শান্তিনিকেতনে পৌষমেলা বন্ধ কিসের আলামত?

প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২০     আপডেট: ২২ জুলাই ২০২০   

গৌতম রায়

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

আপাতভাবে শান্তিনিকেতনে পৌষমেলা বন্ধ করে দেওয়া একটি নিরামিষ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বলে মনে হবে। এই সিদ্ধান্তের একমাসের ভেতরই বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন পাঠক্রম থেকে যাবতীয় ধর্মনিরপেক্ষ বিষয়গুলো সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই সিদ্ধান্তও অনেকের কাছেই মনে হবে- কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের ধামাধরা ওই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে এটা তো প্রত্যাশিতই। কিন্তু পৌষমেলা বন্ধের আপাত নিরীহ অথচ গভীর রাজনৈতিক পদক্ষেপ আর পাঠক্রম থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা তুলে দেওয়া সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামো ধ্বংসের একটা পদক্ষেপ। এর প্রেক্ষিত আমাদের ভেবে দেখা বিশেষভাবে জরুরি।

মেলা বিষয়টির ওপর রবীন্দ্রনাথের আকর্ষণ পারিবারিক পরিবেশের দরুণ বেশ ছোটবেলা থেকেই তৈরি হয়েছিল। ১৮৬৭ সালে মূলত ঠাকুরবাড়ির উদ্যোগে শুরু হয়েছিল হিন্দু মেলা। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী মননের ক্ষেত্রভূমি তৈরিতে এই হিন্দু মেলার দ্বিবিধ ভূমিকা ছিল। একদিকে এই মেলা স্বদেশ চেতনাকে সংহত করতে সাহায্য করেছিল। অপরদিকে জাতীয়তাবোধের উন্মেষ পর্বে ‘হিন্দু' চেতনাকে সংহত হতেই এই মেলা একটা ভূমিকা নিয়েছিল। এসব স্বত্ত্বেও মেলাতে মানবমিলনের যে প্রেক্ষিত, সেটি কিশোর রবীন্দ্রনাথকে বিশেষভাবে উৎসাহিত করেছিল।

১৮৪৩ সালের ২১ জানুয়ারি, দিনটি ছিল ৭ পৌষ, সেইদিন রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশের কাছে ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষা নিয়েছিলেন মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ। এই পর্বের ধারাবাহিকতাতেই ১৮৯১ সালে শান্তিনিকেতনে উপাসনালয় প্রতিষ্ঠা হয়। সেই পরম্পরাতেই ১৮৯৪ সাল থেকে সেখানে শুরু হয় পৌষ মেলা।

ব্রহ্ম উপাসনার আনুষ্ঠানিকতা থাকলেও এই মেলা যাতে কখনোই ধর্ম আর জাতপাতের বেড়াজালে আবদ্ধ না হয়ে পড়ে সেজন্য প্রথম থেকেই সক্রিয় ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। যে জেলাতে শান্তিনিকেতন অবস্থিত, সেই বীরভূমে তিনটি ঐতিহ্যশালী মেলা হয়। দুটি হিন্দুদের। দধিয়াবৈরাগীতলার মেলা আর কেঁদুলির মেলা। আর একটি পাথরচাপড়িতে দাতাপীরের মেলা, মুসলমানদের।

কেঁদুলিতে মুসলমান ফকিরেরা দু'একজন কখনো সখনো গেলেও দধিয়াবৈরাগীতলার মেলাতে মুসলমানের প্রবেশ নিষিদ্ধ। পাথরচাপড়ি এড়িয়ে চলেন হিন্দু বাউল-বোস্টমেরা। বেশরাদের ভিতর এই বিভাজন রবীন্দ্রনাথকে ব্যথিত করেছিল। তাই শান্তিনিকেতনের পৌষমেলাকে হিন্দু বাউল-বোস্টম আর মুসলমান ফকির-মিসকিনদের জন্যে অবারিত দ্বার করে দিলেন রবীন্দ্রনাথ।

এই মানুষে সেই মানুষের সন্ধানে ছেঁউড়িয়ার লালন আর শিলাইদহের গগণ হরকরা যে অনুভূতি কবির মনে জাগিয়েছিলেন, সেই অনুভবকে মূর্ত করতে রবীন্দ্রনাথ তার নিজের জীবনের আরো বহু হাতে-কলমের পরীক্ষা হিসেবে বেছে নিলেন এই পৌষ মেলাকেও। মওলানা রেওয়াজউদ্দিন যখন বাউল বিধ্বংসী ফতোয়া দিচ্ছেন, হিন্দু মৌলবাদীরা যখন তাদের ঝুঁটি কাটতে ব্যস্ত, মানুষের রক্তে পথ প্রান্তরকে বিদীর্ণ করতে ব্যস্ত মানুষই, তখন মানুষ রতনের সন্ধানে পৌষমেলাকে ঘিরে ধর্ম আর জাতপাতের বেড়া ভেঙে এক নতুন সমাজবিপ্লবের সূচনা করছেন রবীন্দ্রনাথ।

গোটা ভারত যখন ধর্মান্ধতায় ক্লিন্ন, ব্রিটিশের ভাজক প্রক্রিয়াতে আর হিন্দু-মুসলমান, দুই ধর্মের সাম্প্রদায়িক-মৌলবাদীদের দাপটে দেশ ক্রমশঃ খণ্ড-বিখণ্ডের পথে ধীরে ধীরে হাঁটছে, এমন ক্রান্তিকালেও এই পৌষমেলাতে মানুষের ধর্মে মানুষকে মিলিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। এক মেলাতে দুটি পাশাপাশি ছাউনিতে হিন্দু বাউল-বোস্টম আর মুসলমান ফকিরদের অবস্থিতি, পরস্পরের ভিতর গানের ভাষায়, ভাবের বিনিময়ে মানুষ রতনের খোঁজে অরূপসাগরে অবগাহন- এটা সার্বিক অর্থেই ধর্মান্ধ বিশ্বে, ধর্মের রাজনৈতিক কারবারিদের সাম্রাজ্যে ছিল একটি ওয়েসিস।

এই মেলাকে চিরতরে বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ। গত কয়েকবছর ধরে পৌষমেলা বা বসন্তোৎসব ঘিরে আইনশৃঙ্খলাজনিত কিছু সমস্যা হচ্ছে। এই সমস্যার সমাধান করতে না পারা বিশ্বভারতী বা প্রশাসনের ব্যর্থতা। সে জন্য কেন মেলা বন্ধ হবে? না, সেজন্য তো মেলা বন্ধ হচ্ছে না। মেলা বন্ধ হচ্ছে রবীন্দ্রনাথের প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের বেড়িজাল ভাঙার যাপনচিত্রের রেশটি যাতে কোনো অবস্থাতেই বাংলা তো দূরের কথা, গোটা ভারতকে অতিক্রম করে দক্ষিণ এশিয়াতে প্রভাব বিস্তার না করতে পারে, সেই জন্য। হিন্দু সমাজের বর্ণাশ্রমের চরম সমর্থক ভারতের শাসক বিজেপি। জাতপাতের বেড়া ভাঙতে রবীন্দ্রনাথ যে পৌষমেলাকে একটা চরম উত্তরণে উপস্থাপিত করেছিলেন, ধর্মান্ধতা আর জাতপাতের প্রবল পক্ষপাতী বিজেপি কি সেই মেলাতে চলতে দিতে পারে?

রবীন্দ্রনাথের সার্বিক ধর্মনিরপেক্ষ চেতনা বিরোধী ভারতের নাগরিকত্ব আইনের সংশোধনীর পক্ষে জনমত তৈরিতে এই উপাচার্য, যার উদ্যোগে পৌষমেলা চিরতরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, তিনিই বিজেপি সাংসদ স্বপন দাশগুপ্তকে দিয়ে সভা করে প্রচার চালিয়েছিলেন খোদ শান্তিনিকেতনে। সেই উপাচার্যের হাতে ধর্মনিরপেক্ষতার মূর্ত প্রতীক শান্তিনিকেতনের পৌষমেলা যে একটি বিভীষিকা বিশেষ, তা আর আলাদা করে বলতে হয় না। কার্যত শাসকের রবার স্ট্যাম্প হয়ে যাওয়া একজন উপাচার্য যখন পৌষমেলা চিরতরে বন্ধের কথা বলেন, তখন রাজনীতির এই গূঢ় তত্ত্বকথাটিই সবার সামনে পরিষ্কার  হয়ে ওঠে।

লোকায়ত ধর্ম, যা মানবধর্মের একটি জানালা, এই জানালা কেটে দিলেই একটা সদর দরজা, যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের বেড়াজাল অতিক্রম করে প্রোজ্জ্বল হয়ে ওঠে ধর্মনিরপেক্ষতার সুউচ্চ মিনার, এভাবেই আত্মকথনমূলক গ্রন্থ 'বিনুর বই' তে সংস্কৃতির প্রেক্ষাপটকে দেখেছিলেন অন্নদাশঙ্কর। আর আজ সেই প্রেক্ষিতকে অবরুদ্ধ করতেই দরজা খোলার চেষ্টা তো দূরের কথা, জানলাটিকেও বুজিয়ে দেওয়া হচ্ছে রাষ্ট্রযন্ত্রের সুযোগ নিয়ে।

পৌষমেলা চিরতরে বন্ধ করার অর্থ হল মৃত্যুর এতোকাল পরে তার গড়া শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথকে নির্মমভাবে হত্যা করা। সম্প্রীতি, ধর্মনিরপেক্ষতার মহামিলনক্ষেত্র পৌষমেলা শান্তিনিকেতনে আজ বন্ধ হলে কাল হোক বা পরশু বাংলাদেশে সংখ্যাগুরু মৌলবাদীরা দাবি তুলবে; বন্ধ করা হোক ছেঁউরের মেলা। দাবি উঠবে, বন্ধ হোক, বগুড়ার মহাস্থানগড়ের মেলা। যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের কোনো ঠাঁই নেই। আছে সামাজিক আবেদন। হিন্দু- মুসলমান নির্বিশেষে মেয়েকে মেলা দেখাতে আনার খরচ জোগারের তাগিদের রাগ আর ভালোবাসার অপূর্ব মিশ্রণ।

এটাই তো চায় মৌলবাদীরা। এটাই তো চরমতম আকাঙ্ক্ষা সাম্প্রদায়িকদের। এভাবেই দাবি হয়তো একদিন বাংলায় তুলবে ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক আরএসএস, তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি আর প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতাকে তাদের দোসর, তৃণমূল কংগ্রেস। ভিন্ন আঙ্গিকে তারা বলবে, জলপাইগুড়িতে জল্পেশের মেলাতে হিন্দূ মুসলমানের এই ভিড় ধর্মের সাম্রাজ্যে বেমানান। অতএব নিষিদ্ধ। বলবে, শ্রীচৈতন্যের সময়কাল থেকে বাঁকুড়ার সোনামুখিতে মনোহরদাসের যে মোচ্ছব, সেখানকার ভাত কাঁড়াকাঁড়িতে জাত- ধর্মের বালাই থাকছে না। অতএব নিষিদ্ধ। পৌষমেলা দিয়েই মনেহয়, এদের কার্যক্রমের আপাতত শুরুয়াত হল!


লেখক: ভারতীয় ইতিহাস গবেষক