করোনা পরবর্তী কর্মসংস্থানে পর্যটন

প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২০   

ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া

বাংলাদেশের জন্য করোনা পরবর্তী সময়ে পর্যটন শিল্প অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে মূল্যবান ভূমিকা পালন করতে পারে - ফাইল ছবি

বাংলাদেশের জন্য করোনা পরবর্তী সময়ে পর্যটন শিল্প অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে মূল্যবান ভূমিকা পালন করতে পারে - ফাইল ছবি

২০২০ সালের শুরু থেকে পৃথিবী অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে করোনাভাইরাসের প্রভাবে। বিশ্ব মানচিত্রের এমন কোনো দেশ নেই যেখানে করোনার ভয়াল থাবা পড়েনি। দীর্ঘ কয়েক মাস অবরুদ্ধ থাকার পর আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে জনজীবন, তবে খুবই সীমিত পরিসরে। করোনার প্রভাব পড়েছে সব ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে। পর্যটন শিল্প তার মধ্যে অন্যতম। করোনার প্রভাবে বন্ধ ছিল সব ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থা, সকল পর্যটন স্থান। ফলে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে পর্যটন শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যবসা ও কর্মসংস্থান।

করোনা ভাইরাসের থাবা হয়তো আর কিছুদিন পর থেমে যাবে। জীবনযাত্রা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আবার করোনা পূর্ববর্তী সময়ের মত স্বাভাবিক হয়ে পড়বে। মানব সভ্যতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় মানুষ যুগে যুগে সব ধরনের দুর্যোগ কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। করোনা পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল করা ও কর্মসংস্থানের মূল উপায় হতে পারে পর্যটন শিল্প। বাংলাদেশের জন্য করোনা পরবর্তী সময়ে পর্যটন শিল্প অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে মূল্যবান ভূমিকা পালন করতে পারে।

বাংলাদেশের পর্যটক আকর্ষণের সকল উপাদান বিদ্যমান। পর্যটনের জন্য অপরিহার্য অবকাঠামো দিক থেকে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক  ও আঞ্চলিক বিমানবন্দরের মান উন্নয়ন, আন্তঃজেলা রেল যোগাযোগের উন্নয়ন নানামুখী উন্নয়ন হয়েছে পর্যটনের উন্নয়নে, যা পর্যটন বিকাশের জন্য সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্য, বৈচিত্রপূর্ণ সংস্কৃতি, দৃষ্টিনন্দন জীবনাচার বাংলাদেশকে গড়ে তুলেছে একটি বহুমাত্রিক আকর্ষণসমৃদ্ধ পর্যটন গন্তব্য হিসেবে। এদেশের সৌন্দর্যে তাই যুগে যুগে ভ্রমণপিপাসুরা মুগ্ধ হয়েছেন। তুলনামূলকভাবে বাংলাদেশ স্বল্প আয়তনের হলেও বিদ্যমান পর্যটন আকর্ষণে যে বৈচিত্র তা সহজেই পর্যটকদের আকর্ষণ করতে পারে। এদেশে রয়েছে বিশ্বের দীর্ঘতম নিরবচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত- কক্সবাজার, পৃথিবীর একক বৃহত্তম জীববৈচিত্রে ভরপুর ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল-সুন্দরবন, একই সৈকত থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত অবলোকনের স্থান সমুদ্রকন্যা-কুয়াকাটা, দুটি পাতা একটি কুঁড়ির সবুজ রঙের নয়নাভিরাম চারণভূমি- সিলেট, আদিবাসীদের বৈচিত্রপূর্ণ সংস্কৃতি ও কৃষ্টি আচার-অনুষ্ঠান সমৃদ্ধ উচ্চ সবুজ বনভূমি ঘেরা- চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চল, সমৃদ্ধ অতীতের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা উত্তরাঞ্চলের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো। ফলে স্বাভাবিকভাবে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প উন্নয়নের সম্ভাবনা অপরিসীম। পর্যটন শিল্পের সবটুকু সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে মডেল হতে পারে।

পর্যটন শিল্পের ব্যাপকতার অন্যতম এর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে নিহিত রয়েছে। সেই দিক থেকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে আরো গতিশীল করতে ও ব্যাপক কর্মসংস্থান তৈরিতে এই শিল্পের ভূমিকা অনস্বীকার্য। বর্তমানে পৃথিবীর ১০টি কর্মসংস্থানের মধ্যে ১টি কর্মসংস্থান তৈরি হয় পর্যটন খাতে। ২০১৭ সালে বাংলাদেশের জিডিপিতে পর্যটন শিল্পের মোট অবদান ছিল ৮৫০.৭ বিলিয়ন টাকা। আর এইখাতে কর্মস্থান তৈরি হয়েছে মোট ২৪ লাখ ৩২ হাজার।

তবে করোনাভাইরাসের রাহুগ্রাসের প্রভাবে এই শিল্পে ধস নেমে এসেছে। সব ধরনের হোটেল, মোটেল, রেস্টুরেন্ট বন্ধ হয়ে গেছে। প্যাসিফিক এশিয়া ট্রাভেল অ্যাসোসিয়েশন (পাটা) বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের এক সাম্প্রতিক সমীক্ষা অনুযায়ী জানুয়ারি থেকে মে, ২০২০ পর্যন্ত মোট পাঁচ মাসে সার্বিক পর্যটন শিল্পে ৯ হাজার ৭০৫ কোটি টাকার ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং প্রায় ৩ লাখ ৯ হাজার ৫০০ জন তাদের চাকরি হারানোর শঙ্কায় রয়েছেন। হোটেল/রিসোর্ট এবং রেস্তোরাঁয় প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা এবং কর্মহীন প্রায় আড়াই লাখ জন, ট্রাভেল এজেন্সিতে ৩ হাজার কোটি টাকা এবং কর্মহীন প্রায় ১৫ হাজার জন, ট্যুর অপারেশনে ৪ হাজার ৫০ কোটি টাকা (ইনবাউন্ড, আউটবাউন্ড ও ডমিস্টিক) এবং কর্মহীন প্রায় ৪১ হাজার জন, পর্যটন পরিবহন ও পর্যটকবাহী জাহাজে ৫৫ কোটি টাকা এবং কর্মহীনের সংখ্যা হবে প্রায় দেড় হাজার জন।

বিভিন্ন পরিসংখ্যান বলছে, বর্তমানে বাংলাদেশের তরুনদের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ১২.৮ শতাংশ, যা করোনা পরবর্তী সময়ে আরো বাড়তে পারে। আর উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্ব ১০ দশমিক ৭ শতাংশ। প্রতি বছর প্রায় ১৮ লাখ তরুণ চাকরির বাজারে আসছে, যার একটি বড় অংশ বেকার থেকে যাচ্ছে। যেহেতু পর্যটন একটি শ্রমঘন শিল্প, তাই বেকারত্ব নিরসনে পর্যটন শিল্প ভূমিকা পালন করতে পারে। বর্তমান সকার বিগত ১০ বছরে পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে কিছু যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে যার মধ্যে কক্সবাজারসহ দেশের অন্যান্য পর্যটন অঞ্চলের উন্নয়ন অন্যতম। এতে করে পর্যটকদের জন্য নতুন সুযোগ সুবিধা সৃষ্টি হচ্ছে, বাড়ছে কর্মসংস্থান। শুধুমাত্র কক্সবাজারে তিনটি পর্যটন পার্ক তৈরির পরিকল্পনা করেছে বর্তমান সরকার এবং তার কাজ শুরু হয়েছে। প্রতিবছরে এতে বাড়তি ২শ’ কোটি মার্কিন ডলারের অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এই তিনটি ট্যুরিজম পার্ক হলো সাবরাং ট্যুরিজম পার্ক, নাফ ট্যুরিজন পার্ক এবং সোনাদিয়া ইকো ট্যুরিজম পার্ক। এই সকল স্থানে প্রায় ৪০ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

তাছাড়া বাংলাদেশে বর্তমানে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক দিক থেকে স্থিতিশীলতা বিরাজ করছে। যার ফলে বিভিন্ন ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার ঘটছে। আর তাই অনেক আন্তর্জাতিক মানের ৫ তারকা হোটেল বাংলাদেশে স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে। আগামী ২ থেকে ৩ বছরের মধ্যে ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেটসহ অন্যান্য একালায় প্রায় নতুন ১০টি ৫ তারকা হোটেল হবে। এতে আরো প্রায় ১০ হাজারের মত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান তৈরি হবে।

আশার কথা হচ্ছে- সকল উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শেষ হলে করোনা পরবর্তী পর্যটনে সৃষ্টি হবে নতুন কর্মসংস্থান। এর জন্য পর্যটন শিল্পের সুফল পেতে হলে আমাদের দক্ষ জনশক্তি প্রয়োজন। আমাদের দেশে এখনো প্রচুর বিদেশি কাজ করে। যেখানে আমাদের দেশীয় লোকবলের কাজ করার সুযোগ রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যটন বিষয়ক পড়ালেখা চালু হয়েছে, যা দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে ভূমিকা পালন করবে। জাতির জনক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন জনশক্তি তৈরিতে কাজ করছে তাদের ট্রেনিং সেন্টারের মাধ্যমে। আশা করা যায়, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বিদেশি নির্ভরশীলতা কাটিয়ে দেশীয় জনশক্তি দিয়ে এই খাত পরিচালিত হবে।

আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে যে, এই সময়ে বিশ্বে পর্যটকদের চাহিদা পরিবর্তন হবে। আগামীতে বিশ্বের মোট পর্যটকের প্রায় ৭০ শতাংশ ভ্রমণ করবে এশিয়া অঞ্চলে। সেই দিকে আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে। যে কর্মপরিকল্পনা নিয়ে আমাদের পর্যটন শিল্প এগিয়ে যাছে তা আরো বেগবান করা গেলে এই খাতে আরো উন্নতি করা যাবে। পাশাপাশি নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, বেকারত্বের হার কমে আসবে।


লেখক: চেয়ারম্যান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।