বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। বিশ্বব্যাংকের হিসাব মতে, বাংলাদেশের ৮৭ শতাংশ গ্রামীণ মানুষের আয়ের উৎস কৃষি। এ দেশের অর্থনীতি এখনও কৃষির ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যেমন- বন্যা, খরা ও নদীভাঙন আমাদের কৃষি ব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করে তোলে। যার ফলে কৃষক কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন পায় না। ফলে প্রতি বছর বিপুল জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা পূরণের জন্য হাজার হাজার টন খাদ্য বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। দেশ যখন এমন চলমান অবস্থায় যাচ্ছিল, করোনাভাইরাস গত বছরের শেষের দিকে চীনের উহান শহরে যার উৎপত্তি, আমাদের দেশে এ বছরের মার্চ মাস থেকে স্বাভাবিক অর্থনীতির ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলতে শুরু করে। যার কারণে এ দেশে হাজার হাজার মানুষ বেকার হয়ে পড়ছে। শহর থেকে চাকরি হারিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ গ্রামে চলে আসছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতির ওপর প্রতিনিয়ত বাড়তি চাপ তৈরি করছে।করোনা মহামারির সঙ্গে সঙ্গে এ বছর ভয়াবহ বন্যা কৃষকের জীবন-জীবিকাকে আরও বিপর্যস্ত করে তুলছে। দেশের প্রায় অর্ধেক জেলায় বন্যা চলমান। এ অবস্থায় তারা তাদের গবাদি পশু নিয়ে আরও বেশি বিপাকে পড়েছে। করোনা মহামারির কারণে গরুর দাম কমতে পারে- এমন আশঙ্কায় বহু কৃষক স্বল্প দামে তাদের পশু বিক্রি করে দিয়েছে (দৈনিক ইত্তেফাক)। এর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতিতে, যা আমাদের জাতীয় অর্থনীতিকেও হুমকিতে ফেলছে।

করোনা মহামারি প্রবাসী শ্রমিকের জীবন ব্যবস্থার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। এ ভাইরাসের অপ্রতিরোধ্য বিস্তারে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে লকডাউন ও অচল অবস্থার কারণে প্রবাসী শ্রমিকদের জীবনে বহুমাত্রিক সংকট দেখা দিয়েছে। প্রবাসে অবস্থানরত শ্রমিকরা যেমন একদিকে বেতন পাচ্ছে না অন্যদিকে অনেকে ছাঁটাই হচ্ছে, আবার মজুরি হ্রাসের কবলেও পড়েছে অনেকে। গত ফেব্রুয়ারি-মার্চের মধ্যে ব্র্যাকের অভিভাসন কর্মসূচির জরিপ মতে প্রায় ২ লাখ অভিবাসী শ্রমিক দেশে ফিরেছেন। করোনা মহামারির কারণে মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার সৌদি আরবে গত তিন মাসে অন্তত এক লাখের বেশি মানুষের যাওয়া আটকে আছে (বিবিসি বাংলা নিউজ)। এ অবস্থায় একদিকে যেমন লাখ লাখ শ্রমিক কাজ হারিয়ে দেশে ফিরেছেন, অন্যদিকে বহু শ্রমিক যারা ছুটিতে দেশে আসার পর ছুটি শেষ হলেও আর বিদেশে ফিরতে পারেননি। ফলে এই অতিরিক্ত লোকসংখ্যা আমাদের মজুদ খাদ্যের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করবে, তা বোধগম্য।ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো করোনা মহামারির কারণে নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়ে পড়েছে। করোনা পরিস্থিতির মধ্যে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ের উৎপাদন ক্ষেত্রবিশেষে শূন্যে নেমে এসেছে। গ্রাম ও মফস্বল এলাকায় লকডাউনের কারণে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো বেশ কিছু দিন বন্ধ ছিল। আবার পরিস্থিতির তারতম্য ভেদে বেশ একটা লম্বা সময় ধরে সরকার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলা রাখার একটা নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিয়েছিল, যার কারণে বিক্রির পরিমাণ অনেক কমে গিয়েছে। অনেক ছোটখাটো ব্যবসা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
দেশের অধিকাংশ মানুষের কর্মসংস্থানের প্রধান উৎস হচ্ছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প। পরিসংখ্যান অনুসারে শিল্প খাতের মোট কর্মসংস্থানের ৮০ শতাংশ এবং মোট শ্রমবাজারের ২৫ শতাংশের কর্মসংস্থান হচ্ছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প কলকারখানাগুলো (প্রথম আলো)। চলমান পরিস্থিতির কারণে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের অধিকাংশ লোক কার্যত বেকার হয়ে পড়েছে। এমন অবস্থায় অনেকে ব্যবসার পুঁজি ভেঙে তাদের জীবিকা নির্বাহ করছে। গ্রামীণ ব্যবসা-বাণিজ্যগুলো প্রয়োজনীয় মূলধনের অভাবে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলতে থাকবে। যার ফলে গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়ন যেমন থমকে দাঁড়াবে তেমনি মূল অর্থনীতির উন্নয়নও বাধাগ্রস্ত হবে।

এ বছর ব্যাপক বন্যার প্রভাবে হাজার হাজার একর জমি অনাবাদি থাকার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আমন ধানের বীজতলা জলাবদ্ধতার কারণে অনেক জায়গায় তৈরি হয়নি আবার এই জলাবদ্ধতার কারণে কৃষকরা আমন ধান রোপণ করতে পারছেন না। প্রায় অর্ধেক জমি অনাবাদি রয়েছে (দৈনিক জনকণ্ঠ)।

বন্যার সঙ্গে যোগ হয়েছে অতিবৃষ্টি ও নদীভাঙন, যার কারণে ইতিমধ্যে আউশ ও আমন ক্ষেতের বীজতলা ও হাজার হাজার একর সদ্য রোপণকৃত আউশ ও আমন ক্ষেতের জমি পানিতে তলিয়ে গেছে, যার ফলে আমাদের খাদ্য চাহিদা পূরণ হওয়া অনেকটাই দুরূহ হয়ে পড়বে।সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসের (সিইজিআইএস) হিসাবে বলা হয়, ১১টি জেলায় আগস্টের শুরুতে নদীভাঙন তীব্র রূপ নিতে পারে। তাদের আরেক গবেষণার তথ্যমতে, এ বছর নদীভাঙনে ২ হাজার ৩৬৫ হেক্টর এলাকা বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এসব জেলায় হাজার হাজার একর জমির ধান, পাট, শাক-সবজি, মাছের পুকুর ও ঘের তীব্র নদীভাঙনের কারণে নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।কৃষিতে মোট আবাদযোগ্য জমির মধ্যে আউশ ধান উৎপাদনের জমির পরিমাণ ৯.৪২ লাখ হেক্টর আর আমন ধান উৎপাদনের জমির পরিমাণ ৫৫.৮৩ লাখ হেক্টর (কৃষি পরিসংখ্যান বর্ষগ্রন্থ ২০১৭)। তথ্যানুসারে বলা যায়, বন্যার কারণে একটা বড় অংশের জমি অনাবাদি থাকবে। এর ফলে বাড়তি লোকের ব্যাপক খাদ্য চাহিদার বিপরীতে খাদ্যের জোগান যে পর্যাপ্ত হবে না তা অনেকটাই স্পষ্ট। সম্প্রতি বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) আয়োজিত 'কভিড-১৯ পরিস্থিতিতে খাদ্য নিরাপত্তা : বাংলাদেশ কি চাল ঘাটতির মুখোমুখি হচ্ছে' অনুষ্ঠানে কৃষিমন্ত্রী বলেছেন, খাদ্য ঘাটতি হতে পারে বিবেচনায় সীমিত পরিসরে চাল আমদানি করার কথা ভাবছে সরকার (দৈনিক ইত্তেফাক)। বাংলাদেশ যে সব দেশ থেকে খাদ্যশস্য আমদানি করে এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে চীন ও ভারত কিন্তু চলমান করোনা ও বন্যা পরিস্থিতিতে দেশ দুটিতে উৎপাদিত খাদ্যশস্য তাদের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতেই হিমশিম খাচ্ছে। এখন বাংলাদেশ দেশ দুটি হতে আদৌ কোনো খাদ্যশস্য আমদানি করতে পারবে কিনা তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মনে বড় ধরনের শঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

দেশের হাওর ও অন্যান্য জায়গায় বোরো ফসল তোলার সময় ব্যাপক বৃষ্টি ও বৈরী আবহাওয়া বিরাজমান ছিল ফলে অনেক ধান নষ্ট হয়ে গেছে। এসব কারণে বোরো উৎপাদনের লক্ষ্য মাত্রা কমপক্ষে ১০ শতাংশ কম হয়েছে। সরকার দেশের মিল মালিকদের কাছ থেকে বোরো মৌসুমে যে পরিমাণ ধান-চাল সংগ্রহ করতে চেয়েছিল সে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি।

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৩৮টি বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে। ফলে নিমজ্জিত আমন ধানের পরিমাণ দাঁড়ায় ২৩ লাখ ২২ হাজার ৪৪৮ হেক্টর। এর মধ্যে আক্রান্ত জমির পরিমাণ পাঁচ লাখ ৪২ হাজার ৭৮৬ হেক্টর।

খাদ্য নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে খাদ্যশস্যের মোট উৎপাদনের বিষয়টি জানা প্রয়োজন। ২০০৮-০৯ থেকে ২০১৫-১৬ বছরে আউশ, আমন, বোরোসহ গমের উৎপাদন তিন কোটি ৩১ লাখ থেকে তিন কোটি ৬০ লাখ টন ছিল। এ ক্ষেত্রে গমের মোট উৎপাদন ১৩ লাখ ৪৮ হাজার টন, আউশ দুই লাখ টনের কিছু বেশি। আমন এক কোটি ৩৬ লাখ টন। এতে দেখা যায় বোরোসহ আমনের উৎপাদনই সর্বাধিক। এই ফসলই এবারের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত (নিউজ ব্রডকাস্টিং সার্ভিস)।

গত বছর আগস্টের ৫ তারিখে সরকারি গুদামে বোরো মৌসুম থেকে ধান-চাল সংগ্রহ ছিল প্রায় ১৪ লাখ ১০ হাজার টন। এ বছর একই সময়ে সংগ্রহ হয়েছে ৬ লাখ ২০ হাজার টন। চলতি মাসে সরকারি গুদামে মজুদের জন্য ধান-চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ১৯ লাখ ৫০ হাজার টন (প্রথম আলো)। ব্যাপক এ ঘাটতি মেটাতে সরকারকে খাদ্যশস্য আমদানি করতে হবে, যা এই করোনা মহামারির সময় অত্যন্ত কঠিন হতে পারে। এ অবস্থায় বিশেষজ্ঞদের খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের শঙ্কার জায়গা তৈরি হচ্ছে।

সহকারী অধ্যাপক, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়