সংগ্রামী সম্পাদক আবদুস সালাম

প্রকাশ: ০১ আগস্ট ২০২০     আপডেট: ০২ আগস্ট ২০২০   

রেহানা সালাম

আবদুস সালাম

আবদুস সালাম

পথিকৃৎ সাংবাদিক, ভাষা আন্দোলনে প্রথম কারাবরণকারী পত্রিকা সম্পাদক, জাতীয় প্রেসক্লাবের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা মহাপরিচালক, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান আইন পরিষদের সদস্য ও পাকিস্তান সম্পাদক পরিষদের সভাপতি প্রয়াত আবদুস সালামের ১১০তম জন্মদিবস আজ ২ আগস্ট। 

আবদুস সালাম ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে অবিভক্ত ভারতের প্রসিদ্ধ কলেজ প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে অনার্স এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে এম এ পাস করেন। সে সময় একটি সাধারণ মুসলিম গ্রামীণ পরিবার থেকে উঠে আসা একজন ছাত্রের এ সাফল্য সবাইকে অবাক করে দিয়েছিলো। শোনা যায়, অনার্সেও তিনি এরকমই ফলাফল করেছিলেন। কিন্তু রক্ষণশীল ও সাম্প্রদায়িকমনা শিক্ষকদের কারণে তাকে তার যোগ্য সম্মান দেওয়া হয়নি। অসম্ভব পড়ুয়া আর মেধাবী  ছিলেন আবদুস সালাম। ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে তার ছিলো অসাধারণ দক্ষতা। তার ইংরেজির দখল ছিল একজন ইংরেজের চেয়েও বেশি। 

আবদুস সালামের সহপাঠী এ রশিদ তার অত্যান্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। তাকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন। আবদুস সালাম সম্পর্কে তিনি লিখেছেন- of course not, withstanding has encyclopedic knowledge his passion was English literature, His favorite was Shakespeare but he had a hidden concern for Chaucer Lying   on his back. eyes half sut,  he would recite i’h a Sonorous and none too melodious voice from Shakespeare,  Chaucer, Milton, Keats, Shelly, Byron, Mathew Arnold and Browning.

ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে ছাড়াও আবদুস সালাম বিজ্ঞান, অর্থনীতি, রাজনীতি, দর্শন প্রতিটি বিষয়ে আগ্রহী পাঠক ছিলেন। যে কারণে দেশের বাইরেও আবদুস সালামের সাথে বিশ্ববরেণ্য বহু ব্যক্তির নিবিড় সখ্যতা ছিলো। বার্ট্র্রান্ড রাসেলের সাথে আবদুস সালামের নিয়মিত চিঠি লেখালেখি চলতো। পশ্চিম জার্মানির চ্যান্সেলর ও নোবেল বিজয়ী, উইলি ব্রানত নোবেল পুরস্কার পাওয়ার আগেই তাকে নিয়ে চমৎকার একটা লেখা লিখেছিলেন আবদুস সালাম। যে কারনে নোবেল পাওয়ার পর আবদুস সালামকে নিজের লেখা বই উপহার দিয়েছিলেন উইলি। লিখেছিলেন- ‘আমার বন্ধু আবদুস সালামকে’। 

পাকিস্তানের নোবেল পুরস্কার বিজয়ী বিজ্ঞানী আবদুস সালামের সাথে আবদুস সালামের ছিলো সখ্যতা। এ ছাড়া ভারতীয় লেখক ও সাংবাদিক প্রয়াত কুলদীপ নাওয়ার ছিলেন- আবদুস সালামের গুনমুগ্ধ সহকর্মী। যাকে ১৯৯৭ সালে প্রথম সাংবাদিক আবদুস সালাম পদক দেওয়া হয়। নিজের জীবনের গর্বিত পুরষ্কারগুলোর মধ্যে এ পদকটির উল্লেখও তিনি করেছেন।  দেশকে খুব বেশি ভালোবাসতেন আবদুস সালাম। তাই ১৯৪৭ এর দেশবিভাগের ফসল তথাকথিত স্বাধীন পাকিস্তানের দুই অঞ্চলের ভেতর যে অর্থনৈতিক বৈষম্য ও শোষণ আস্তে আস্তে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিলো তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে উঠলেন আবদুস সালাম। সরকারি কর্মকর্তা হওয়ার পরও প্রচন্ড সাহসী আবদুস সালাম নতুন কাগজ অবজারভার-এ ইকোনোমিক নোটস নামে জ্বালাময়ী অথচ যুক্তিপূর্ণ লেখা লিখতে শুরু করেন। লেখাগুলোতে খুবই জোরালোভাবে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক স্বায়ত্বাধিকারের কথা বলা হয়। 

এতেই থামলেন না আবদুস সালাম। পশ্চিমা শাষকগোষ্ঠীর লাগামহীন বৈষম্য ও শোষণের প্রতিবাদে লোভনীয় সরকারী চাকুরি থেকে পদত্যাগ করে অনিশ্চিত পেশা সাংবাদিকতা বেছে নিলেন।  যোগ দিলেন- অবজারভার পত্রিকায় সম্পাদক পদে। আরও শক্তিশালী হলো আবদুস সালামের কলম। পাশে পেলেন আরও দুজন মহাসম্পাদক- সংবাদ সম্পাদক জহুর হোসেন চৌধুরী ও ইত্তেফাক সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া। এ তিন সম্পাদক তাদের কলম দিয়ে এ অঞ্চলের মানুষের হৃদয়ে আগুন তৈয়ার করতে লাগলেন। যে অবজারভারের প্রচার সংখ্যা ছিলো মাত্র ৫০০ কপি, তা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে লাগলো। ১৯৭২ সালে যখন আবদুস সালামকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হলো তখন অবজারভারের প্রচার সংখ্যা ৫০০০। আবদুস সালাম সম্পাদক হওয়ার পর থেকেই অবজারভার সরকারবিরোধী সংবাদপত্রে পরিণত হলো। পত্রিকাটির মালিক হামিদুল হক চৌধুরীও এক্ষেত্রে সাহসের পরিচয় দিলেন। 

পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী পত্রিকাটির এ ভূমিকা সুনজরে দেখলেন না। তাদের ক্রোধের শিকার হলো পত্রিকাটি। মিথ্যা মামলায় আটক হলেন সম্পাদক আবদুস সালাম। পত্রিকাটি বন্ধ করে দেওয়া হলো। অবশ্য কিছুদিন পরেই পত্রিকা আবার প্রকাশিত হলো এবং আবদুস সালামও মুক্তি পেলেন। 

এ পত্রিকার সম্পাদকের কক্ষটি ছিলো বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা উদ্ধুদ্ধ সচেতন সুশীল সমাজের আড্ডাস্থল। মওলানা ভাসানী ছাড়াও এ আড্ডায় উপস্থিত থাকতেন মানিক মিয়া, জহুর হোসেন চৌধুরী। আরও থাকতেন ভাষা আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছাত্রনেতারা। যাদের অন্যতম ছিলেন অলি আহাদ।

তারপর এলো ১৯৫৪ সাল। ইতোমধ্যে রাজনীতি না করেও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সাথে সুগভীর সম্পর্ক তৈরি হলো আবদুস সালামের। বিশেষ করে শেরে বাংলা একে ফজলুল হক এবং আবদুস সালামের ভেতর মধুর একটা বন্ধুত্ব গড়ে উঠলো। আর তাই যুক্ত ফ্রন্টের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে দাঁড়াতে বাধ্য হলেন আবদুস সালাম। ফেনী থেকে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে তিনি পূর্ব পাকিস্তান আইন পরিষদের সদস্য হলেন।

কিন্তু আবদুস সালাম হলেন জাত সাংবাদিক, অল্পদিনেই বুঝলেন, রাজনীতি তার জন্য নয়। সুতরাং যুক্তফ্রন্ট সরকারের বিদায়ের সাথে সাথে আবদুস সালাম রাজনীতির মাঠ থেকে বিদায় নিলেন। ফিরে গেলেন সাংবাদিকতায়। অবজারভার আরও বেশি সরকারবিরোধী ও সাহসী হয়ে উঠলো।

স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে জ্বলে উঠলো আবদুস সালামের কলম। আইয়ুব খানের গ্রন্থ ‘প্রভু নয় বন্ধু’র কঠিন সমালোচনা করলেন আবদুস সালাম। তিনি  The Art of non Servience নামে একটি লেখা লিখলেন। তিনি বলেন- Without Questioning his motives it is possible to question the correctness of his methods.

পাকিস্তান আমলে সাংবাদিক আবদুস সালামকে দু’বার কারাবাস বরণ করতে হয়েছে। দুটোই ছিলো মিথ্যা মামলা। খাজা নাজিমউদ্দিনের বিরুদ্ধে লেখাটাকে ইসলামবিরোধী লেখা এবং অন্যবার পাকিস্তানের স্বার্থরক্ষায় নিবেদিত ইংরেজি দৈনিক মর্নিং নিউজ পুড়িয়ে দেওয়ার মামলায় তাকে কারাবরণ করতে হয়েছে।

 এভাবে ক্রমশ এগিয়ে এলো একাত্তরের ২৫ মার্চ। প্রয়াত সাংবাদিক কামাল লোহানী এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন ২৫ মার্চের পর তাদের ক’জনকে আবদুস সালামকে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ঢাকা সেনানিবাসে পত্রিকা প্রকাশের জন্য চাপ সৃষ্টির জন্য ডেকে নেয়। সেখানে ভয়ডরহীন আবদুস সালাম সিগারেট খেতে খেতে বলেন পত্রিকা প্রকাশ সম্ভব নয় এ মুহূর্তে। কামাল লোহানী বলেছিলেন, আমরা সালাম সাহেবের কথা শুনে ভয় পেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম ওরা আমাদের আর ফিরতে দেবে না। অথচ সালাম সাহেব একটুও ভয় পেলেন না। 

এর মধ্যে তার বড় জামাতা এ বি এম মূসা দেশত্যাগ করে মুক্তিযুদ্ধের খরব সংগ্রহের জন্য ব্যাংকক হয়ে কলকাতায় চলে যান। ফলে আবদুস সালামের ওপর হানদার বাহিনী আরও বিরূপ হয়ে ওঠে। একাত্তরের ডিসেম্বরের প্রথমেই আবদুস সালাম পরিবারসহ বাড়ি ছেড়ে আত্মগোপন করেন পুরানা পল্টনে তার এক মেয়ের বাসায়। বাড়ির দায়িত্ব ছিলো এ বি এম মূসার ছোটভাই প্রয়াত ড. মোস্তফা এবং খ্যাতনামা ফটো সাংবাদিক প্রয়াত বেলায়েত হোসেন বেলালের বাবার ওপর। ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কে অবস্থিত এ বাড়িতে দুবার আল বাহিনী আবদুস সালামের সন্ধানে আসে, কিন্তু তাকে না পেয়ে ফিরে যায়। ডিসেম্বর ১৭ তারিখে আবদুস সালাম ফিরে যান তার নিজের বাড়িতে। 

পরবর্তীতে অবজারভার প্রকাশিত হলো বাংলাদেশ অবজারভার হিসেবে। সম্পাদক পদে আবদুস সালামই রইলেন, কিন্তু বেশি দিন নয়। ৭২’ সালে, গণতান্ত্রিক ধ্যানধারণায় ‘‘আজীবন বিশ্বাসী” লিখলেন এক অমর সম্পাদকীয়। কিছু মানুষের ষড়যন্ত্রের ফলে বদলে গেলো সত্যের রূপ। বাধ্যতামূলক অবসরে যেতে হলো আবদুস সালামকে। সন্তানতূল্য অবজারভার ছড়ার কষ্ট আবদুস সালামকে অসুস্থ করে তুলল। যদিও পরবর্তী সময়ে তাঁর পরিকল্পনা থেকেই প্রতিষ্ঠিত হলো বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট। পেলেন ভাষা অবদানের জন্য একুশে পদক। কিন্তু ভাঙা মন তার আর জোড়া লাগেনি। ৭৭ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি চলে গেলেন তিনি। আমাদের সামনে রেখে গেলে প্রশ্ন- নিজ পেশার প্রতি, সত্যের প্রতি একজন সাংবাদিক কতখানি সৎ থাকবে? কতখানি সত্য থাকা উচিত।?

লেখক : কনিষ্ঠ কন্যা ও সভাপতি, সাংবাদিক আবদুস সালাম স্মৃতি সংসদ