কনস্টেবল জসিমের পরিবারের পাশে সহকর্মীরা

প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২০     আপডেট: ২২ জুলাই ২০২০   

মফিজুর রহমান পলাশ

করোনায় মারা যাওয়া দেশের প্রথম পুলিশ সদস্য মো. জসিম উদ্দিন

করোনায় মারা যাওয়া দেশের প্রথম পুলিশ সদস্য মো. জসিম উদ্দিন

করোনায় মারা যাওয়া দেশের প্রথম পুলিশ সদস্য মো. জসিম উদ্দিনের শিশুপুত্র সামির পঞ্চম জন্মদিন ছিল গত ১৪ জুলাই। বাবা বেঁচে থাকলে একমাত্র ছেলের জন্মদিনে বড় আয়োজন করতেন, হাসি-আনন্দে ভরে উঠত পুরো বাড়ি। নিমন্ত্রণ করা হতো আত্মীয়স্বজন ও কাছের বন্ধুবান্ধবদের; কিন্তু বাবার মুখে জন্মদিনের কেক তুলে দেওয়ার সুযোগ আর কখনোই আসবে না ছোট্ট সামির জীবনে! বিশ্বব্যাপী মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসের ছোবলে গত ২৯ এপ্রিল বাংলাদেশ পুলিশের কর্মকর্তা ও সদস্যদের মধ্যে প্রথম জীবন উৎসর্গ করেন ডিএমপির পুলিশ কনস্টবল মো. জসিম উদ্দিন।

বাবা মারা গেছেন তাতে কি? করোনার বিষে পরপারে চলে যাওয়া একজন সহকর্মীর শিশু সন্তানের জন্মদিন বেশ ঘটা করেই আয়োজন করে কুমিল্লা জেলা পুলিশ। কুমিল্লার পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম বিপিএম (বার), পিপিএমের উদ্যেগে প্রয়াত পুলিশ সদস্য জসিমের কুমিল্লার বাড়িতেই জন্মদিনের অনুষ্ঠান হয়। এ সময় কুমিল্লার পুলিশ সুপার জসিমের শিশু সন্তানকে বাইসাইকেল, পোষাক, খেলনাসহ বিভিন্ন উপহার সামগ্রী প্রদান করেন।

জসিম উদ্দিন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ওয়ারী পুলিশ ফাঁড়িতে কর্মরত ছিলেন। মাত্র ৪০ বছর বয়সে করোনায় মারা যান জসিম উদ্দিন। কুমিল্লার বুড়িচং থানার কাঠালিয়া গ্রামে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন অকুতোভয় এই পুলিশ সদস্য।

ভাইরাস সংক্রমন থেকে প্রাণ বাঁচাতে মানুষ যখন দিনের পর দিন গৃহবন্দী, ঠিক তখন জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জীবনের মায়া তুচ্ছ করে সহকর্মীদের সাথে নিয়ে বীরদর্পে করোনার বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন পুলিশ সদস্য জসিম। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, অজান্তেই ভাইরাস তার শরীরে বাসা বাঁধে। তিনি টেরও পাননি। এক পর্যায়ে শরীরে করোনার লক্ষণ দেখা দেওয়ায় তাকে ঢাকার একটি আইসোলেশন সেন্টারে পাঠানো হয়। সেখানে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে নেওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে। কিন্তু চিকিৎসক ও পুলিশের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান ডিএমপির এই পুলিশ সদস্য।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মো. জসিম উদ্দিনের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেন। শোক জানিয়েছেন আইজিপি ড. বেনজীর আহম্মেদ বিপিএম (বার)। এছাড়াও ডিএমপি কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম বিপিএম (বার), ঢাকা রেঞ্জ ডিআইজি হাবিবুর রহমান বিপিএম(বার), পিপিএমসহ (বার) শোক জানান বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরা।

পুলিশ কনস্টেবল জসিম চলে যাওয়ার শোক এখনও কাটেনি। তার বিধবা স্ত্রী ফারজানা আখতারের (৩১) চোখে মুখে বিষণ্ণতা স্পষ্ট। পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তিকে হারিয়ে সন্তানদের নিয়ে তিনি যেন অথৈ সাগরে পড়েছেন। স্বামী হারানোর বেদনা ভোলার চেষ্টা করতেই সামনে চলে আসে ছেলে মেয়েদের ভবিষ্যতের চিন্তা। এতদিন স্বামীর চাকরি ছিলো। মাস শেষে বেতন আসতো। সরকারি রেশনে বাচ্চারা তিন বেলা খেয়ে বেঁচে থাকতো। কিন্তু স্বামী মারা যাওয়ায় পরিবারের একমাত্র আয়ের পথ বন্ধ।

কনস্টেবল জসিম উদ্দিনের দুই কন্যা ও এক পুত্র। বড় মেয়ে ইসরাত জাহান অপর্না কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী। ছোট মেয়ে নুসরাত জানান ছোয়ানা স্থানীয় সরকারি প্রাইমারি স্কুলের তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ালেখা করে। আর একমাত্র ছেলে আব্দুল্লাহ আল সামির বয়স মাত্র পাঁচ বছর। করোনায় বাবাকে হারিয়ে শোকে বিহবল এই শিশুরা। তারা যেন হাসতেও ভুলে গেছে।

গত ঈদুল ফিতরের আগে ডিএমপি কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম বিপিএম (বার) জসিমের পরিবারকে নগদ দুই লাখ টাকা ও উপহার সামগ্রী পাঠিয়েছিলেন। সেই টাকা দিয়েই পরিবারটি চলছে। ডিএমপি কমিশনার সম্প্রতি আবারও কনস্টবল জসিমের বাচ্চাদের জন্য ঈদ উপহার সামগ্রী পাঠিয়েছেন। এছাড়াও ঈদুল আজহা উৎযাপন করতে জসিমের পরিবারকে ১৫ হাজার টাকা দিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি কুমিল্লার পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম বিপিএম (বার), পিপিএম উপহার সামগ্রী ও আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন জসিমের পরিবারকে। সময় পেলেই বুড়িচং থানার পুলিশ কর্মকর্তারা সামির বাড়িতে গিয়ে তার সঙ্গে সময় কাটান। এতে ক্ষণিকের জন্য হলেও সামি তার বাবার স্মৃতি ভুলে থাকতে পারছে। বাবা যেখানে চাকরি করতেন, সেই  ইউনিফর্মধারী পুলিশ সদস্যদের মমতা ও ভালবাসায় সামি যেন একটু একটু স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে শুরু করেছে।

করোনাকালে জনকল্যাণে আত্মনিয়োগ করে বীরের মতো আত্মত্যাগ করেছেন ডিএমপির পুলিশ কনস্টবল মো. জসিম উদ্দিন। তার এই ত্যাগ ও সাহসিকতার কথা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তার আত্মত্যাগ ও বীরত্বগাঁথা স্মরণ হবে গভীর শ্রদ্ধা ও অকৃত্রিম ভালোবাসায়। শহীদ পুলিশ কনস্টেবল মো. জসিম উদ্দিনের আত্মা শান্তিতে থাকুক।

লেখক: সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া), ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ

 ই-মেইল: palash.du09@gmail.com