বছর কী ছিল! তবুও বৃটিশদের প্রতি মুগ্ধতার শেষ নাই। কেন?

২.

'ভারতবাসীগণের পরম সৌভাগ্য যে, তাহারা ভগবৎ কৃপায় সমগ্র ইংরেজ জাতির রক্ষণাবেক্ষণে রহিয়াছে, এবং ইংলণ্ডের রাজা, ইংলণ্ডের লর্ডগণ ও ইংলণ্ডের পার্লামেন্ট ভারতবাসীর জন্য আইন প্রণয়নের কর্তা...সম্পত্তির(ভূসম্পত্তির) উপর ব্যক্তিগত অধিকারের যে ব্যবস্থা(চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত) বর্তমানে রহিয়াছে তাহা কোন প্রকারেই লঙ্ঘন করা উচিত নহে।' -বলেছেন রাজা রামমোহন রায়। অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের ভাষায়, রংপুর কালেক্টরেটের কেরাণী হিসেবে ৪০ টাকা বেতনের চাকুরি করে ৬ বছর পরে ১০ হাজার টাকা দিয়ে যিনি জমিদারী কেনেন, তিনি তো সেই ব্যবস্থার পক্ষে ওকালতি করবেন, এ আর আশ্চর্য কি!

'শুভ সমাচার, বড় শুভ সমাচার/ পুনর্বার হইয়াছে দিল্লী অধিকার।/ জয় হোক বৃটিশের, বৃটিশের জয়/ রাজা অনুগত যারা, তাদের কি ভয়।/...হ্যাদে কি শুনি বাণী, ঝাঁসির রাণী ঠোঁটকাটা কাকি/ মেয়ে হয়ে সেনা নিয়ে নিয়ে, সাজিয়াছে নাকি?/ নানা তার ঘরের ঢেঁকি, মাগি খেঁকী।' দিল্লীর যুদ্ধ, ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত। অন্যদিকে বাংলা নবজাগরণের আরেক পুরুষ সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিম চট্টোপাধ্যায় বলছেন, 'ইংরেজ ভারতবর্ষের পরোমপকারী। ইংরেজ আমাদিগকে অনেক নতুন কথা শিখাইতেছে।' যে কৃষকবিরোধী, কারিগরবিরোধী ভূমিব্যবস্থা থেকে নবজাগরণের নেতা-কর্মিদের জন্ম, তারা ১৮৫৭'র প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরুদ্ধে দাঁড়াবেন এটাই স্বাভাবিক। 

৩.

অঞ্চলভিত্তিক বিকেন্দ্রীভূত উৎপাদন-ব্যবস্থা এবং বিশাল উদ্বৃত্ত বিপুল বাণিজ্য চালানোর কাজ কি ব্যাপ্ত দক্ষ কর্মি ও বিশাল জ্ঞানচর্চার পরিবেশ ছাড়া সম্ভব? ১৮০১ থেকে ১৮৩৬ পর্যন্ত বৃটিশদের যাবতীয় শিক্ষা সমীক্ষার রিপোর্ট বিবেচনায় নিলেই তুলনাটা টের পাওয়া যায়। বাংলায় শিক্ষা কখনই জাত-পাত-লিঙ্গ বৈষম্য ভিত্তিক ছিল না। প্রাথমিক স্তরের পাঠশালাতেই চিকিৎসক তৈরির পাঠ্যক্রম ছিল। চিকিৎসক এখানে ব্যবস্থাপত্র দাতা নন, ঔষধ প্রস্তুতকারকও। তাঁতি শুধু তাঁত নয়, রং ও সুতারও অধিকারী। কারিগরের হাতে ছিল যন্ত্র তৈরির প্রযুক্তি ও জ্ঞান। এই যে উৎপাদনের ওপর স্রষ্টার সার্বভৌমত্ব, তা বৃটিশ আমলে চলে গেল পুঁজির হাতে। প্রকৃতির অংশ মানুষ, সে পরে দাস হয়ে গেল। কিভাবে?

যেখানে উনবিংশ শতকে অক্সফোর্ডের অধিনে মাত্র ১৯ টি উচ্চতর পাঠশালা ছিল, ধর্ম আর ধ্রুপদী বিষয় ছিল মূল পাঠ্য; সেখানে ১৮০১ সালে এলিজাবেথ হ্যামিলটনের বরাতে এডাম বলছেন, শুধু কলকাতার আশেপাশে ও সমগ্র ২৪ পরগণা জুড়ে ছিল ১৯০ টি উচ্চ শিক্ষার পাঠশালা। যেখানে জ্যোতির্বিদ্যা, গণিত, চিকিৎসা শাস্ত্রও পড়ানো হত।

বৃটিশরা আসার বহু আগে থেকেই পর্তুগীজদের উদ্যমে ভারতের অর্থনীতি, আইন, দর্শন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিপুল নথি তারা নকল করে ইউরোপে নিয়ে যায়। ১৭৭৫ সালে বাংলার সাময়িক গভর্ণর হন জন ম্যাকফারসন। তার শিক্ষক এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এডাম ফার্গুসন ভারতের জীবন-যাপন, উৎপাদন-সম্পর্কসহ সবকিছুর নথিকরণের নির্দেশ দেন। অন্যদিকে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এ ম্যাকানচির কাছে খবর ছিল, বেনারসে কোলন ও জ্যোতির্বিদ্যা তখনও পাঠদান করা হয়। তিনিও নকল করার নির্দেশ দেন। তিনি ১৭৮৩ ও ১৭৮৮ তে বলছেন, গঙ্গাকে কেন্দ্র করে আমদানি-রপ্তানি ও উৎপাদন কিভাবে হয়, তা আবিষ্কার করতে হবে। যদি আমরা ইউরোপে কাজটা করতে পারি, যদি জ্যোতির্বিজ্ঞান, পুরাতত্ত্ব ও বিজ্ঞানকে বিশ্বের অগ্রগতির সাথে যুক্ত করতে পারি, তাহলে বিরাট ঘটনা হবে। ধর্মপালজী তাঁর ৫ খণ্ডের 'দ্য বিউটিফুল ট্রি' বইতে বিপুল নথিগুলোর তালিকা দিয়েছেন। এই পথেই ইউরোপে শিল্প বিপ্লব ঘটেছে।

৪.

তারা বলে, (ক) বাংলায় আইনের শাসন ছিল না, (খ) নবাবেরা জবরদস্তি করে অর্থ আদায় করতেন ও (গ) হিন্দুদের ওপর নির্যাতন করতেন, ফলে হিন্দুরা বৃটিশ শাসনকে স্বাগত জানিয়েছে।

অথচ বাংলার বৃটিশ শাসনের গুণগ্রাহী মার্শাল নামের একজন ইংরেজ স্বাক্ষ্য দিচ্ছেন, ১৭৫৩ সালে বাংলার বণিকেরা পিওনের হাতে দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে সোনা-রূপা পাঠাতেন। মুজাফ্ফরনামার লেখক করম আলি বলছেন, 'আলিবর্দির আমলে চোর-ডাকাতের নাম শোনা যেত না। কারোর সম্পত্তি রাস্তায় পড়ে থাকলেও কেউ চোখ তুলে তাকাত না।' আর সিরাজ উদ্দৌলা সম্বন্ধে কোম্পানির বেতনভূখ ঐতিহাসিক রবার্ট ওরম জানাচ্ছেন, কলকাতা আক্রমণের সময় যে লুটপাট হয়েছিল তার জন্য দায়ি মানিক চাঁদ, সিরাজ নন। সিরাজ এজন্য মানিক চাঁদকে কারাদণ্ড দেন, পরে ১০ লক্ষ টাকা জরিমানা দিয়ে তিনি ছাড়া পান। এমনকি কথিত অন্ধকূপের গল্পকার হলওয়েল পর্যন্ত সাক্ষ্য দিচ্ছেন, যখন তাকে কলকাতা পতনের পর বন্দী করে নবাবের সামনে আনা হয়, তখন তিনি বিপুল অর্থ দিয়ে মুক্তি কিনতে চান। নবাব সিরাজ উত্তর দেন, আপনার টাকা থাকলে আপনার কাছেই থাকুক। অনেক যন্ত্রণাভোগ করেছেন, মুক্তি দেয়া হল।

এবার হিন্দুদের নির্যাতনের গল্পকার মূলত ঐতিহাসিক এসসি হিল। তিনি ফরাসি জাঁ ল ও ইংরেজ কর্ণেল স্কটের লেখা থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন। অন্যদিকে বৃটিশ লাইব্রেরির ইণ্ডিয়া অফিস রেকর্ডসে 'ওরম সংগ্রহ' ও হল্যাণ্ডের রাজকীয় মহাফেজখানা থেকে প্রাক-পলাশি বাংলার কর্মচারিদের তালিকা পাওয়া গেছে। রবার্ট ওরমের তালিকায় দেখা গেছে, আলিবর্দির সময় (১৭৫৪)তে নবাবের পরের সর্বোচ্চ ৭ টি পদের ৬টিই হিন্দুরা অলঙ্কৃত করেছে, একমাত্র মুসলিম মীরজাফর। আবার ১৯ জন জমিদার-রাজার মধ্যে ১৮ জনই হিন্দু।  বাংলায় ওলন্দাজ কোম্পানির প্রধান ইয়ান কারসেবুমের তালিকায় (১৭৫৫) নায়পব দেওয়ান উঁমি চাঁদের নেতৃত্বে হিন্দুরাই একচ্ছত্র প্রাধান্যে।

রবার্ট ওরম বলছেন, সিরাজের সময় তা আরও বেড়ে যায়। মোহনলাল সিরাজের মন্ত্রী না হলেও সব মন্ত্রী মিলে যে ক্ষমতার অধিকারী, তারচেয়েও মোহনলালের প্রভাব বেশি। আর বৃটিশ আমলে একজন হিন্দুও কি সাহেবদের চেয়ে অধিক পর্যাদাবান ছিল?

ফোর্ট উইলিয়াম কেল্লার সংস্কার ও দূর্ভেদ্য -সুসংহত করা, বিনা শুল্কে বাণিজ্য করার অনুমতিপত্রের যথেচ্ছ ব্যবহার ও নবাবের অপরাধীদের আশ্রয় দান, নিঃসন্দেহে সার্বভৌমত্বে আঘাত। খোজা ওয়াজিদকে চিঠিতে নবাব এসব কারণ জানিয়েছিলেন। আর শিক্ষিত সম্প্রদায় যে যুদ্ধ জয়ের ভিত্তিতে বৃটিশদের উন্নত সভ্যতার প্রতিনিধি বলেন, কলকাতার যুদ্ধে বৃটিশদের পরাজয় নিয়ে কী বলবেন? (পর্তুগীজ ও ওলন্দাজরা মুঘলদের আগেই ভারতে এসেছেন। তাদের বদলে মোঘলদের ভারত জয় কিসের নিদর্শন?)

আর সিংহাসনে বসার জন্য বিরোধী পক্ষদের পরাস্ত পরার যে নবাবি মানদণ্ড, সেখানেও শওকত জঙসহ বাকিদের তিনি পরাস্ত করেছেন। শওকত জঙ ও ঘসেটি বেগমদের পক্ষে ইংরেজদের সমর্থন ছিল। সিরাজকে যে অযোগ্য দেখানোর চল, তাও ধোপে টেকে না।

নবজাগরণবাদী শিক্ষিতদের আরেকটি বড় কার্ড খেলেন, তা হল নবাব সিরাজ কি বাঙালি ছিলেন? কিন্তু এই জাতিবাদী গেমটাও যে ইউরোপের নবজাগরণবাদীদের তা ভুলে যাই -এক জাতি এক ভাষা এক রাষ্ট্র। এমনকি ১৮০০ সালে প্রমিত বাংলা নামে নতুন বাংলাই তো চালু করেছে ফোর্ট উইলিয়াম। যে ধান্দা থেকে প্রমিতগণ কলকাতায় যে বাংলা দেখেন চট্টগ্রামেও সেই বাংলা দেখতে চান।

আরেকটি কথা হল, সিরাজ যদি নিপীড়কই না হবেন, তাঁর জন্যে জনগণ রাস্তায় নেমে এলো না কেন? নেমেছিল ত। ৫ বছরের মাথায় ১৭৬৩ সনেই বাংলা জুড়ে ফকির-সন্নাসি বিদ্রোহ তো সিরাজের আমল ফেরানোরই লড়াই নয় কি?

কলকাতায় ক্লাইভ ঠিকই দাঁড়িয়ে আছেন ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে। সিরাজকে এতদিন নিজ দেশের কথিত শিক্ষিতদের কাছে জ্ববাব দিতে হয়েছে  কিন্তু এবার ইউরোপে ক্লাইভের মূর্তি টেনে নামাচ্ছে তরুণেরা। যে দ্বৈরথ পলাশীর প্রান্তরে ছিল, তা আজ কি ইউরোপে গেল?

লেখক: রেল-নৌ, যোগাযোগ ও পরিবেশ উন্নয়ন গণকমিটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সভাপতি

nahidknowledge@gmail.com